এবার ঢামেকের একাধিক চিকিৎসকের ওপর হামলা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও রংপুর মেডিকেল কলেজের পর এবার হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন ও রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা। বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে রয়েছেন ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
হামলার সময় ঢামেকে কর্তব্যরত একাধিক চিকিৎসক আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে মেডিসিন ইউনিটে হৃদযন্ত্র বিকলের ফলে শকে (রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া) চলে যাওয়া এক রোগী নিয়ে রাতে ঢামেক হাসপাতালে আসেন স্বজনরা। নাজমা বেগম নামের ওই রোগীর বিপি/পালস নন-রেকর্ডেবল ছিল। দ্রুততম সময়ে তাকে স্যালাইন দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি সংকটাপন্ন বোঝে রোগীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) প্রস্তুতের কথা বলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু এর মধ্যেই সংকটাপন্ন এই রোগী মারা যান।
এর পর রোগীর স্বজনরা যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি অভিযোগ করে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মারধর শুরু করেন।
জানতে চাইলে ঢামেক ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটি সাধারণ সম্পাদক ডা. নাদিম হোসাইন সকালে মেডিভয়েসকে বলেন, পরিপূর্ণ চিকিৎসা দেওয়ার পরও এমন রোগী যে কোনো মুহূর্তে বিদায় হয়ে যেতে পারে। শত চেষ্টার পরও এই রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে এমন রোগী এলে আরও অন্য ইমারজেন্সির রোগীর সাথেই তাদের চিকিৎসাও নিশ্চিত করা হয়। যদিও অন্য রোগীদের ভিড়ে তা অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে উঠে। তবুও আমরা চেষ্টা করি অন্যদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি খারাপ রোগীর দিকে মনোযোগ দিতে। নির্মম সত্য হলো, এর পরও নিয়তির কারণে সব রোগীকে ফেরানো সম্ভব হয় না।
‘সকল চেষ্টার পরও রোগী মারা গেলে আবেগ, ক্ষোভ আর রাগ—সব চিকিৎসকদের গায়ে হাত তুলে মিটানোর চেষ্টা চালান স্বজনরা, যা সত্যিই দুঃখজনক’—বলেন ডা. নাদিম।
হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতি
হামলার পর রাত তিনটার দিকে জরুরি বিভাগের সেবা আধাঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। পরে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের হস্তক্ষেপে জরুরি বিভাগের গেট খুলে দেন তারা।
এ ব্যাপারে ঢামেক ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির সভাপতি ডা. তৌফিক আহমেদ মিশু সকালে মেডিভয়েসকে বলেন, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় রাতে কিছু সময়ের জন্য জরুরি বিভাগের সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। হামলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে জরুরি বিভাগের সেবা অল্প সময়ের ব্যবধানে চালু করা হয়। তবে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা ও হাসাপাতালের নিরাপত্তার জোরদার করার দাবিতে ইন্টার্ন ডক্টররা কর্মবিরতি রয়েছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে বৃহত্তর কর্মসূচিতে যাওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে হামলার প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতির বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে ঢামেক ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটি।
সোসাইটির সভাপতি ডা. তৌফিক আহমেদ মিশু ও সাধারণ সম্পাদক ডা. নাদিম হোসাইন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্তব্যরত এক ইন্টার্ন চিকিৎসকের উপর রোগীর স্বজনদের দ্বারা সংঘটিত ন্যাক্কারজনক ও বর্বর হামলার ঘটনায় আমরা গভীর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
‘এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা শুধু একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর আঘাত নয়; এটি সমগ্র চিকিৎসক সমাজ এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি হুমকিস্বরূপ। বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, চিকিৎসকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। চিকিৎসকরা মানবসেবার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হয়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’—বলেছে ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটি।
বিবৃতি বলা হয়, এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং ন্যায্য দাবিসমূহ আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আজ থেকে জরুরি সেবা ব্যতীত সকল চিকিৎসা কার্যক্রমে কর্মবিরতি পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
তাদের দাবিগুলো হলো—হামলাকারীদের অবিলম্বে শনাক্ত করে করে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, চিকিৎসকদের কর্মস্থলে পর্যাপ্ত ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হাসপাতাল চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থায়ী ও দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ।
এসব দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির নেতৃবৃন্দ।
এক সপ্তাহের মধ্যে তিন নিগ্রহের ঘটনা
কর্মস্থলে চিকিৎসকদের ওপর হামলা যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন রোগীদের পরম নিরাপদ আশ্রয়স্থল চিকিৎসক সমাজ। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি টার্শিয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে, যা ভাবিয়ে তুলছে চিকিৎসকদের। একের পর হামলার কারণে তারা যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনি আতঙ্কিতও। এ অবস্থা চলতে থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
রমেকে ওটিতে চিকিৎসকদের ওপর হামলা
গত ২০ জানুয়ারি দিবাগত রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে সার্জারি চলার সময় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) ঢুকে চিকিৎসকদেরকে মারধর করেন রোগীর স্বজনরা।
এ ঘটনায় সার্জন ও সহকারী সার্জন, রেসিডেন্ট চিকিৎসক ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মারধরের শিকার হন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন, ‘ওটিতে একজন রোগীর সার্জারি চলছিল। এ সময় অন্য রোগীর স্বজনরা চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু অস্ত্রোপচার অসম্পূর্ণ থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ওই রোগীকে ওটিতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অপেক্ষমাণ রোগীর স্বজনরা আমচমকা অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালায়।
সিওমেকে নারী চিকিৎসকের ওপর হামলা
এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ (সিওমেক) হাসপাতালে কর্তব্যরত এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলা চালায় রোগীর স্বজনরা।
এ ঘটনায় দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে ইন্টার্ন ও জুনিয়র চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান সিওমেকের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
পরে এ হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতিও পালন করেন তারা। পরে কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করেন।
এমইউ/
-
১৬ মে, ২০২৬
হার্ট অ্যাটাকের রোগীর মৃত্যুর জের
শরীয়তপুরে রোগীর স্বজনদের সংঘবদ্ধ হামলায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসক
-
২১ এপ্রিল, ২০২৬
দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি
ক্যান্সার হাসপাতালের উপ পরিচালককে কুপিয়ে জখম: ড্যাবের নিন্দা ও প্রতিবাদ
-
১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬