২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৭:৩০ পিএম

অনন্য উচ্চতায় ডা. কামরুল, একক নেতৃত্বে দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন

অনন্য উচ্চতায় ডা. কামরুল, একক নেতৃত্বে দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিনা পারিশ্রমিকে দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করে অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলাম। মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীতে নিজের প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে সফলভাবে তাঁর ২০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। দেশে এ পর্যন্ত কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে প্রচারবিমুখ এ চিকিৎসকের একক নেতৃত্বে।

জানা গেছে, গত ১৮ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে কিডনি প্রতিস্থাপন করা অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের অস্ত্রোপচারে সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশের বেশি। ব্যয়বহুল এ অস্ত্রোপচারে তিনি নিজে কোনো পারিশ্রমিক নেন না। মানবসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২২ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।

রাজধানীর শ্যামলীতে নিজের প্রতিষ্ঠিত সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে থাকেন এই মানবিক চিকিৎসক। প্রতি সপ্তাহে গড়ে পাঁচটি কিডনি প্রতিস্থাপন করেন তিনি। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্রোপচারের ওষুধসহ অন্যান্য খরচ ছাড়া কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য রোগীকে অর্থ দিতে হয় না। সব মিলিয়ে খরচ হয় দুই লাখ টাকা। প্রতিস্থাপন পরবর্তী ফলোআপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও রোগীকে টাকা দিতে হয় না।

বেড়ে ওঠার গল্প 

১৯৬৫ সালে পাবনার ঈশ্বরদীতে জন্মগ্রহণ করেন কামরুল ইসলাম। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বোর্ডের মেধাতালিকায় যথাক্রমে ১৫তম ও ১০তম স্থান অর্জন করেন তিনি। ডা. কামরুল ইসলাম ১৯৯০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৯৯৫ সালে এফসিপিএস এবং ২০০০ সালে বিএসএমএমইউ থেকে ইউরোলজিতে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ থেকে তিনি এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঈশ্বরদীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মো. আমিনুল ইসলামের ছেলে ডা. কামরুল ইসলাম ২০০৭ সাল থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন করে আসছেন।

কাজের স্বীকৃতি 

মানবিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বিষয়ে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পান ইউরোলজি সোসাইটি স্বর্ণপদক। 

কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি অকেজো হয়ে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ সীমিত এবং ডায়ালাইসিস অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশ রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রায় ৬০ শতাংশ রোগীর জীবন রক্ষা সম্ভব।

জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের দেশের গরিব রোগীদের আরও বেশি করে সেবা দেওয়া যায়, আরও বড় পরিসরে অনেক মানুষকে যাতে সেবা দিতে পারি—এটাই আমার মূল পরিকল্পনা। আমাদের সেবার গুণমান আরও বাড়ানো যায়, সেদিকে আরও বেশি মনোযোগ দিব। আমরা বাণিজ্যিকভাবে অতিরিক্ত খরচ চাই না, সেবার মানটা ঠিক রাখতে। সেটা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে হচ্ছে। সে জিনিসটাই যেন, আমাদের দেশেও হতে পারে সেদিকে মনোযোগী হতে চাই।’

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

১৯৯৩ সালে বিসিএসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেওয়ার মধ্য কর্মজীবন শুরু করেন ডা. কামরুল ইসলামের। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০০৭ সালে প্রথম সফল কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। ২০১১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন সহজতর করে তোলার মহান লক্ষ্য নিয়ে ২০১৪ সালে নিজ উদ্যোগে সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।

অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সিকেডিতে প্রতিদিন গড়ে একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রতিটি অস্ত্রোপচারে ১০ থেকে ১২ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী যুক্ত থাকেন। বর্তমানে এখানে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্যাকেজ মূল্য দুই লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে অস্ত্রোপচার, ওষুধ, আইসিইউ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ অন্তর্ভুক্ত। কিডনি দাতাকে সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন এবং গ্রহীতাকে ৭ থেকে ১০ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়।’

মানুষকে নিখুঁত চিকিৎসা দেওয়া নিজের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘কিডনি রোগীদের চিকিৎসার খরচ আমরা হাসপাতালের অন্যান্য আয়ের মাধ্যমে বহন করি। এটি যেকোনো হাসপাতালই করতে পারে এবং এতে লোকসান হয়—এমনটা নয়।’

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নম্বরের কথা চিন্তা করে পড়াশোনা করিনি: ডা. জেসি হক
এমআরসিপিতে বিশ্বসেরা বাংলাদেশি চিকিৎসক

নম্বরের কথা চিন্তা করে পড়াশোনা করিনি: ডা. জেসি হক