রামেকে অবহেলায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগে চিকিৎসক নিগ্রহ: সিসিটিভি ফুটেজে যা বেরিয়ে এলো
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ১৯ এপ্রিল চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে দুই চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তবে সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। একে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ছড়িয়েপড়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রামেক হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীকে বারবার পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দিয়েছেন। তবে চিকিৎসা শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। অথচ রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, দীর্ঘ সময় ধরে রোগী কোনো চিকিৎসাসেবা পাননি।
ফুটেজে চিকিৎসা কার্যক্রমের যে চিত্র উঠে আসে
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রোগী ওয়ার্ডে প্রবেশ করার প্রায় দুই মিনিটের মাথায় কর্তব্যরত চিকিৎসক ফাহিম মাহবুব অহম সামনে অপেক্ষমাণ আরও তিনজন রোগী রেখে তাকে চিকিৎসা দেন, যদিও তার ভর্তির কাগজ ছিল না। রোগী শুধু দশ টাকার একটি ভর্তির টিকিট নিয়ে আসে, যা মূলত পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ফরম নয়।
রোগীর সমস্যা শোনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীর স্বজনদের কিছু মৌখিক নির্দেশনা দেন এবং নিজের টেবিলে অপেক্ষমাণ অন্য রোগী দেখতে ফিরে যান। ভর্তির কাগজ না থাকায় পরে চিকিৎসক নিজে এসে নার্সকে অক্সিজেন দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং অন্য একজন এটেনডেন্টকে ওষুধ আনতে পাঠান। কিছুক্ষণ পর রোগীর আরেকজন এটেনডেন্ট ভর্তির কাগজ নিয়ে আসেন।
এর পর ডা. শিবলী নোমানী রোগীর ভাইটালস পরীক্ষা করেন এবং গুরুতর অবস্থা ব্যাখ্যা করে ইসিজি ও আইভি চ্যানেল করার নির্দেশ দেন। রোগীর অবস্থার অবনতি দেখে তিনি নিজ হাতে অক্সিজেনের ফ্লো বাড়িয়ে দেন। ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী নার্স রোগীকে সেবা প্রদান করেন। ডা. শিবলী আবারও স্বজনদের রোগের অবস্থা সম্পর্কে কাউন্সেলিং করেন।
এদিকে ডা. ফাহিম মাহবুব অহম পুনরায় রোগীকে ফলোআপ পরীক্ষা করেন এবং ভাইটালস মনিটরে রেকর্ড না পাওয়া গেলে ইসিজি করার নির্দেশ দেন। এ সময় ইসিজি মেশিন এনে পরীক্ষা করা হয়। ইসিজিতে রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর চিকিৎসক পুনরায় পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত ঘোষণা করার কিছুক্ষণ পর রোগীর স্বজনরা সমস্ত চিকিৎসা প্রক্রিয়া অস্বীকার করে ভিডিও ধারণ শুরু করেন এবং চিকিৎসক ও দায়িত্বরত আনসার সদস্যকে গালাগাল ও ধাক্কা দিতে দেখা যায়।
এ ছাড়া ফুটেজে আরও দেখা যায়, রোগীর স্বজনদের একজন কোনো উসকানি ছাড়াই আনসার সদস্যের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং এক পর্যায়ে চিকিৎসকের সঙ্গেও আক্রমণাত্মক আচরণ করেন।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এই ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চিকিৎসকমহলে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কর্মস্থলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৯ এপ্রিল ডা. অহম ও ডা. শিবলি এই আক্রমণের শিকার হন। জানা যায়, রোগীকে অত্যন্ত মুমূর্ষু অবস্থায় শেষ চেষ্টা হিসেবে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকরা প্রটোকল মেনে ‘কটসন’ প্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় সেবা দেন। তবে ধারণা করা হয়, হাসপাতালে আনার আগেই রোগীর মৃত্যু ঘটেছিল। এরপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু রোগীর স্বজনরা বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পেরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলেন, যা পরবর্তীতে উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
রামেক আইডিএসে প্রতিক্রিয়া
এদিকে ইন্টার্ন ডক্টর সোসাইটির (আইডিএস) পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর একাধিক হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার রাতে হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে দুইজন পুরুষ ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং সোমবার সন্ধ্যায় ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক রোগীর স্বজনদের দ্বারা হেনস্তা ও মবের শিকার হন। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে কর্মবিরতি পালন করেন। পাশাপাশি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করে চার দফা দাবি পেশ করে তারা।
ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা প্রদানে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাদের কর্মবিরতির ফলে চিকিৎসা সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে এবং অনেক রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে র্যাপিড রেসপন্স টিমের কার্যপরিধি বৃদ্ধি এবং দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি এডমিশন ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা আনসার মোতায়েন করা। এ ছাড়া এডমিশন ও পোস্ট-এডমিশন ওয়ার্ডে ট্রেইনি চিকিৎসকদের স্বশরীরে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং রোগীর অ্যাটেনডেন্ট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও অ্যাটেনডেন্ট কার্ড ছাড়া প্রবেশ বন্ধ করা।
সেই সঙ্গে অতীতে সংঘটিত হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালবিরোধী অপপ্রচার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানায় আইডিএস।
এদিকে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস গণমাধ্যমকে জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসাসেবায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে ইতোমধ্যে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি, তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
টিআই/এমইউ
-
১৬ মে, ২০২৬
হার্ট অ্যাটাকের রোগীর মৃত্যুর জের
শরীয়তপুরে রোগীর স্বজনদের সংঘবদ্ধ হামলায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসক
-
২১ এপ্রিল, ২০২৬
দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি
ক্যান্সার হাসপাতালের উপ পরিচালককে কুপিয়ে জখম: ড্যাবের নিন্দা ও প্রতিবাদ
-
১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬