কক্সবাজার মেডিকেলে হাসপাতাল নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন সরকারের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে (কমেক) হাসপাতাল নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পর ৫০০ শয্যার হাসপাতাল পেতে যাচ্ছে মেডিকেল কলেজটি। গত মঙ্গলবার (২০ মে) সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির (সিসিজিপি) ২০তম সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
২০০৮ সালে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পাশে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শুরু হয় কমেকের একাডেমিক কার্যক্রম। এরপর দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৭ সালে ঝিলংজা ইউনিয়নে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শুরু হয় শ্রেণি কার্যক্রম। কিন্তু হাসপাতাল না থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাস করতে যেতে হয় ১০ কিলোমিটার দূরে জেলা সদর হাসপাতালে।
২০২২ সালের ২২ আগস্ট মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। কিন্তু পরে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তবে এর আগে থেকেই ‘কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাস্তবায়ন চাই’ ব্যানারে ৫০০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ, গত ১৩ মার্চ দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ সময় দ্রুত হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরু করার জোর দাবি জানানো হয়। পরে একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবর একটি স্মারকলিপিও প্রদান করেন এসব শিক্ষার্থী।
হাসপাতাল বাস্তবায়ন আন্দোলনের সহ-উদ্যোক্তা ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র মো. হুসাইনুল আলম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘২০২২ সালের ২২ আগস্ট হাসপাতালটি প্রথমবারের মতো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি—স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে বিষয়টি আটকে যায়।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে কলেজের সকল অধ্যক্ষই হাসপাতালের অনুমোদন আনার চেষ্টা করেছেন। সবশেষে বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সোহেল বকস স্যারের মাধ্যমে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।’
‘কমেক অধ্যক্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ অনুমোদন আনতে সক্ষম হয়েছেন’—যোগ করেন তিনি।
আন্দোলনের উদ্যোক্তা ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আদনান সিদ্দীকি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আমাদের অধ্যক্ষ স্যারের হাত ধরে ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুত হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হবে। স্যারের আপ্রাণ প্রচেষ্টার ফলে ১৭ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। আমরা, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতাল বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছিলাম। অবশেষে আমাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।’
হাসপাতাল বাস্তবায়নের দাবিতে পাশে থাকা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।
আরেক উদ্যোক্তা ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আসিবুল হক জানান, ৫ আগস্টের পর থেকেই কলেজের বিভিন্ন দিক সংস্কারের বিষয় নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। অনেকগুলো বিষয়ে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলেও একটি বিষয় বারবার সামনে আসে—এই মেডিকেল কলেজের নিজস্ব কোনো হাসপাতাল নেই।
তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল নেই এমন অবস্থা যেন স্থায়ী হয়ে গেছে। এমনকি অনেকে বলছিলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর হাসপাতাল আর হবে না। ফাইল কিছুটা এগোলেও সেটি এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ বলা হচ্ছিল, সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই।’
আসিবুল হক জানান, ক্যাম্পাসের সামনের খালি মাঠ দেখলেই মনে হতো—এই মাঠেই যদি একদিন হাসপাতাল হয়! এমন সময় খবর আসে, প্রধান উপদেষ্টা ডা. মুহাম্মদ ইউনুস কক্সবাজারে আসছেন। সহকারী অধ্যাপক ডা. এম. ফরহাদ তাদের পরামর্শ দেন, যেন তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। নানা চেষ্টায় ব্যর্থ হলে তারা সিদ্ধান্ত নেন, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অফিসে গিয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেবেন। একইসঙ্গে ডা. এম. ফরহাদ যেহেতু উপদেষ্টার চিকিৎসা দলে ছিলেন, তাই তিনি যেন উপযুক্ত সময় পেলে সেটি উপদেষ্টার হাতে তুলে দেন।
তিনি বলেন, ‘এই হাসপাতাল না থাকার বিষয়টি তখন কক্সবাজারবাসীর অনেকেই জানতেন না। সাংবাদিক, শিক্ষিত শ্রেণি কিংবা শহরের প্রভাবশালীরাও তেমন আগ্রহ দেখাননি। কেবল কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীর পরিবারের সদস্যরা জানতেন, এখানে একটি ডায়ালাইসিস ইউনিট পর্যন্ত নেই।’
এই বাস্তবতা বদলাতে তারা সংবাদ সম্মেলন করেন এবং একটি সাধারণ পোস্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রচার শুরু করেন। এতে কক্সবাজারবাসীর অনেকেই বিষয়টি জানতে পারেন এবং ৫০০ শয্যার একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তাদের মৌলিক দাবির অংশ হয়ে ওঠে। তবে হতাশা আসে প্রধান উপদেষ্টার মতবিনিময় সভায়।
আসিবুল হক বলেন, ‘সভায় তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলেন, নতুন হাসপাতাল করে কী হবে? ডাক্তার তো থাকবে না। বরং আপনারা একটি বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে তুলুন। আসলে তিনি ভুল বুঝেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এটি নতুন কোনো আধুনিক বেসরকারি হাসপাতালের প্রস্তাব। এই মন্তব্যে আন্দোলনের গতি কিছুটা থমকে গেলেও শিক্ষার্থীরা হাল ছাড়েননি। তারা একটি ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ খুলে হাসপাতাল বাস্তবায়নের দাবিগুলো ধরে রাখেন এবং চেষ্টা চালিয়ে যান।’
কিছুদিন আগে বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান, স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। তখন তারা জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যেই সরকারের নজরে এসেছে এবং দ্রুতই অনুমোদন দেওয়া হবে।
আসিবুল হক বলেন, ‘১৭ বছর ধরে আমরা শুধু আশার বাণী শুনে এসেছি। এবারও খুব বেশি আশা করিনি। কিন্তু সত্যিই যখন অনুমোদনের খবর এলো, তখনও আমাদের মনে পরিপূর্ণ আনন্দ আসেনি। কারণ, আমরা সফল হবো তখনই, যখন শিক্ষার্থীরা কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে বসে ক্লাস করবে।’
তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জ ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো অনেক জায়গায় ভবন শেষ হলেও কার্যক্রম শুরু হতে সময় লেগেছে। তাই কেবল অনুমোদন নয়, সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও কথা জানান তিনি।
কক্সবাজারের মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘গত ৯ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভিআইপি কক্ষে হঠাৎ কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সোহেল বকসের সঙ্গে দেখা হয়। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে কক্সবাজার মেডিকেলের বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন, হাসপাতালের বহুতল ভবন নির্মাণের ফাইলটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। সেখান থেকে তা সিসিজিপিতে পাঠাতে হবে। সিসিজিপি অনুমোদন দিলে কাজ শুরু করা যাবে।’
তিনি বলেন, ‘এ কথা শোনার পর আমি তাৎক্ষণিকভাবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিয়ে এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতা করে গেছেন। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের প্রস্তাব সিসিজিপিতে অনুমোদন পেয়েছে—এটা জেনে খুব ভালো লাগল। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।’
কমেক হাসপাতালের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু হবে এবং এই হাসপাতাল কক্সবাজারবাসীর স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন তিনি।
টিআই/এনএআর/
-
১০ জুন, ২০২৬
-
০২ এপ্রিল, ২০২৬
-
০৭ মার্চ, ২০২৫
-
২৩ জানুয়ারী, ২০২৫
-
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২
-
২৪ জুন, ২০২১
-
২৭ জানুয়ারী, ২০২১