২০ মে, ২০২৬ ১০:৪৭ এএম

চিকিৎসকের নিরাপত্তাহীনতা রোগীদের ভোগান্তির কারণ হতে পারে: ডা. শফিকুর রহমান

চিকিৎসকের নিরাপত্তাহীনতা রোগীদের ভোগান্তির কারণ হতে পারে: ডা. শফিকুর রহমান
শরীয়তপুরে রোগীর স্বজনদের হামলায় গুরুতর আহত ডা. নাসির উদ্দিনকে দেখতে ঢামেকে ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: কর্মস্থলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে কোনো চিকিৎসক কাজ করতে পারবেন না বলে মনে করেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেন, চিকিৎসক কাজ করতে না পারলে ভোগান্তি হবে জনগণের। এ সময় শরীয়তপুরে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনার তদন্ত এবং এর বিচার দাবি করেন জামায়াত আমীর।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন শরীয়তপুরে রোগীর স্বজনদের হামলায় গুরুতর আহত চিকিৎসক নাসির ইসলামকে দেখার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যেই চিকিৎসক সমস্ত যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা দিয়ে আন্তরিকভাবে চিকিৎসা দিলেন, তার ওপরই রোগীর স্বজনরা আক্রমণ করে বসলেন। এটা এমন পর্যায়ের যে, মেরে ফেলার উপক্রম হলো। আমরা এই ঘটনার নিন্দা জানাই। এটা উচিত নয়। এভাবে যদি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তাহলে কোনো চিকিৎসক তো কাজ করতে পারবেন না। আর চিকিৎসক কাজ করতে না পারলে ভোগান্তি হবে জনগণের। আমরা অবশ্যই এই ঘটনার তদন্ত চাই এবং এর বিচারও চাই। এই ধরনের অবস্থা যাতে আর না ঘটে।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে ভাই আহত হয়েছেন, আমরা তাঁকে দেখেছি। তার জন্য সুস্থতার জন্য আমরা দোয়া করছি, তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করছি। তার মা ও স্ত্রী এখানে উপস্থিত ছিলেন। আপনজনের এই কষ্ট দেখে যে কারোরই কষ্ট লাগবে। মা যেই সন্তান বক্ষ থেকে এই সমাজকে উপহার দিয়েছিলেন যে, আমার সন্তান সমাজের পাশে থাকবে, চিকিৎসা দেবে—আজকে সেই সন্তানেরই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে কিছু অসহিষ্ণু মানুষের অপরিণামদর্শী, উচ্ছৃঙ্খলা আচরণের শিকার হয়ে। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা আবারও এর নিন্দা জানাই, এটা হওয়া উচিত নয়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যেটুকু আছে, এই নিগ্রহ চলতে থাকলে কোথাও সেটুকু থাকবে না। এটাও শেষ হয়ে যাবে।’

এ সময় হার্ট অ্যাটাক নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন জামায়াত আমীর। বলেন, ‘যেই লোকটা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন, তার জন্য আবারও দুঃখ প্রকাশ করি, আবারও তার মাগফিরাত চাই। তার আত্মীয়-স্বজনের ধৈর্য ধরা উচিত ছিল। উনারা কীভাবে বুঝলেন যে, চিকিৎসা ভুল বা শুদ্ধ হয়েছে? যদি ভুল হয়, তাহলে এই ব্যাপারে যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তাদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি হবে, তারা তদন্ত করে বলবেন যে, এটা ভুল বা শুদ্ধ হয়েছে। এভাবে সবাই যদি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার শুরু করে দেন, তাহলে একটা দেশ সভ্য দেশ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। আমরা জনগণকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানাবো। এটা (চিকিৎসক নিগ্রহ) আমাদের দেশের এটা বাজে সংস্কৃতি। পশ্চিমা দেশগুলোতে ডাক্তারদেরকে বলা হয়, নেক্সট টু দ্য গড। আল্লাহ তা’লা জীবন দেন আর চিকিৎসকরা চেষ্টা করেন, তাদের সুস্থ রাখার। এজন্য তাদেরকে পরম সম্মানে নেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বিপুল জনসংখ্যা, সেই অনুপাতে চিকিৎসক নেই, নার্স নেই, অন্যান্য সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মী নেই—এ নিয়েই আমাদের চলছে। এই ঢাকা মেডিকেল কলেজে মাঝে মাঝেই বিবেকের তাড়নায় মানুষকে দেখতে আসি। তাকানো যায় না, যেদিকে যাচ্ছেন ... , ফ্লোরে রোগী, রোগীর আত্মীয়-স্বজন শুয়ে আছেন। এটা কোনো সুষ্ঠু সেবার কোনো পরিবেশ না। কিন্তু এটাই আমাদের দেশের বাস্তবতা। আমরা এটাকে অস্বীকার করতে পারছি না। এর কারণ হলো, যুগ যুগ ধরে দেশের শাসনভার যাদের হাতে ছিল, তারা তাদের দায়িত্বটা পালন করেননি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য রাষ্ট্রের কাছে, সরকারে কাছে মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাওনা। এটা অবহেলিত থেকেছে, লুটপাট হয়েছে, দুর্নীতি হয়েছে, দলীয়করণ হয়েছে। দলীয় আনুকূল্যে সব কিছু চলেছে। এজন্য কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। আমরা সরকারের কাছে দাবি করবো, এই দুটি খাত বিশেষ করে স্বাস্থ্যে ... । মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা হলো হাসপাতাল, এই জায়গাটা যেন মানুষ এসে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় পায়। বিদায় নিলেও যেন স্বস্তির সঙ্গে উপযুক্ত চিকিৎসা পেয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।’

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোনো চিকিৎসকের পক্ষে সেবা দেওয়া অসম্ভব উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, ‘তারপরও যারা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের ধৈর্যের জন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই। আমরা তাদেরকে অনুরোধ করবো, আপনারাও এই দেশের মানুষ। (হাসপাতালে) যারা আসেন, তারা আপনাদের আপনজন। এই আপনজনকে আপনারা আন্তরিকতা দিয়ে সর্বোচ্চ যতটুকু পারেন, চেষ্টা করবেন। আল্লাহ আপনাদের এই চেষ্টার প্রতিদান দেবেন ইনশাল্লাহ।’

‘তবে আমরা একটা ফেয়ার সোসাইটি চাই। এইভাবে দেশ চলতে পারে না ভাই। এই যায়গায় হাত দিতেই হবে’—যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের অঙ্গীকার ছিল, আল্লাহ যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব আমাদেরকে দেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে আমরা অগ্রাধিকার দেবো। সেদিন কখন আসবে, যেদিন আল্লাহর ফায়সালা হবে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা কিছু করবো না? আমরা এই সমাজের জন্য সবাই মিলে-মিশেই করবো। সরকারকেও আমরা সহযোগিতা করতে রাজি, ন্যায়সঙ্গত কাজে সরকার যতটুকু আমাদের সহযোগিতা চাইবে, আমরা পূর্ণ সহযোগিতা দেবো। কিন্তু কোনো অন্যায়ের সঙ্গী আমরা হবো না। অন্যায় যেখানেই দেখবো, অপকর্ম যেখানেই দেখবো—সেখানেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলবো। এটাই আমাদের দায়িত্ব। এভাবেই জনগণ, দেশপ্রেমিক বিভিন্ন শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি মর্যাদাপূর্ণ জাতি গঠন করতে পারবো আমরা। সেই দিনই কেবল আশা করবো যে, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সুন্দর হবে। তার আগে এককভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সুন্দর করার সুযোগ খুবই কম’

প্রসঙ্গত, শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর বিলাসখান এলাকার লাল মিয়া কাজী (৪৫) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ মে রাত ১০টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি হন, যার রক্তচাপ ছিল ৬০/৪০ মাত্রার।

রোগীর গুরুতর অবস্থা আত্মীয়-স্বজনকে বিস্তারিত অবহিত করে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রেফার করেন চিকিৎসক। কিন্তু স্বজনরা ঢাকায় নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং রিস্ক বন্ডে স্বাক্ষর করে হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি রাখেন।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে হার্ট অ্যাটাকজনিক শকে থাকা এ রোগীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি মারা যান।

এরপর চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে রাত ১টার দিকে স্বজনেরা হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমে ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো করে। তারা দয়িত্বরত ডা. নাসিরকে বেধড়ক মারতে থাকে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, এক পর্যায়ে দরজার কাচ ও দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে তারা। পরিস্থিতি খারাপ দেখে ডা. নাসির ওয়াশরুমে আশ্রয় নেন, সেটা ভেঙে তাকে মারতে মারতে বের করে আনে। ইট দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেয়।

পুলিশ আসতে আসতে ডা. নাসিরকে মেরে আধমরা অবস্থায় ডায়রিয়া ওয়ার্ড থেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়।

হামলায় গুরুতর আহত জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাসির ইসলামকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হেলিকপ্টারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসক নিগ্রহ
ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত