২০ অগাস্ট, ২০২৫ ০৫:৪৭ পিএম

স্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়, জাতীয় অঙ্গীকার: নূরজাহান বেগম

স্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়, জাতীয় অঙ্গীকার: নূরজাহান বেগম
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের শাপলা হলে যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সৌজন্যে।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেছেন, স্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়, এটি সার্বজনীন একটি জাতীয় অঙ্গীকার। স্বাস্থ্যকে সরকারের প্রতিটি নীতির কেন্দ্রে স্থাপন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

আজ বুধবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের শাপলা হলে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা বাড়াতে ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহযোগিতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেয় সরকারের ৩৫টি বিভাগ। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জানান, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় তাদের কর্মপরিকল্পনা দাখিল করবে। একই সাথে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে বলেও জানান তিনি।

নূরজাহান বেগম বলেন, ‘আজকের দিনটি আমাদের জন্য সত্যিই বিশেষ একটি দিন। কারণ আমরা আজ এমন এক প্রতিশ্রুতি নিতে যাচ্ছি—যা কেবল স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং গোটা জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।’

তিনি বলেন, আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাত গত কয়েক দশকে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। যেমন—মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার আমরা কমাতে পেরেছি। টিকাদান কর্মসূচিও আন্তর্জাতিক মহলের প্রশংসা পেয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি নীরব ঘাতক আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটি হলো অসংক্রামক রোগ। এটি এমন একটি বিপদ যা ধীরে ধীরে নিঃশব্দে আমাদের পরিবারকে আঘাত করছে। একই সাথে আমাদের কর্মক্ষম প্রজন্মকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং আমাদের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিকস, স্ট্রোক, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা—এগুলো আজ বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি।’

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আজকের যৌথ ঘোষণার মূল তাৎপর্য এখানেই যে—আমাদের স্বীকার করতে হবে স্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। স্বাস্থ্য সার্বজনীন একটি জাতীয় অঙ্গীকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন একটি পাঠ্যক্রম তৈরি করে, সেখানে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা সম্পর্কে সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় যখন কর্মসূচি ও কার্যক্রম গ্রহণ করে, তখন নিরাপদ প্রোটিনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় যখন নীতি প্রণয়ন করে, সেখানে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে ভাবতে হবে পরিষ্কার বাতাস ও নিরাপদ পানির কথা। সড়ক ও পরিবহন বিভাগকে ভাবতে হবে নিরাপদ চলাচলের কথা। অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়কে দেখতে হবে তাদের সিদ্ধান্ত যেন মানুষের সুস্থতার সহায়ক হয়। যেন কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের স্বাস্থ্য বিপন্ন না হয়।’

‘স্বাস্থ্যকে আমাদের প্রতিটি নীতির কেন্দ্রে স্থাপন করতে হবে। এটিই আমাদের ‘হেলথ ইন অল পলিসিজ দৃষ্টিভঙ্গি’। অর্থাৎ শিক্ষা থেকে পরিবেশ, কৃষি থেকে শিল্প; প্রতিটি খাতেই স্বাস্থ্য হবে প্রথম বিবেচনা’—যোগ করেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, ‘আজকের এই ঘোষণার মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট করে দিচ্ছি, আমরা আর আলাদা আলাদা খাতে বিভক্ত হয়ে কাজ করব না। আমরা কাজ করব একসাথে, এক উদ্দেশ্যে ও এক প্রতিশ্রুতিতে। আমাদের প্রতিজ্ঞা সুস্পষ্ট এবং দৃঢ়।’

তামাকের প্রসঙ্গ তুলে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা প্রতিজ্ঞা করছি তামাক আর বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারবে না। তামাক ও চিনিযুক্ত পানীয়ের পর কর আরোপ করা হবে—যাতে মানুষ ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে সরে আসে এবং প্রজন্ম সুরক্ষিত থাকে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, খাবারের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য বিষ ট্র্যান্সফ্যাট আর মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে দিব না। এর বিরুদ্ধে কঠোর আইন তৈরি ও কার্যকর করব, যাতে প্রতিটি নাগরিক নিরাপদভাবে খাদ্য পেতে পারে।’

‘শহর কিংবা গ্রাম সর্বত্রই খেলার মাঠ, পার্ক, ফুটপাত—দখল বা অব্যবস্থাপনার শিকার হতে দিব না। এগুলো জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে—যাতে শিশুদের হাসি, তরুণদের দৌঁড় ও বৃদ্ধদের হাটা আবারও আমাদের নগর ও গ্রামকে প্রাণবন্ত করে তোলে’—যোগ করেন নূরজাহান বেগম।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রতিজ্ঞাগুলো কেবল একটি অনুষ্ঠানের কথা নয়। এগুলো আমাদের ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। আজকের এই অঙ্গীকার হলো একটি নতুন পথচলা সুস্থ, সচেতন ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশের দিকে। এই ঘোষণা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ রাখব না। 

তিনি বলেন, অসংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের সবার লড়াই। এ লড়াই কেবল হাসপাতাল বা ওষুধের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি হবে সচেতনতা, শিক্ষা, জীবনযাপনের পরিবর্তন ও সমন্বিত নীতির মাধ্যমে। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার একা এ যুদ্ধে জিততে পারবে না। জনগণকেও এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।’

এ সময় অভিভাবক ও তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নূরজাহান বেগম বলেন, ‘আপনার সন্তানের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন। প্রতিটি বাবাকে বলি, তামাককে না বলুন। প্রতিটি তরুণকে বলি, নিজের শরীরকে সক্রিয় রাখুন।’

একই সাথে কর্মস্থলকে স্বাস্থ্যবান্ধব রাখতে প্রতিষ্ঠানগুরোকে আহ্বান জানান তিনি। উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যদি একত্র হই, তবে কোনো মহামারী আমাদের পরাজিত করতে পারবে না। আমাদের পূর্বসূরী ও বর্তমান প্রজন্ম বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, সমাজ গঠনের জন্য লড়েছেন। আমরা আজও লড়ছি সুস্থতার জন্য। এই লড়াই জিততে হবে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য, আমাদের অগ্রগতির জন্য।’

যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক