২৭ জুলাই, ২০২৩ ০৯:১৩ পিএম

সলিমুল্লাহ মেডিকেলের দুই চিকিৎসকের ওপর হামলা, মুচলেকায় হামলাকারীদের ছাড়

সলিমুল্লাহ মেডিকেলের দুই চিকিৎসকের ওপর হামলা, মুচলেকায় হামলাকারীদের ছাড়
বামে ও মাঝখানে ডা. পার্থ সেন, ডানে ডা. রাফি। ছবি: সংগৃহীত

আবু নাঈম মনির: রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিডফোর্ট হাসপাতালের দুইজন চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (২৫ জুলাই) রাত সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় একজন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী ও একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক গুরুতর আহত হয়েছেন।

জানা গেছে, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে এক বৃদ্ধ রোগীকে নিজের পরিচালিত একটি আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে দলবল নিয়ে সলিমুল্লাহ মেডিকেলে যান মিল্টন সমাদ্দার নামে এক ব্যক্তি। হাসপাতালে গিয়ে সঙ্গীদের সহায়তায় বৃদ্ধকে মাটিতে শুইয়ে ভিডিও ফুটেজ ধারণ করতে থাকেন তিনি। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ছবি তুলতে নিষেধ করলে পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী ডা. পার্থ সেন ও সলিমুল্লাহর ৪৪তম ব্যাচের ইন্টার্ন চিকিৎসক রাফির ওপর সদলবলে চড়াও হন তিনি। হামলায় চিকিৎসকরা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।

খবর পেয়ে ছাত্রাবাসে অবস্থানরত মেডিকেল শিক্ষার্থী ও নবীন চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় হামলাকারীদের একটি দল প্রাইভেট কার এবং একাধিক বাইকে করে পালিয়ে যায়। তবে মিল্টন সমাদ্দার এবং সঙ্গে থাকা ১২-১৫ জনকে বহনকারী দ্বিতীয় কারটি আটকে ফেলেন তাঁরা।

খবর পেয়ে কোতোয়ালী থানা পুলিশের সদস্য সেখানে গেলে তাদেরকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে তাদেরকে থানার হাজতে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। পরে নিজেদের ভুল স্বীকার এবং দুঃখ প্রকাশ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ রকম কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবেন না—এমন মুচলেকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

সলিমুল্লাহ মেডিকেলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো ও চিকিৎসকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের কথা স্বীকার করে পরবর্তীতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট দেন মিলটন সমাদ্দার।

এতে তিনি বলেন, ‘গত ২৫ জুলাই রাতে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের গ্রুপ থেকে মিটফোর্ড হসপিটালের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং এখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার এবং ডাক্তারদের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অধিকতর তদন্তে আমরা প্রমাণ পাই যে সেই তথ্যগুলো ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং গুজব। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পরবর্তীতে হাসপাতালের প্রশাসন এবং চিকিৎসকদের সহায়তায় বিষয়টির একটি সুষ্ঠু সমাধান করা হয়েছে। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কোন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব হবে না আর এ ব্যাপারে আমরা সর্বাত্মক সচেষ্ট থাকবো। মিটফোর্ড হসপিটালের সাথে পরবর্তীতে আমাদের সর্বদা সুসম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার যে জায়গা তৈরি হলো সেটা ভবিষ্যতে বজায় থাকবে।’

জানতে চাইলে হামলার শিকার এফসিপিএস পার্ট-২ এর প্রশিক্ষণার্থী ডা. পার্থ সেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘হামলাকারীরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভিডিও করছিলেন। নিষেধ করলে তারা আমাদের ওপর চড়াও হন। হামলায় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। হুঁশ ফেরার পর জানতে পারি, হামলার খবর পেয়ে আমাদের ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে ছুটে এসে তাদের একাংশকে আটকাতে সক্ষম হয়েছে।’

স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো চাই না, হাসপাতালে এভাবে হামলার ঘটনা ঘটুক।’ নিরাপত্তার অপ্রতুলতার কথা জানিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান তিনি।

নিজের ওপর আঘাতের তীব্রতার বর্ণনা দিয়ে ডা. পার্থ বলেন, ‘চেহারা, পিঠ ও কাঁধসহ শরীরের একাধিক স্থানে আঘাত পেয়েছি। পিঠে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। হাত-পা নড়া-চড়া করতে গেলেই ব্যথা অনুভূত হয়। খাবার খেতে অসুবিধা হচ্ছে।’

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিডফোর্ট হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রশিদ-উন-নবী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তারা যখন হাসপাতালে আসেন, তখন নিজেদের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট দিয়ে আসেন যে, আমরা যাচ্ছি সলিমুল্লাহ মেডিকেলে রোগীর চিকিৎসার নিশ্চিয়তা বিধানে। এটা কোনো কথা হলো? যেখানে চিকিৎসকরা রাত-দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, সেখানে এই ধরনের পোস্ট কতটা হাস্যকর! এই ধরনের পোস্ট দিয়ে হাসপাতালে এসে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর সদলবলে হামলা চালালেন তারা।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা ভুল স্বীকার করে মুচলেকা দেওয়ার পর থানা থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে তারা বলেছে, ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবে না। হামলাকারীদের দাবি, তারা চ্যারিটির কাজে যুক্ত।’

হাসপাতালের নিরাপত্তা প্রহরার বিষয়ে জানতে চাইলে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিডফোর্ট হাসপাতালের পরিচালক বলেন, হাসপাতালের নিরাপত্তা দলে ৮০ জন আনসার সদস্য আছেন, সেখানে গড়ে প্রতিদিন সাপ্তাহিক ও নৈমিত্তিক ছুটিতে থাকেন ২০ জন। নিরাপত্তা কর্মী বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এজন্য তাদের থাকার জায়গা দরকার, এর অভাব আছে।

রাতে বহির্বিভাগের রোগীদের চাপ কম থাকায় বেশি নিরাপত্তা কর্মী থাকেন না জানিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রশিদ-উন-নবী বলেন, রাত ১২টার পরে এ সংখ্যা আরও কমে যায়। তখন প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে আনসার সদস্য থাকেন। গেটে একজন সদস্য। কিন্তু ওরা তো শক্তি প্রদর্শনের জন্য বিশাল দল নিয়ে এসেছে।

আহত চিকিৎসকদের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসাধানী আছেন। আশা করছি, ২/১ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হবেন।

এসএএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসক নিগ্রহ
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক