ডা. মো. বজলুল গণি ভূঞা

ডা. মো. বজলুল গণি ভূঞা

সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ 
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)


০৫ অগাস্ট, ২০২৬ ০৬:২৭ পিএম

মেধাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে জরুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশাসন

মেধাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে জরুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশাসন
ছবি: মেডিভয়েস

গত ২০ জুলাই ঢাকায় ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) উপদেষ্ঠা পরিষদের এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা ফরহাদ হালিম (ডোনার)।

সূচনা বক্তব্যে ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কয়েকটি সাংগঠনিক বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ও তা থেকে উত্তরণে সবার সুচিন্তিত মতামত চান। অনেকেই কথা বলেন। তবে সভাপতি লিখিত মতামত দিতেও অনুরোধ করেন।

প্রথম বিষয় ছিল ড্যাবের বিভক্তি বা গ্রুপিং। সভাপতি জানান, একটা সুষ্ঠু নির্বাচনে তার অনুসারী প্যানেল বিজয়ী হয়েছে এবং তারাই একমাত্র বৈধ নেতৃত্ব দানের অধিকারী। তথাপি বিএনপিসহ সরকার ও অন্যান্য পর্যায়ে সবাই বুঝতে পারছেন ড্যাবে বিভক্তি রয়েছে এবং মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও পরিচালক (স্বাস্থ্য) এসব পর্যায়ে তা সাম্প্রতিক কালের প্রশাসনিক কাজ কর্মে দৃশ্যমান। তিনি বিভক্তি মিটমাট করার উদ্যোগের কথা জানান। 

ড্যাবের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। আসন্ন বিএমএ নির্বাচনে ড্যাবের একটাই প্যানেল হবে। অনুষ্ঠানে কোনো সদস্য ড্যাবের বাইরে অন্য প্যানেল দিলে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। 

স্বাস্থ্যখাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ফার্স্ট লেলি মিসেস জোবায়দা রহমানের বিশেষ দৃষ্টি ও এ খাতের উন্নয়নে সরকারপ্রধানের আন্তরিকতা, চিন্তা ও উদ্যোগ নিয়েও অনুষ্ঠানে কথা হয়। 

সেই সঙ্গে বঞ্চিত চিকিৎসকদের ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে চার বছর আগে উদ্যোগ নিলেও এখনও কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি। তা করার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। 

আলোচনার সুযোগ পেয়ে আমি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখি। আমি প্রথমেই দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত পাঁচজন জ্যেষ্ঠ নেতার একটি অস্বাভাবিক পরিচয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তারা প্রায়ই নিজেদের ‘সুপার ফাইভ’ বলে সম্বোধন করেন। এটা খেলায় চালু আছে। সংগঠনে এটা বেমানান। নির্বাচিত নেতৃবৃন্দকে সংগঠনের কাছে নম্র, বিনয়ী হতে হয়। নেতৃত্ব কোনো লাভজনক বা প্রশাসনিক পদ নয়, বরং এটা সেবার মানসিকতা নিয়ে ঐক্য ও আত্মিক বন্ধনের পরিচায়ক। আমি নির্বাচিত পাঁচজনসহ সবাইকে যথাযথ সম্মান করি। নির্বাচনের পর আমি তাদের অভিনন্দন জানিয়েছি এবং আশা করেছি তারা সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করবেন, অনৈক্য বিভক্তি ঘুছবে। এখন মনে হচ্ছে তারা তা করতে পারেননি। 

এ প্রসঙ্গে আমার পরামর্শ হলো—প্রধান উপদেষ্ঠা, মাননীয় প্রধান পৃষ্ঠপোষকের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে বর্তমান কমিটি পুনর্গঠন করতে পারেন। বর্তমান কমিটিতে ৪৮% ভোট পাওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল থেকে মাত্র ১০-১১% সদস্য রাখা হয়েছে। আমার জানামতে এই কমিটিতে এখনো ড্যাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাক্ষর করেননি। অথচ অতীতের সকল কমিটি তাঁদের স্বাক্ষরিত ছিল। 

এই চলমান কমিটিতে কোথাও অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নাম রাখা হয়নি, এটা ঠিক হয়নি। পেশাজীবী রাজনীতি, বিএনপির রাজনীতি, সরকারের মন্ত্রিত্ব, ব্যক্তিগত যোগ্যতা, ত্যাগ-তীতিক্ষার আলোকে আমি মনে করি, তাঁর উপস্থিতি ও ভূমিকা ড্যাবের সম্মান বৃদ্ধি করতে পারে। আমার ধারণা, চিকিৎসক সমাজ, জনগণ, বিএনপি এটা বুঝতে পারে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করবেন। কেননা ড্যাব, পেশাজীবী পরিষদ ও বিএনপি কোনো পক্ষ থেকেই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। নির্বাচনের সময় ড্যাবের কয়েকজন নেতার সদস্য পদ স্থগিতাদেশ বাতিল করে বিবৃতি দিতে হবে। 

সম্প্রতি কয়েকটি পদায়ন নিয়ে ড্যাব সদস্যদের চিন্তা, আচরণ ও ভূমিকা পালনে সচেতন সমাজ স্তম্ভিত হয়েছে। এটা সরকার ও বিএনপির কাছে ড্যাবকে প্রশ্নবৃদ্ধ করেছে। আমি এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। 

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৫৫ হাজার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথ্য মতে, সরকারি ক্যাপাসিটি প্রায় ৪১ হাজার এবং প্রধান উপদেষ্ঠার তথ্যমতে, ড্যাবের সরকারি-বেসরকারি মোট সদস্য প্রায় ১৪ হাজার। এখানে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ড্যাব মোট চিকিৎসকের ১০% এরও কম সমর্থনের দাবিদার। একই হিসাবে সরকারি চাকরিতে ড্যাবের সদস্যগণ সর্বোচ্চ ১৫-২০% নিয়োজিত আছেন। এই চিত্র আশাপ্রদ নয়, এটাকে বিবেচনায় রেখে সংগঠন পরিচালনা, স্বাস্থ্য প্রশাসন, স্বাস্থ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা সর্বোপরি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায় ড্যাবের অংশগ্রহণ কতটা সার্থক ও সফলভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব, তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়।

সরকারপ্রধান প্রাক নির্বাচনী ৩১ দফার আলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিসেবা ও পল্লী অঞ্চলের জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও অবহেলা এখানে গভীরভাবে দেখা হচ্ছে ও হবে। উপজেলায় ১০১ শয্যার হাসপাতাল করতে গেলে উপযুক্ত জনবলের নিয়োগ, উপস্থিতি ও কাজকর্মে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। তাই ড্যাবকে নতুন আঙ্গিকে চিন্তা করতে হবে। 

বিরোধীদল থেকে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের রণনীতি ও রণকৌশল সরকার পরিচালনায় কাজে লাগবে না। এখানে ত্যাগ, কর্ম, দায়িত্বপালন ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন হবে। তাই রাজপথ, প্রেসক্লাব, পল্টনের পরিবর্তে হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সাবসেন্টার, ক্লাস রুম, ওটি, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে আধুনিক শিক্ষা, গবেষণা প্রশিক্ষণ ও সেবার মানসিকতা নিয়ে পেশাগত উৎকর্ষ অর্জন করার অঙ্গীকার নিয়ে নবযাত্রা শুরু করতে হবে। মেধা, শ্রম ও সার্বিক সামর্থকে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ও সেবার লক্ষ্যে পরিচালনা করে জনআস্থা অর্জন করতে হবে। স্বাস্থ্য সেবা একটি টিম ওয়ার্ক। এখানে সকল প্রকার জনশক্তিকে একটি কমন লক্ষ্যে পরিচালনা করে সবার যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে, দুর্নীতি বন্ধ করে, সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ও সরকারকে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সফল হওয়ার সহযোগী হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ঠুনকো উসিলা দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে অপ্রাসঙ্গিক মতবিরোধ ও লবিং গ্রুপিংকে স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে বিদায় জানাতে হবে। মনে রাখতে হবে মোট চিকিৎসকের ১০% সমর্থন ও ১৫-২০% সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থেকে জাতীয় দায়িত্ব পালন করা অনেক কঠিন। 

সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের রাজনৈতিক মতাদর্শগত ক্রিয়া-কর্মে জড়িত হওয়া নিষিদ্ধ। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আমরা নিজেরা এই বিধান লঙ্ঘিত হতে দেখেছি ও নির্যাতিত হয়েছি। আমি এর পুনরাবৃত্তি চাই না। আশা করছি ড্যাব নেতৃবৃন্দ বিষয়টি ভেবে দেখবেন ও মাননীয় প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিবেন। আমি চিন্তিত, আজ যেমন নিয়মনীতির দোহাই দিয়ে একজন ইমিরিটাস অধ্যাপকের পদবী বাতিল ও সম্মানি ফেরত নেয়া হচ্ছে-একদিন আসতে পারে রাজনৈতিক বিবেচনা ও এর আলোকে প্রাপ্ত কোন ড্যাব সদস্যের পদোন্নতি বাতিল ও পেনশনের টাকা ফেরত দিতে হয় কিনা!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন সকল ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই হবে নিয়োগ ও পদোন্নতির মাপকাঠি (Meritocracy). আমার ধারণা স্বাস্থ্য এর বাইরে নয়। তাই আমাদের তৈরি করতে হবে মেধাবী চিকিৎসক আর তা পারে মেধাবী শিক্ষক মণ্ডলী। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক হওয়ার পদ্ধতি ও অভ্যাস দুঃখজনভাবে দেশবাসীকে হতাশ করেছে ও জনআস্থা হারিয়েছে। আমি চাকরি জীবনে দেখেছি এলএমএফ ও কনডেন্সড এমবিবিএস চিকিৎসক আমার সিভিল সার্জন ছিলেন। এটা আমি আর দেখতে চাই না। আমি চাই, এমপিএইচ না করে কোনো চিকিৎসক সিভিল সার্জন বা ডেপুটি সিভিল সার্জন হবেন না, হওয়া উচিতও হবে না। 

একইভাবে কেবল পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করে অধ্যাপক এমনকি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ পর্যন্ত হতে দেখেছি আমি। সেটা আর দেখতে চাই না। আমার ধারণা বিবেকবান কোনো চিকিৎসকও তা চাইবেন না। কেননা অধিকাংশ পুরোনো মেডিকেল কলেজে এখন পোস্টগ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। আমি সরকারি কর্মরত চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণাকে চলমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঊর্ধ্বে রাখার পক্ষে মতামত দিচ্ছি। এই বিষয়ে মাননীয় প্রধান পৃষ্ঠপোষকের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

এ সকল মন্তব্য আমার নিজস্ব চিন্তা ও অভিজ্ঞতা প্রসূত। নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা, বলতে গেলে বিনাদোষে অপরাধী হয়ে পেশাগত জীবন ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে, প্রতিকুল পরিবেশে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় লিখে রাখলাম। এর দায় একান্তই আমার নিজের, অন্য কারো নয়। 

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত