২৭ অক্টোবর, ২০২২ ০৯:৩২ পিএম

পঙ্গুত্বের প্রধান কারণ স্ট্রোক, প্রতিরোধে জরুরি সচেতনতা ও ভুল ধারণার অপনোদন

পঙ্গুত্বের প্রধান কারণ স্ট্রোক, প্রতিরোধে জরুরি সচেতনতা ও ভুল ধারণার অপনোদন
ডা. মোহাম্মদ রবিউল করিম বলেন, স্ট্রোক হলে হুজুর ডেকে ঝাড়ফুঁক করানো হয়, তাবিজ পড়ানো হয়, পানি পড়া নিয়ে আসা হয়। বলা হয়, এর কোনো চিকিৎসা নেই, হাসপাতালে গেলে লাভ হবে না। এটা ভ্রান্ত ধারণা, মেকানিক্যাল থ্রমবেক্টমি বা কয়েলিং, থ্রিপিং ও এম্বোলাইজেশনের মতো আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে স্ট্রোককে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্ট্রোক এমন একটি রোগ যেটি সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণার শেষ নেই। স্ট্রোক কোন ধরনের রোগ এবং এ রোগের জন্য কোন বিশেষজ্ঞকে দেখাতে হবে, এতটুকু না জানার কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক রোগী। ভ্রান্ত ধারণা বা প্রচলিত মিথ থেকে বের হয়ে আসতে পারলে স্ট্রোক আক্রান্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রবিউল করিম।

বুধবার (২৬ অক্টোবর) বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে ঢামেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের আয়োজনে বৈজ্ঞানিক ওয়ার্কশপ ও সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

অধ্যাপক রবিউল করিম বলেন, স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। কারণ আক্রান্তদের প্রতি সেকেন্ডে ২ মিলিয়ন করে নিউরন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সময় নষ্ট হবে মানে আপনার ব্রেইন নষ্ট হবে।

তাই স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময়ের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, সময়ক্ষেপণ অনেক কারণেই হয়ে থাকে। কেউ হয়তো বুঝতে পারেন না, কেউ অনেক দূরে থাকেন। আবার কেউ হয়তো ডাক্তার পাচ্ছেন না বা চিকিৎসায় তার লম্বা লাইন। বাংলাদেশসহ কিছু অল্পশিক্ষিত দেশে এটা বেশি হচ্ছে। সেটা হলো কিছু ভুল ধারণা, যেটাকে বলা হয় মিথ। এই মিথগুলো বহুল প্রচলিত এবং মানুষের মনে অনেক গভীরভাবে পতিত। এই মিথ দূর করতে গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

মিথ কি?

মিথ হচ্ছে একটি ভ্রান্ত ধারণা। ডিকশনারির ভাষায় a widly health but false belive or idea অর্থাৎ খুবই প্রচলিত কিন্তু মিথ্যা, সেটাই মিথ। তাহলে এ রকম একটি ঘটনার সাথে থাকবে সত্য ঘটনা বা বাস্তবতা। যেখানেই মিথ সেখানেই ফ্যাক্ট। আমরা মিথও জানবো ফ্যাক্ট কি সেটাও জানবো এবং সে আলোকে মানুষকে সচেতন করবো। আজকের পর থেকে স্ট্রোক নিয়ে আমাদের মধ্যে আর কোনো মিথ থাকবে না। আমরা সবাই বার্তাবাহকের মতো সবার মাঝে এটি ছড়িয়ে দেবো। একজন থেকে দশজন সচেতন হবেন এবং দশজন থেকে একশ’ জন সচেতন হবেন। এভাবে আমরা সবাইকে সচেতন করবো।

তিনি বলেন, স্ট্রোক চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সচেতনতা এবং প্রতিকার। স্ট্রোক হচ্ছে পঙ্গুত্বের প্রথম প্রধান কারণ এবং মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। উন্নত বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুবরণ করছে, এক-তৃতীয়াংশ পঙ্গুত্ববরণ করছে এবং মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বেঁচে থাকছে। কাজে আমাদের মধ্যে আর কোনো ভুল ধারণা রাখা যাবে না।

স্ট্রোক নিয়ে মিথসমূহ

অধ্যাপক রবিউল করিম বলেন, স্ট্রোক সম্বন্ধে প্রথম যে ভুলটা প্রচলিত আছে তা হলো, ‘স্ট্রোক হার্টে হয়’। হ্যাঁ, হার্টেও স্ট্রোক হয়, কিন্তু স্ট্রোক বলতে আমরা যেটা বুঝি ব্রেইনের অসুখ। এই ভুলটা আমাদের ভাঙাতে হবে। কেননা স্ট্রোক হার্টে হয়, এটা মনে করে করে সবাই আগে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান এবং ঢাকা শহরের রোগীরা যান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। সেখানে যখন ডাক্তাররা বুঝতে পারেন স্ট্রোক হয়েছে, তখন হয় নিউরোসায়েন্স নতুবা ঢামেক কিংবা বিএসএমএমএউতে পাঠান। এই বিষয়টি আগে থেকে জানা থাকলে সময় অপচয় হবে না এবং সময়মতো সঠিক জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।

‘দ্বিতীয় ভুল ধারণাটি হলো, ‘স্ট্রোকের কোনো ট্রিটমেন্ট নেই। স্ট্রোক হলেই হুজুর ডেকে ঝাড়ফুঁক করানো হয়, তাবিজ পড়ানো হয়, পানি পড়া নিয়ে আসা হয়। এর কোনো চিকিৎসা নেই, হাসপাতালে যেয়ে কোনো লাভ হবে না’। আসলে এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা, মেকানিক্যাল থ্রমবেক্টমি বা কয়েলিং, থ্রিপিং ও এম্বোলাইজেশনের মতো আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে স্ট্রোককে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব’, যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায় না, এটাও একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা। স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণগুলো প্রতিরোধ করা গেলে প্রতিরোধ করা সম্ভব, স্ট্রোকের সংখ্যাটা আমরা কমিয়ে দিতে পারবো।’

ঢামেকের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বলেন, স্ট্রোক শুধু বয়স্কদের হয়, এ কথাটিও ঠিক নয়, স্ট্রোক সব বয়সের হতে পারে। এমনকি বাচ্চাদেরও হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের গর্ভেও শিশু স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। রক্তনালীর কিছু জন্মগত রোগ আছে, যে রোগগুলোর কারণে বাচ্চাদের স্ট্রোক হয়। যেমন, ময়ামায়া ডিজিজ একটি রক্তনালীর জটিলতা, যেটি জন্মগত রোগ, এর কারণেও স্ট্রোক হয়ে যাচ্ছে।

‘পারিবারিকভাবে স্ট্রোক হয় না এটাও একটা ভুল ধারণা। অনেক রোগীকেই দেখা যায়, পারিবারিকভাবেই তার স্ট্রোক হয়ে থাকে। স্ট্রোকের লক্ষণগুলো চলে গেলে আর স্ট্রোক হবে না এটাও একটি ভুল ধারণা। অনেক সময় মিনি স্ট্রোক হয়, যেটাকে আমরা ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক (টিআইএ) বলি। এক্ষেত্রে দেখা যায়, অল্প সময়ের জন্য স্ট্রোকের কোনো একটি চিহ্ন দেখা গেলো এবং অল্প সময়ের মধ্যে তা আবার ঠিক হয়ে গেলো। এর মানে এটা নয় যে, তার আর স্ট্রোক হবে না। বরং অসচেতনতার কারণে অনেক বড় স্ট্রোক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়’, যোগ করেন তিনি।

ডা. রবিউল করিম বলেন, স্ট্রোকের জটিলতা কাটিয়ে উঠতে প্রথম কয়েক মাস হয়, এর পরে আর হয় না, এই ধারণাও ঠিক নয়। ব্রেইনের সুস্থ হওয়াটা অনেক দিন ধরেই চলে। নষ্ট হয়ে যাওয়া সেলগুলো সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে দেখা যায়, স্ট্রোকের লক্ষণগুলো আস্তে আস্তে চলে যায়। বর্তমানে ট্রায়াল বেসিসে চলা আধুনিক চিকিৎসা যেমন স্টেমসেল থেরাপি, যার মাধ্যমে নষ্ট হয়ে সেলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। তেঁতুল খেলে প্রেশার কমে, এটাও একটি গ্রাম্য মিথ। তেঁতুল খেলে কখনো প্রেশার কমে না বরং এই ভুল ধারণায় ডুবে থাকার কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। 

স্ট্রোকের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলো প্রস্তুত নয়

তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্ট্রোকের ভালো চিকিৎসা থাকলেও ১৮ কোটি মানুষের দেশে স্ট্রোকের চিকিৎসায় শুধুমাত্র একটি হাসপতালের পক্ষে একা সামলানো সম্ভব নয়। উন্নত দেশে স্ট্রোকের রোগী হেলিকপ্টারে করে নিয়ে আসে কিংবা নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স থাকে স্ট্রোকের রোগী নিয়ে আসতে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা সম্ভব না। তবে আমরা যদি ঝুঁকি কমিয়ে সুস্থতা আগে নিশ্চিত করতে পারি। তাহলে এই রোগীদের বাঁচানো সম্ভব। ঝুঁকির বিষয়টা সবাইকে জানতে হবে। আমাদের মধ্যে অনেকের ওজন বেশি এবং অনেকেই স্মোক করেন, অনেকেই মানসিক চাপ নেন। আজকে থেকে আপনারাও সচেতন হোন, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যাবে।

স্ট্রোকের লক্ষণসমূহ

স্ট্রোকের চিহ্নগুলো খুব কঠিন বিষয়টি মোটেও এমন নয়। একজন সাধারণ মানুষ কিংবা একজন অশিক্ষিত লোকও এটা বুঝতে পারবে। স্ট্রোকের চিহ্নগুলো হচ্ছে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, চোখের পাতা পরে যাওয়া, মুখ একদিকে বাঁকা হয়ে যাওয়া, হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং কথা বলতে না পারা। এই চারটা কারণের সাথে একটি সচেতনতা, সেটি হলো সময়ক্ষেপণ না করা। এই পাঁচটি বিষয় জানলে স্ট্রোক নিয়ে আর কোনো জটিলতা থাকবে না। গত বছর বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের স্লোগান ছিল, ‘মূল্যবান সময় বাাঁচান’ এবার সেটা পরিবর্তন করে করা হয়েছে ‘সময় বাাঁচানোর শক্তি অর্জন করতে হবে’।

পরিশেষে মূল কথা হলো স্ট্রোকের লক্ষণ, পরিসংখ্যান, ভুল ধারণা, বাস্তবতা এসব কিছু সম্বন্ধে জানতে হবে। তাহলে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : স্ট্রোক
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক