১০ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০৯:২৬ পিএম

আরওপি রোগে স্থায়ীভাবে অন্ধত্বের ঝুঁকিতে নবজাতক

আরওপি রোগে স্থায়ীভাবে অন্ধত্বের ঝুঁকিতে নবজাতক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি’ শীর্ষক মাসিক সেন্ট্রাল সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি (আরওপি) অপরিণত এবং স্বল্প ওজনের নবজাতকদের অন্ধত্ব বয়ে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সঠিক সময়ে রোগটি শনাক্ত ও চিকিৎসা করা না হলে, এসব নবজাতক স্থায়ীভাবে অন্ধত্ব বরণ করতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

আজ রোববার (১২ ডিসেম্বর) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এ-ব্লক অডিটোরিয়ামে ‘রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি’ শীর্ষক মাসিক সেন্ট্রাল সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়।

সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউন্যাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সঞ্চয় কুমার দে ‘আরওপি: এ চ্যালেঞ্জ ফর ইনট্যাক্ট সারভাইভাল অব প্রিটার্ম নিউবর্ন’ ও চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. নুজহাত চৌধুরী ‘আরওপি: ব্লাইন্ডিং অব নিউন্যাটোস’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সেমিনারে বলা হয়, অপরিণত ও স্বল্প ওজনের নবজাতকদের চোখে অন্ধত্ব বয়ে নিয়ে আসতে পারে এমন একটি রোগ মারাত্মক রোগ হলো রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি, সংক্ষেপে আরওপি। যখন নবজাতকরা মাতৃগর্ভে ৩৫ সপ্তাহের আগেই জন্মগ্রহণ এবং তাদের ওজন যখন ২০০০ গ্রামের বা দুই কেজির নিচে তারা এরোগের ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিউন্যাটোলজি বা এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয় তখন এই রোগটি শিশুদের মাঝে দেখা যেতে পারে। এই রোগটির বিশেষ দিক হলো, জন্মগ্রহণের সময় কোনো নবজাতকই এ রোগে আক্রান্ত থাকে না। এমনকি জন্মগ্রহণের প্রথম ১৪ বা ১৫ দিনের মধ্যে এই রোগটি নবজাতকদের হয় না। যখন এই রোগটি ধরা পড়ে, সাথে সাথে চিকিৎসা নিতে হয়। নয়তো নবজাতকরা অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

করণীয় তুলে ধরে আলোচকরা বলেন, দুই হাজার গ্রামের নিচে বা ৩৫ সপ্তাহের আগে জন্মগ্রহণকারী নবজাতকদের ৩০ দিনের ভেতর অন্তত একবার চক্ষু পরীক্ষা করতে হবে। যারা এই নবজাতকের চেয়েও অপরিণত ও অল্প ওজনের বা ২৮ সপ্তাহের আগে হয়েছে এবং ১২০০ গ্রামের নিচে তাদের ক্ষেত্রে এই স্ক্রিনিংয়ের সময়টি নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ এদের ক্ষেত্রে আরও আগেই যদি রোগটি চিকিৎসা করা না হয়, তাহলে তারা খুব শিগগির অন্ধত্বের দিকে যেতে পারে।

দেশে এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য নেই জানিয়ে বলা হয়, সমগ্র বাংলাদেশে অপরিণত শিশুদের ক্ষেত্রে কতভাগ শিশু আরওপির কারণে অন্ধ হয়েছে তার সঠিক কোনো জরিপ দেশে নেই। কারণ এই বিষয়ে তেমন কোনো সচেতনতা নেই। এজন্য কোনো ধরনের ডকুমেন্টশন করা হয়নি। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এই আরওপি অপরিণত এবং স্বল্প ওজনের নবজাতকের মধ্যে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ আরওপি রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এদের সবারই যে চিকিৎসা লাগবে এমন নয়। অনেকের ক্ষেত্রেই আরওপি ক্লিনিকে ভালো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে আরওপি ক্লিনিকেও ভালো হবে না, সেই নবজাতকরা অন্ধ হয়ে যায়। সেই অন্ধত্ব অনিবারণ যোগ্য। অর্থাৎ আরওপি রোগটি প্রতিরোধযোগ্য, কিন্তু এ রোগে একবার অন্ধ হয়ে গেলে সেটি আর কোনো  চিকিৎসায় ভালো হবে না।

সেমিনারে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির সাথে সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুর সমস্যাও বাড়ছে। এক সময় অন্ধত্বের মূল কারণ ছিল ভিটামিন-এ এর অভাব। সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের ফলে ভিটামিন-এ জনিত অন্ধত্বের সংখ্যা কমছে কিন্তু প্রিম্যাচুর বার্থ বাড়ার জন্য তাদের চোখের সমস্যাও বাড়ছে, যা এখন শিশুদের অন্ধত্বের প্রধান কারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, আরওপি ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ প্রিম্যাচুরড বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যেসব নবজাতক সময়ের আগে জন্ম নেয়, অতিরিক্ত অক্সিজেন পায়, সংক্রমণে ভোগে, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন সেবা পায়, যাদের বার বার রক্ত সঞ্চালন করা হয়, তারা ঝুঁকিতে থাকে। সংক্রমণে ভোগে যারা অনেক দিন অক্সিজেন পান তারাও ঝুঁকিতে থাকে।

এ রোগের চিকিৎসায় দেশে পর্যাপ্ত চক্ষু চিকিৎসকের স্বল্পতা রয়েছে। এছাড়া সচেতনতার অভাব, রেফারেলের অভাব, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় শহর কেন্দ্রীক এ চিকিৎসাসেবা সীমাবদ্ধ থাকা দেশে আরওপি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বলে জানান আলোচকরা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসএমএমইউ ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আরওপি বিষয়টি অনেকের কাছে নতুন। নবজাতকদের যখনই অক্সিজেন বেশি দেওয়া হয় তখনই এটি বেশি হয়। আজকাল কিছু সিজারিয়ান সেকশন সময়ের আগে করা হয়, এর মধ্যে টেস্ট টিউব বেবির সময় মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য আরলি সিজারিয়ান সেকশন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এসব নবজাতকদের মধ্যে অনেক শিশু আরওপি রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আরওপি সেন্টার প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ৫৯৬ জন রোগী এসেছে। যার মধ্যে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ রোগীর আরপি রোগ পাওয়া গেছে। আগে দেশে ৩০ হাজার শিশু রাতকানা রোগে আক্রান্ত হতো। কিন্তু সরকারের উদ্যোগের ফলে এটি কমে ১০ হাজারে নেমে এসেছে। আরওপি ও অন্যান্য চোখের সমস্যার কারণে দেশে ৪০ হাজার শিশু রোগী অন্ধত্ব বরণ করছে।

চিকিৎসক অপ্রতুলতার কথা জানিয়ে অধ্যাপক শারফুদ্দিন বলেন,  বাংলাদেশে রেটিনা বিশেষজ্ঞ অনেক কম। বাংলাদেশে ১৪০০ জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র ১২০ জন রেটিনা বিশেষজ্ঞ রয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ১৬ কোটি মানুষের মাঝে এত কমসংখ্যক রেটিনা বিশেষজ্ঞ দ্বারা আরওপি স্ক্রিনিং করা সম্ভব নয়। সারাদেশের ভিশন সেন্টারের মাধ্যমে আরওপি রোগীদের রেটিনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো যেতে পারে। প্রান্তিক পর্যায়ে আরওপি স্ক্রিনিং করার জন্য কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, নবজাতক, মা ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করতে হবে। দুই মাসের মধ্যে শিশুদের চক্ষু স্ক্রিনিং করাই ভালো, না হলে এই শিশুরা যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন তারা দেশের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : বিএসএমএমইউ
প্যারালাইজড রোগীদের অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনেরা

বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে

প্যারালাইজড রোগীদের অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনেরা

বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক