১৪ অগাস্ট, ২০২৬ ১০:৫১ এএম

আফগানিস্তানে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে ৪০ লাখ শিশু, বন্ধ ৬০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্র

আফগানিস্তানে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে ৪০ লাখ শিশু, বন্ধ ৬০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্র
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: আফগানিস্তানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ লাখ শিশু বর্তমানে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় শত শত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে পড়েছে, যার ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে লাখো শিশু।

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের সাম্প্রতিক গবেষণায় এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, বর্তমানে আফগানিস্তানে প্রতি ১০ জন নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুর মধ্যে একজন তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত। জাতিসংঘের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, দেশটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার শুধু উচ্চই নয়, তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছেও।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আফগানিস্তানের দুই-তৃতীয়াংশ প্রদেশে তীব্র অপুষ্টির হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। গত চার বছরে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার ১৪ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখে পৌঁছেছে।

তীব্র অপুষ্টি কী?

তীব্র অপুষ্টি যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ওয়েস্টিং নামে পরিচিত, এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুর উচ্চতার তুলনায় ওজন বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। সাধারণত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব অথবা গুরুতর অসুস্থতার কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে শরীরের চর্বি ও পেশি দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। সময়মতো চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবা না পেলে এ অবস্থা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

কেন বাড়ছে অপুষ্টি?

সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, আফগানিস্তানে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার তীব্র সংকট। অর্থায়নের ঘাটতির কারণে প্রায় ৬০০টি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর আগে নির্ভরশীল ছিল প্রায় ৪০ লাখ মানুষ, যাদের অর্ধেকই শিশু।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের অপুষ্টি শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, পুষ্টি পুনর্বাসন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপর্যবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা

সংস্থাটির তথ্যমতে, গত চার বছরে আফগানিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। ২০২২ সালে যেখানে সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ১ বিলিয়ন ডলারে।

২০২৬ সালের অর্ধেকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৩৮ মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অর্থায়নের তুলনায় এখনও ৭৪ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।

এত সংকটের মধ্যেও সেভ দ্য চিলড্রেন ১৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রেখেছে। সংস্থাটি জানায়, উত্তর আফগানিস্তানের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য তারাই একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি সংকট আরও বাড়িয়েছে

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে আফগানিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বড় কারণ পাকিস্তান ও ইরান থেকে ৬০ লাখেরও বেশি আফগান নাগরিকের দেশে প্রত্যাবর্তন। আফগান শরণার্থীদের অবস্থানের শর্ত কঠোর করার পাশাপাশি দুই দেশই বহিষ্কার কার্যক্রম জোরদার করায় বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশে ফিরে এসেছে। এতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

 মানবিক সহায়তা হ্রাসের কারণ

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আফগানিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা দ্রুত কমতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকারের পতনের পর অনেক দাতা দেশ অর্থায়নে কঠোর শর্ত আরোপ করে, কিছু সহায়তা স্থগিত করে এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

তালেবান সরকারের নারী মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে নারী ও শিশুদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে বহু আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাকে তাদের কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করতে হয়েছে।

২০২১ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্র ছিল আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় সহায়তাদাতা দেশ। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সহায়তা জাতিসংঘ ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তালেবানের শীর্ষ নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আফগান রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দ করাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকও তালেবান ক্ষমতায় আসার পর বড় পরিসরের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে তারা মূলত এনজিওগুলোর মাধ্যমে সীমিত পরিসরে জরুরি মানবিক সহায়তা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট হওয়ায় আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন আরও কমেছে।

যা বলছে সেভ দ্য চিলড্রেন

সেভ দ্য চিলড্রেনের আফগানিস্তান বিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর আশীষ দামলে বলেন, তীব্র খাদ্যসংকট, বিপুলসংখ্যক প্রত্যাবাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাম্প্রতিক সংঘাত এবং টানা চার বছরের খরার কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি—সব মিলিয়ে সীমিত মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা চরম চাপের মুখে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে—পরিবারগুলো চরম সংকটে পৌঁছানোর পর শুধু প্রতিক্রিয়া জানানো, অথবা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে শিশুদের জীবন, অধিকার ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।’
এইউ/ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও
একদিনেই অবস্থান বদল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও