ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

সাবেক প্রধান,
প্যাথলজি বিভাগ, 
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ
এবং 
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ

সিনিয়র কনসালটেন্ট এন্ড চিফ
হাসপাতাল ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি,
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ।
 


২২ মে, ২০২১ ০২:৪৬ পিএম

নবাগত এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু কথা

নবাগত এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু কথা
ছবি: সংগৃহীত

১৯৮০ সনে আমি তোমাদের মতই মহান চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষা শুরু করেছিলাম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। তোমরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছো। তোমাদের স্বাগতম জানাচ্ছি। আমি এই পেশায় আসতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করি এবং মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। তোমরাও এই পেশায় আসতে পেরেছো বলে নিজেকে ধন্য মনে করবে এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

তোমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করে রেখেছিলে যে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কেউ কেউ হয়তো স্থির করেছিলে না। কেউ বা অন্য পেশায় যেতে চেয়েছিলে। কেউ কেউ নিজের ইচ্ছায় এসেছো। কেউ বা বাবা-মা, দাদা-দাদী অথবা অন্য কারো ইচ্ছায় এই পেশায় এসেছো। যে কারণেই এসে থাকো সব ভুলে গিয়ে এখন একটা উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছো এটা মনে করতে হবে।

সেটা হলো দেশের এবং বিদেশের মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়ে রোগীর কষ্ট লাঘব করবে। মনে রাখবে চিকিৎসা বিদ্যা হলো সদকায়ে জারিয়ার মতো। তুমি চিকিৎসক হয়ে চিকিৎসা দিয়ে রোগী ভালো করবে তার কল্যাণে তুমি সৃষ্টি কর্তার কাছ থেকে পুরস্কার পাবে। চিকিৎসা বিদ্যার শিক্ষক হয়ে যে শিক্ষা তোমার ছাত্রদের দিবে সেই শিক্ষার ফলস্বরূপ অনন্তকাল পুরস্কৃত হতে থাকবে। হাদিয়া স্বরূপ যে অর্থ তারা তোমাকে দিবেন সেই অর্থে তোমার ইহকাল ভালোভাবেই কেটে যাবে। 

কাজেই, মহান ব্রত নিয়ে কাজ করলে তোমার দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি পাবার সম্ভাবনা আছে। কিছু সংখ্যক চিকিৎসক আছেন তারা হয়তো সামাজিক কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে চিকিৎসা পেশার প্রতি নেতিবাচক মন্তব্য করে থাকতে পারেন। তাদের কথায় কান দিবে না। চিকিৎসা পেশায় যদি ত্রুটি থেকেও থাকে তোমরা ভবিষ্যৎ ডাক্তাররা তা দূর করে দিবে। 

তোমরা এতদিন শিশু-কিশোর ছিলে। এখন যৌবনে পদার্পণ করেছো। এতদিন তোমাদেরকে মা-বাবা আগলে রেখেছেন। এখন তাদের থেকে তোমরা মুক্ত। এই মুক্ত পরিবেশে এসে তোমরা কেউ কেউ ভুল করে ফেলতে পারো। এখন তোমরা মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে আছো। যতদূর পারেন, তারাই তোমাদেরকে আগলে রাখবেন। তারাই তোমাদেরকে শাসন করবেন। তারাই তোমাদেরকে আদর করবেন। বাবা-মা থেকে যথেষ্ট আদর পেয়েছ। আর আদরের প্রয়োজন নেই। এই পাঁচ বছর মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে ডাক্তার হিসেবে বের হয়ে বাবা-মার ঋণ শোধ করবে। বাবা-মা, আত্বীয়-স্বজন তথা সমাজের উপকারে নিজেকে উৎসর্গ করবে।

পরিপূর্ণ ডাক্তার হতে তোমাদের পাঁচ বছর সময় লাগবে। তোমরা ছিলে সাধারণ ছাত্র। এখন থেকে মেডিকেলের ছাত্র। সাধারণ ছাত্র থেকে মেডিকেলের ছাত্রদের পার্থক্য আছে। তোমাদের পোশাকও আলাদা। এপ্রোন গায়ে দিয়ে যেমন বাহিরে সাদা তেমনি ভিতরেও তোমার সাদা থাকবে। চুলের স্টাইল, জামাকাপড় ও জুতার স্টাইল হবে মার্জিত। ক্লাসমেটদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করবে। বড়দের শ্রদ্ধা করবে। ছোটদের স্নেহ করবে।

কোনো কোনো সিনিয়র ছাত্র গোপনে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের উপর র‌্যাগিং নামে একটা বাজে প্র্যাক্টিস করে থাকে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে। তবে এটা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে নেই। যদি কেউ এটা করেও থাকে, তাহলে মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের থেকে নিশ্চয় তার রক্ষা নেই। মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের পাস ফেল সরাসরি শিক্ষকদের হাতে। তবে অন্যায়ভাবে কাউকে পাস বা ফেল করানো হয় না। শিক্ষকগণ বিভিন্ন মতাদর্শ অবলম্বন করলেও পরীক্ষা পাসের ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় আনেন না।

তোমাদের মূল কাজ হবে মেডিকেলের পড়া পড়া। পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেনতা থাকতে হবে। দেশ সেবার সুষ্ঠুধারার রাজনীতি করলে কোনো ক্ষতি নেই। কোনো ক্রমেই দুষ্ট ছাত্রদের পাল্লায় পড়ে ভ্রান্ত পথে পা দিবে না। এই পথে নেওয়ার জন্য প্রথম দিকে তোমাকে অর্থের লোভ দেখাবে। এদের থেকে সাবধান থাকবে। নতুন পরিবেশে কোনো কারণে কোন সমস্যায় পড়লে ভুলেও বাবা-মাকে জানাবে না। শুধু জানাবে শিক্ষকদেরকে।

তারাই তোমার সকল সমস্যার সমাধান করতে পারেন। বাবা-মা নয়। বাবা-মা তোমার সমস্যার কথা শুনে শুধু কষ্টই পাবেন। কোনোভাবেই বাবা-মাকে কষ্ট দিবে না। শুধু ভালো সংবাদগুলো মোবাইলে জানাবে।

ক্যাম্পাসে শালীনতার সাথে চলাফেরা করবে। শিক্ষক ও সিনিয়র সামনে পড়লে দাঁড়িয়ে সম্মান ও গ্রিটিং জানাবে। বেয়াদবের মতো মোটর বাইকের উপর হেলান দিয়ে দাঁড়াবে না। বাহিরের বখাটেদের সঙ্গে আড্ডা দিবে না। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করবে না। ধূমপান করবে না। মদ্যপান করবে না। নেশাখোররা আড্ডা দেয় এমন জায়গায় যাবে না। ক্লাসে শিক্ষক ভুল করলে নম্রতার সঙ্গে পরোক্ষভাবে শুধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। মনে রাখবে, টিচার ইজ অলওয়েজ রাইট।

নিয়মিত পড়া শেষ না করতে পারলে মহাসংকটে পড়ে যাবে। বন্ধুরা যদি তোমাকে ফেলে উপরের ক্লাসে উঠে যায় তুমি লাইনচ্যুত হয়ে পড়বে। উপরে উঠা তোমার জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়বে। পাস মার্ক কিন্তু ৬০%। মনে রাখবে। ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হবে কম পক্ষে ৭৫%।

লেখাপড়া করার পাশাপাশি আনন্দ ফুর্তিও করবে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা করে। ডিবেটিং ক্লাবে ডিবেট করবে সুস্থ যুক্তি তর্ক চর্চা করার জন্য। মেডিসিন ক্লাব ও সন্ধানী ক্লাবের সদস্য হয়ে ছাত্র বয়স থেকে মানব সেবার লিডারশিপ শিক্ষা নিবে।

শিক্ষকগণ তোমাদেরকে তিনটি জিনিস শিক্ষা দিবেন—নলেজ, স্কিল ও এটিচুড। চিকিৎসা বিদ্যার সব জ্ঞান শিক্ষা দিবেন এই পাঁচ বছরে। হাতে-কলমে রোগী পরীক্ষা করা শিক্ষা দিয়ে স্কিল শিখাবেন। এর ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষা দিবেন এটিচুড। ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক সুন্দর হওয়ার এটিচুড শিখানো হবে চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

বর্তমান যুগ ডিজিটাল যুগ। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তোমাকেও ডিজিটাল হতে হবে। তা না হলে তুমি তোমার কলিগদের থেকে পিছিয়ে পড়বে। বিদেশি ডাক্তারদের সাথে প্রতিযোগিতায় তুমি পিছিয়ে পড়বে। কাজেই ওয়েব ব্রাউজিং, কনটেন্ট রাইটিং, ইমেইল, ফেইজবুক, মেসেঞ্জার, জুম ও ইউটিউব ইত্যাদি ব্যবহারে এক্সপার্ট হতে হবে।

শিক্ষা গ্রহণ করার দায়িত্ব তোমার নিজের। শিক্ষকণ শুধু নির্দেশনা (গাইড) দিবেন। সব পড়া মূল টেক্সট বই থেকে পড়বে। শুধু নোট বই থেকে পড়ে পাস করলে তোমার সেই জ্ঞান স্থায়ী হবে না। ক্লাস টিচার যেসব টেক্সট বইয়ের নাম লিখে দিবেন সেই সব বই কিনবে। কিছু কিছু বইয়ের নাম টিচার লিখবেন না। সিনিয়র ছাত্রদের থেকে সেইসব বইয়ের নাম লিখে নিবে। ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে টিচারগন যেসব উপদেশ দিবেন সেইসব উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। 

পাঁচ বছর পর তুমি আর ছাত্র থাকবে না। হয়ে যাবে ডাক্তার। ডাক্তার মানুষ না। ডাক্তার মানুষের থেকেও ঊর্ধ্বে অন্যরকম এক শ্রেণী। মানুষ প্রকৃত ডাক্তারের কাছে নিরাপদ। প্রকৃত ডাক্তার মানুষের কাছে বিশ্বস্ত। কাজেই প্রকৃত ডাক্তার হতে হবে। আমি ১৯৯২ সন থেকে ২০২০ সন পর্যন্ত সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ছিলাম। সেই ২৮ বছর  প্রতি বছর একটি করে ব্যাচ নবীন ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেছি আর একটি করে ব্যাচ নবীন ডাক্তার হিসাবে সম্বর্ধনা দিয়ে বিদায় দিয়েছি। আমার অনেক ছাত্র আজ ভালো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। দেখা হলে এগিয়ে এসে সালাম দেয়। আরো দোয়া করতে বলে। আমি দোয়া করি যেন তোমরা প্রকৃত ডাক্তার হয়ে পাঁচ বছরের মধ্যেই বেরিয়ে যেতে পারো এবং আরো উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হতে পারো। 

২২.০৫.২০২১ ইং 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : মেডিকেল শিক্ষার্থী
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত