কাটাছেঁড়া ছাড়াই পালসেটাইল টিনিটাসের সফল চিকিৎসা, স্ট্যান্টিংয়ে কানের শব্দ থেকে মুক্তি রবিউলের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানে ক্রমাগত ‘শোঁ শোঁ’, ‘ধুপধাপ’ বা স্পন্দনশীল শব্দ শোনার জটিল সমস্যা পালসেটাইল টিনিটাসের আধুনিক চিকিৎসায় সফলতা পেয়েছেন নিউরোইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু। মস্তিষ্কের রক্তনালির ভেনাস সাইনাসে স্ট্যান্ট বসিয়ে এ সমস্যায় আক্রান্ত এক রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন তিনি।
রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর ১টায় কোন ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই এই অপারেশনটি সম্পন্ন করেন তিনি।
জানা গেছে, গাইবান্ধার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে কানে হৃদস্পন্দনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘শোঁ শোঁ’ শব্দে ভুগছিলেন। ফলে তার ঘুম ও স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছিল। বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও তিনি কোনো উপকার পাচ্ছিলেন না। এ পর্যন্ত চিকিৎসা ও পরীক্ষায় তার কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সমস্যায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং কয়েকবার আত্মহত্যার চিন্তাও করেন তিনি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার মস্তিষ্কের রক্তনালির ভেনাস সাইনাসে ব্লক শনাক্ত হয়। পরে নিউরোইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞ ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু ডিএসএ (ডিজিটাল সাবট্রাকশন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি) পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর ক্যাথেটারভিত্তিক পদ্ধতিতে ভেনাস সাইনাসে স্ট্যান্ট বসিয়ে ব্লক খুলে দেওয়া হয়। চিকিৎসার পরপরই রবিউলের কানের শব্দ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় বলে চিকিৎসক ও রোগীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পালসেটাইল টিনিটাস সম্পর্কে ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, ‘পালসেটাইল টিনিটাসের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর বেশিরভাগই কানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যার কারণেও এ রোগ হতে পারে। মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যাগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা না হওয়ায় অনেক রোগী বছরের পর বছর চিকিৎসার জন্য ঘুরতে থাকেন।’
রোগ নির্ণয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কানে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা অস্বস্তিকর শব্দ যদি হৃদস্পন্দনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় অথবা গলার কাছে রক্তনালিতে চাপ প্রয়োগ করলে কানের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমরা পালসেটাইল টিনিটাসের কথা বিবেচনা করি। মস্তিষ্কের রক্তনালির কারণে এ সমস্যা হলে এনজিওগ্রাম বা ডিএসএ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা যায়। রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।’
ভেনাস সাইনাস স্ট্যান্টিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পালসেটাইল টিনিটাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ভেনাস সাইনাস স্টেনোসিস বা ব্লক। এ ধরনের ব্লকে স্ট্যান্ট বসিয়ে সংকুচিত ভেনাস সাইনাস খুলে দেওয়া হলে রক্তনালির চাপ কমে যায় এবং কানের শব্দের সমস্যা ভালো হয়ে যায়।’
রবিউলের চিকিৎসা সম্পর্কে ডা. হিমু বলেন, ‘রবিউল অনেক বছর ধরে পালসেটাইল টিনিটাসে ভুগছিলেন। ডিএসএ করে তার ভেনাস সাইনাসে ব্লক দেখতে পাই। পরে রক্তনালিতে স্ট্যান্ট বসিয়ে ব্লকটি খুলে দেওয়া হয়। স্ট্যান্ট বসানোর পরপরই তার কানের শোঁ শোঁ শব্দ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, বিদেশে নিউরোইন্টারভেনশনের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের সময় পালসেটাইল টিনিটাসের এ ধরনের চিকিৎসা দেখেছেন। তখন থেকেই দেশে এ রোগের চিকিৎসা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিল তার। রবিউল প্রায় দেড় বছর আগে তার কাছে চিকিৎসার জন্য আসেন। পরবর্তীতে অন্য রোগের চিকিৎসায় ভেনাস সাইনাস স্ট্যান্টিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর রবিউলের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
ডা. হিমু জানান, দেশে পালসেটাইল টিনিটাসের চিকিৎসায় এর আগে ভেনাস সাইনাস স্ট্যান্টিং করা হয়নি। এ চিকিৎসা শুরুর আগে তিনি তার মেন্টর ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলামের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তার পরামর্শ ও সহযোগিতায় চিকিৎসাটি সম্পন্ন করার সাহস পান বলে জানান তিনি। পাশাপাশি অপারেশনে সহযোগী হিসেবে ছিলেন ডা. সামসুজ্জামান।
রবিউল ইসলাম বলেন, আমি কানের ‘শো শো’ শব্দের জন্য ঘুমাতে পারতাম না। কোন কাজ করতে পারতাম না। কয়েকবার আত্মহত্যার চিন্তাও করেছি। গত রবিবার আমার ছোটখাটো অপারেশনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের রক্তনালীতে স্ট্যান্টিং করা হয়েছে। এরপর থেকে আমার কানে আর শব্দ নাই। আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ আছি।
বাংলাদেশে নিউরোইন্টারভেনশনের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। পালসেটাইল টিনিটাসের মতো অপেক্ষাকৃত জটিল ভাসকুলার সমস্যায় ক্যাথেটারভিত্তিক চিকিৎসার এই সফলতা দেশে আধুনিক মস্তিষ্ক ও রক্তনালির চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরছে।
এমআই/