২৯ অক্টোবর, ২০২১ ১১:৫৪ এএম

বছরে দেড় কোটি মানুষের স্ট্রোক, এক-তৃতীয়াংশের মৃত্যু

বছরে দেড় কোটি মানুষের স্ট্রোক, এক-তৃতীয়াংশের মৃত্যু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সবশেষ তথ্যমতে, বিশ্বে দ্বিতীয় মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক। আর বাংলাদেশে তৃতীয়। প্রতীকী ছবি

মেডিভয়েস রিপোর্ট: আজ ২৯ অক্টোবর, বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। ‘মুহূর্ত বাঁচাতে পারে সজীবতা’ এবং ‘অমূল্য সময়’—এই দুটি প্রতিপাদ্যকে সামনে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উদযাপিত হচ্ছে সচেতনতামূলক নানা প্রচারণা।  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সবশেষ তথ্যমতে, বিশ্বে দ্বিতীয় মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক। আর বাংলাদেশে তৃতীয়। বিশ্বে প্রতি বছর দেড় কোটি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়, সমমান পরিমাণ অক্ষম ও সুস্থ হয়।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে গত ২৭ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) নিউরোসার্জারি বিভাগের এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়, মস্তিষ্কের রক্তনালীর জটিলতার কারণে আকস্মিক চলতশক্তি লোপ পাওয়া ও অচেতন হওয়াকে সাধারণত স্ট্রোক বলা হয়। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভীতি বেড়ে যায়। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে তরুণ বা চল্লিশের কম বয়স্কদের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

অনুন্নত দেশে বাড়ছে স্ট্রোক

স্ট্রোকের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঢামেক অনেক অগ্রসর হয়েছে জানিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালের একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, 'এই রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হচ্ছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকাতে স্ট্রোকের ৪২ শতাংশ রোগী কমেছে। কিন্তু অনুন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই রোগ শতভাগ বেড়েছে। 

অনুষ্ঠানে এক পরিসংখ্যানের তথ্য উপস্থাপন করে ঢামেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সুমন রানা জানান, দেশে প্রতি এক হাজার জনে ১১ দশমিক ৪ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে (১৪ জন)। সবচেয়ে কম রাজশাহীতে। তবে এখনো পর্যন্ত এর কোনো কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

ডা. সুমন রানা জানান, স্ট্রোকে আক্রান্ত ৪৮ শতাংশ রোগীই উচ্চ রক্তচাপের, ১৯ শতাংশের দেহে অতিরিক্ত মেদ ও ১৭ শতাংশ মানসিক চাপের শিকার। এছাড়া অতিরিক্ত ডায়াবেটিসের কারণেও বাড়ছে স্ট্রোক। 

স্ট্রোক কি?

মস্তিষ্কের রক্তনালি বাধাপ্রাপ্ত হলে কিংবা ছিড়ে রক্তক্ষরণ হলে স্নায়ুকোষে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। এটিই স্ট্রোক বা ব্রেইন অ্যাটাক!

রক্তনালিতে চর্বি বা থ্রম্বাস জমে সরু হয়ে যে স্ট্রোক হয় সেটি ইসকেমিক স্ট্রোক। আর রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে সেটাকে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলে। দ্বিতীয়টির মৃত্যু ঝুঁকি বেশি হলেও আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের জরিপ অনুযায়ী, ৮৭ ভাগ স্ট্রোকই ইসকেমিক ধরনের হয়ে থাকে।  

কিভাবে বুঝবেন? 

আচমকা হাত, পা বা শরীরের কোনো এক দিক অবশ লাগে বা চোখে দেখতে বা কথা বলতে অসুবিধা হলে, 

কিংবা তীব্র মাথা ব্যথা হয় ও হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান–এমন কোনো একটি লক্ষণ দেখার সাথে সাথে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসক এর শরণাপন্ন হোন। এগুলো BE FAST ( Balance, Eye, Face, Arm, Speech & Time) হিসেবে পরিচিত।

হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা-শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্ত সন্ঞ্চালন নিশ্চিত করার পর দ্রুত মাথার সিটি স্ক্যান করে স্ট্রোকের ধরন নির্ণয় করবেন চিকিৎসকগণ। সজনদের উচিত এ সময় রোগীকে মুখে কিছু না খাওয়ানোর চেষ্টা করা এবং এক দিকে কাত করে, বালিশ ছাড়া মাথা নিচু করে শোয়াতে হবে। ওষুধ ও পথ্য নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনে নাকে নল দিতে হতে পারেন। 

তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ‘সুবর্ণ সময়’

সিটি স্ক্যানে ইসকেমিক স্ট্রোক নির্ণয় হলে এন্টিপ্লেটলেট ও এন্টিকোয়াগুলেন্ট ওষুধের পাশাপাশি সম্প্রতি ‘অ্যালটিপ্লেজ’ নামক থ্রোম্বোলাইটিক থেরাপি, যা দ্রুত জমাট বাধা রক্ত গলিয়ে দেয় এবং এটি প্রয়োগের মাধ্যমে সাড়ে চার ঘণ্টা পর্যন্ত মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বা প্যারালাইসিস রোধ করা সম্ভব। এটি স্ট্রোক চিকিৎসার গোল্ডেন আওয়ার বা সুবর্ণ সময় নামে জনপ্রিয়। 

পরবর্তীতে এমআরআই ইমেজের ওপর ভিত্তি করে ৬-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ে এন্ডোভাস্কুলার নিউরোসার্জনগণ না কেটে সরু নলের সহায়তায় জমাট বাধা রক্ত বা চর্বির দলা বের করে আনতে পারেন। এছাড়াও গলায় অবস্থিত ক্যারোটিড ধমনী বেশি সংকুচিত হয়ে গেলে রিট্রাইভার মেশিনের সহায়তায় স্টেনটিং ও বেলুন এনজিওপ্লাস্টি করে মস্তিষ্কের রক্তসঞ্চালন পুনরায় ফিরিয়ে দিতে সক্ষম। উন্নত বিশ্বে প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত মেকানিকাল থ্রম্বেক্টমির চেষ্টা করা হয়, যা এখন ঢাকাতেই  সম্ভব। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে টাইম ইজ ব্রেইন, স্ট্রোকের পর প্রতি মিনিটে ২ মিলিয়ন স্নায়ু কোষ চিরতরে মারা যায়। 

হেমরেজিক বা রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক হলে থ্রোম্বোলাইটিক ওষুধ প্রয়োগে আারও বিপত্তি হবে। রক্তক্ষরণের কারণ নির্ণয় করে, এন্ডোভাস্কুলার নিউরোসার্জনদের দক্ষ টিম এনিউরিজম (রক্তনালির ফোস্কা) ক্লিপিং ও কয়েলিং করতে পারেন। ক্ষেত্র বিশেষে শিশু ও কিশোরদের বিরল রক্তনালির জন্মগত ত্রুটিপূর্ণ গঠন দেখা দিলে তা স্ট্রোকের মত উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়। এসব জটিল ক্ষেত্রে একই সংগে ক্যাথল্যাব এ এন্ডোভাস্কুলার অ্যাপ্রোচের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করে পরে মাথার খুলি হাইস্পিড ড্রিলের মাধ্যমে কেটে বিকৃত রক্তনালি সম্পূর্ণরূপে অপসারণ সম্ভব। নতুন এই দ্বৈত শল্যচিকিৎসা পদ্ধতিকে হাইব্রিড পদ্ধতি বলা হয়। বাংলাদেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগে এই সেবা সম্প্রতি চালু হয়েছে। 

তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য মৃত্যু ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, প্যারালাইসিস প্রতিরোধ এবং পরবর্তী স্ট্রোকের ঝুকি হ্রাস করা৷ সময় মতো যথাযথ চিকিৎসা পেলে শতকরা ৩০ ভাগ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কর্মময় জীবনযাপনে ফিরে যেতে পারবেন। অনেকের স্ট্রোক পরবর্তী পুনর্বাসন প্রোগ্রাম পালন করতে হতে পারে। 

স্ট্রোকের প্রধান কারণ

এ প্রসঙ্গে ঢামেকের নিউরোসায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, 'নানা কারণে স্ট্রোকে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে স্ট্রোক হয়, যা অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।' 

আরও কিছু কারণ 

১. অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ৫০% স্ট্রোক রোগীদের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ থাকে। যারা নিয়মিত উচ্চরক্তচাপের চিকিৎসা করেন না, তাদের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা ৫ গুণ বেশি!  
২. অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
৩. ধূমপানের বদঅভ্যাস
৪. নিয়মিত মদ্যপানের বদঅভ্যাস 
৫. হার্টের অসুখ, রিউমেটিক ভাল্বুলার ডিজিস, অ্যারিদমিয়া
৬. স্ট্রেস ও ডিপ্রেশনসহ অন্যান্য মানসিক সমস্যা 
৭. দিনভর বসে কাজ করা এবং কায়িক শ্রম না করা 
৮. ফাস্ট ফুড বেশি খেলে (বাচ্চাদের ও তরুণদের স্ট্রোকের জন্য দায়ী) 
৯. রক্তে কোলেস্টেরল চর্বি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হলে

বিরল কয়েকটি কারণ

ক. রক্তনালির গঠনগত ত্রুটি (ARTERIOVENOUS MALFORMATION, AVM), 
খ. রক্তরোগ যেমন হাইপারকোয়াগুলোপ্যাথি, 
গ. কোলাজেন সমস্যাগুলো অন্যতম। 

ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের ইসকেমিক স্ট্রোকের আশঙ্কা অনেকটাই বেশি। কারণ ডায়াবেটিস রোগীদের Atherosclerosis বেশি হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি। শরীর এই অতিরিক্ত শর্করাকে Lipogenesis (লাইপোজেনেসিস) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্নেহপদার্থ/চর্বিতে (lipid/fat) পরিণত করে। এই ফ্যাট জমতে থাকে রক্তবাহের ভিতরে। ক্যাথল্যাবে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ক্যারোটড অ্যাথেরেক্টমি বা Endartarectomy হরহামেশাই করা হচ্ছে, যা মেজর স্ট্রোক ও নিশ্চিত পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচাতে পারে। 

ঝুঁকি এড়াতে করণীয়

ডা. শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, 'প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো। স্ট্রোক সম্পূর্ণ প্রতিরোধ ও নিরাময়যোগ্য। স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে ফাস্ট ফুড ও ধূমপান ত্যাগ করা, ব্লাড পেশার আর সুগার থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, লক্ষণ দেখার সঙ্গে সঙ্গে অবহেলা না করে হাসপাতালে নেওয়া ও সর্বোপরি জনসচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ।' 

এ ছাড়াও স্ট্রোক প্রতিরোধে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি। 

ক. ওজন কমাতে সুষম খাবারের উপরেই ভরসা রাখুন। দামি নয়,  দেশি ও সহজলভ্য খাবার দিয়ে থালা সাজান। 
খ. ডায়েটে রাখুন পর্যাপ্ত পরিমাণে সবজি ও দেশি ফল।
গ. সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন আধা-ঘণ্টা করে দ্রুত হাঁটতে হবে বা ২ দিন ১৫০ মিনিট জগিং করতে পারেন।  
ঘ. ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
ঙ. প্রতিদিন অন্তত ৬ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
চ. ব্লাড প্রেশার আর সুগার বেশি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রেখে চলতে হবে।
ছ. শরীরচর্চার সময় খেয়াল রাখতে হবে তা যেন অত্যাধিক পরিশ্রমসাধ্য বা ক্লান্তিকর না হয় 

মাইল্ড স্ট্রোক: সতর্ক সংকেত 

মাইল্ড স্ট্রোক হলো স্ট্রোকের মতো কিছু উপসর্গ, যা কয়েক মিনিটব্যাপী থাকে এবং তৎপরবর্তীতে শরীরের কোনো স্থায়ী দুর্বলতা দেখা যায় না। চিকিৎসা না নিলে মাইল্ডস্ট্রোক পরবর্তীতে রোগীদের প্রতি ১০ জনে ১ জন তিনমাসের মধ্যে মেজর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে একজন স্ট্রোক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চেকআপ করা প্রয়োজন। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : বিশ্ব স্ট্রোক দিবস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত