স্বাস্থ্যমন্ত্রী
‘এসডিজি অর্জনে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা, পুষ্টি, সমাজকল্যাণ, নারী ও শিশু সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলাসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনা সম্পর্কিত জাতীয় সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত এসডিজি অর্জনের লক্ষ্য কঠিন হলেও তা অসম্ভব নয়। তবে এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু একটি মন্ত্রণালয় বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এর সঙ্গে পানি, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, খাদ্য ও পুষ্টি, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং পরিবেশসহ অনেক বিষয় সরাসরি সম্পর্কিত। এসডিজির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এসব খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় জোর
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স ও ওষুধের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ওষুধ দেব, চিকিৎসক দেব, নার্স দেব, হাসপাতাল তৈরি করব—এসব প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ যাতে অসুস্থই না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে না পারলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ক্রমাগত বাড়বে।’
হাত ধোয়া, নখ পরিষ্কার রাখা, নিরাপদ খাবার গ্রহণ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক ভাইরাসজনিত রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি জনগণকে রোগ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে শিক্ষিত করতে হবে।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান
দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ পানির সংকটের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। খুলনা, শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব এলাকায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ও হলুদাভ পানি ব্যবহার করছে। এর ফলে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘সেখানে শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বানিয়ে বা ওষুধ দিয়ে কীভাবে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব? পানির সমস্যার সমাধানও করতে হবে।’
পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার ওপর জোর দেন তিনি।
শিশুদের স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতার আহ্বান
শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, অল্প বয়সী শিশুদের দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোনে গেম খেলা বা ভিডিও দেখার অভ্যাস নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক নয়, মানুষের জীবনযাপন ও অভ্যাসের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত।
বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে গর্ভধারণ বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে গর্ভধারণকে নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিও। অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণের কারণে মা ও শিশু উভয়েই নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।’
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
মাতৃদুগ্ধ ও শিশুপুষ্টিতে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
হাসপাতাল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ডায়রিয়া ও অপুষ্টির পেছনে ভুল খাদ্যাভ্যাস ভূমিকা রাখছে।
শিশুর জন্মের পর মায়ের বুকের দুধের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মায়েদের যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিশুকে সঠিকভাবে খাওয়ানোর বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
তিনি বলেন, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু নিউমোনিয়া বা অন্য কোনো সংক্রমণে আক্রান্ত হলে তার সুস্থ হয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি খাদ্য ও পুষ্টির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ফাস্টফুডের পরিবর্তে পুষ্টিকর খাবারে গুরুত্ব
শিশুদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলেও শিশুদের মধ্যে ফাস্টফুডের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। শিশুদের শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম, দুধসহ পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়ানোর বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দুই মাস পরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় সভার প্রস্তাব
এসডিজি অর্জনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নিয়মিত সমন্বয় সভায় বসার প্রস্তাব দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বছরে একবার বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করে এসডিজির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
তার প্রস্তাব, অন্তত দুই মাস পরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নিয়ে বৈঠক করে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা উচিত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, সমন্বিত বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত মূল্যায়ন।’
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স ও ওষুধের ওপর নির্ভর করে না। নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পুষ্টি, শিক্ষা, সচেতনতা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা—সবকিছু মিলেই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে।
এসডিজি অর্জনে ‘ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যানিং, কো-অর্ডিনেটেড এফোর্ট এবং ইন্টিগ্রেটেড সলিউশন’-এর মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এমআই/