২৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৬:৩০ পিএম

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে ডাকসুর আলোচনা ও বিনামূল্যে পরীক্ষার উদ্যোগ

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে ডাকসুর আলোচনা ও বিনামূল্যে পরীক্ষার উদ্যোগ
ডাকসু ও বারডেমের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে প্রতি আট জনে একজন নারী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে এটি এখন আর মৃত্যু ঘটানোর মতো রোগ নয়, বরং সচেতনতার মাধ্যমে এ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।

স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস উদযাপন উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং বারডেম হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

একই সঙ্গে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রী এবং তাদের মা ও বোনদের বিনামূল্যে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে স্তন পরীক্ষা এবং প্রায় অর্ধেক মূল্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ম্যামোগ্রামের ব্যবস্থা করার কথা জানায় ডাকসু।

সম্পৃক্ত হতে পেরে কৃতজ্ঞ বারডেম

অনুষ্ঠানে বারডেম হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘এ রকম একটি উদ্যোগে সম্পৃক্ত হতে পেরে আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এটা সচেতনতামূলক কর্মসূচি। এখান থেকে যাদেরই প্রয়োজন আছে, আমাদের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা দেখার পর তাদের প্রয়োজন হলে কিছু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেবেন। আমরা খুবই কমমূল্যে পরীক্ষার সুযোগ দিচ্ছি। প্রয়োজনে আরও কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছি। আশা করি, আমাদের ছোট্ট প্রয়াসে আপনারা সম্পৃক্ত হবেন।’

বারডেম অফিসার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোর্শেদ উদ্দিন আকন্দ বলেন, ‘চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমরা অবহেলিত থাকতে চাই না। ক্যান্সার দুরারোগ্য ব্যাধি। সচেতনার মাধ্যমে এ থেকে আমাদের উতরে যেতে হবে। সচেতনতা বাড়ানো গেলেই মৃত্যু হার কমে আসবে। এটা অনেকখানি কমে এসেছে। স্তন ক্যান্সার এমন একটি ক্যান্সার, যে কারণে মা-বোনেরা লজ্জা ও সংকোচে বলতে দ্বিধা করেন। এই বৃত্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। আমাদের কাছে যখন রোগীরা আসেন, তখন অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। তখন চিকিৎসা করে ভালো ফল পাওয়া যায় না। সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করা গেলে সারাজীবনের জন্য এ থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি।’

লজ্জা ছেড়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ

লজ্জা-সংকোচ থেকে বেরিয়ে এসে রোগকে রোগ হিসেবে চিন্তা করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে ঢাবির খুব কাছের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বারডেম এগিয়ে না এলে এ সচেতনতা কাজে আসবে না। আমরা সচেতনতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাই। আপনারা যে কোনো সময় আসবেন।’

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সহযোগিতায় এই আয়োজনে অংশ নেন অধ্যয়নরত ১২শ’ শিক্ষার্থী, যাদের অধিকাংশই নারী।

ডাকসু নেতৃবৃন্দের ভূয়সী প্রশংসা

অনুষ্ঠানে বারডেম অফিসার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, যে কোনো রোগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা। সচেতনতার মধ্যে দুটি বিষয় আছে, এক. স অর্থাৎ নিজ আর চেতনা অর্থাৎ নিজের উপলব্ধি। এই চেতনা আসবে জ্ঞান থেকে। সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যই আপনাদের কিছু জ্ঞান দেওয়া। স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা ক্ষেত্রেও সচেতনতা খুব জরুরি।

এ রকম ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য ডাকসু নেতৃবৃন্দের ভূয়সী প্রশংসা করেন ডা. আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, আজ এতো বছর পর মনে হচ্ছে, ডাকসু সেই কাজটাই করছে, যা আরও অনেক আগে থেকেই করা দরকার ছিল।

আটজনে একজন নারী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে 

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শর্মিষ্ঠা রায় স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত বিশ্ব বরেণ্য একাধিক নারীর ক্যান্সার সম্পর্কে তাদের গৃহীত সচেতনতা কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্তন ক্যান্সার থেকে সুরক্ষায় ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক শর্মিষ্ঠা রায় বলেন, ‘আমাদের দেশের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি আট জনে একজন নারী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাহলে প্রতি এক হাজার নারীর মধ্যে প্রায় একশ’ জনের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটা ভীতিকর! এ থেকে সুরক্ষা পেতে সচেতনতা খুব প্রয়োজন।’

‘মনে রাখতে হবে, এটা এখন আর মৃত্যুর কারণ নয়, বরং একটি রোগ। এটা শনাক্ত করতে হবে, লড়াই করতে হবে এবং পরাজিত করতে হবে। সুতরা সচেতনতার মাধ্যমে এ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। আমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করবো। সচেতনতার তথ্যগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবো। কারণ একত্রে আমরা শক্তিশালী’—বলেন ডা. শর্মিষ্ঠা রায়।

এ সময় বিশ বছরের উপরের নারীদের প্রতি মাসে সেলফ ব্রেস্ট পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন তিনি।

স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে পুরুষরাও

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহমুদা জয়া বলেন, ‘শুধু মহিলা না পুরুষরাও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। যেহেতু পুরুষরা এ ব্যাপারে সচেতন থাকেন না, তারা ধরেই নেন এটা নারীদের রোগ। ফলে তারা কখনোই সেভাবে পরীক্ষা করান না। আমার কর্মজীবনে যে কয়জন পুরুষকে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় পেয়েছি, দুঃখজনকভাবে পরিণতি ভালো কিছু ছিল না। কারণ চিকিৎসা ছিল বিলম্বিত। রোগটা অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর তারা এসেছেন।’

এক গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি ১৩৮ জন পুরুষের মধ্যে একজন স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।’

ডাকসুকে সহকারী প্রক্টরের ধন্যবাদ

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন মোনামি বলেন, ‘বারডেমের সঙ্গে কোলাবরেট করে এতো তথ্যবহুল একটি সেশন এবং ফ্রি মেডিকেল চেক আপের ব্যবস্থা করার জন্য ডাকসুকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমরা সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে আছি, কিন্তু সকলের জন্য আছি কিনা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সেখানে ডাকুস অনেক ভালো ভালো পদক্ষেপ নিচ্ছে।’

এ ধরনের সচেতনতামূলক প্রোগ্রামের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ডাকসু সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে ছাত্রী হলের মিটিংয়ে কিছু খোলা কাগজ ছেড়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আপনাদের যে কোনো প্রয়োজনের কথা লিখে দেন, এগুলো পরে পর্যালোচনা করে কাজে লাগাবো।’

ইশতেহারের বাইরেও কাজ করছে ডাকসু

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন কিছু কাজ করছি, যেগুলো আমাদের ইশতেহারে ছিল না। এটাও এমনই একটি প্রোগ্রাম। আমরা ওই খোলা কাগজের চিরকুট খুঁজে পেয়েছি, কোনো এক বোন লিখেছেন যে, এই জিনিসটা তাদের দরকার। তখন আমি ফিল করলাম, আমার বাসায়ও তো ছোট বোন আছে, আমারও মা আছে। আমি আমার ছোট বোনের জন্য যেটা ফিল করি, সেটা যদি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীর জন্য না করি, তাহলে আমি তার প্রতিনিধি হওয়ার জন্য অযোগ্য।’

‘চিরকুটের প্রস্তাবনায় যেসব বিষয় পেয়েছি, সেগুলো আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এর মধ্যে একটি  ছিল, রিডিং রুমে তারা পড়তে পারেন না, এসি নেই। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে গতকাল দুটি হলে কাজ শুরু হয়েছে বঙ্গমাতা ও কুয়েত মৈত্রীতে। বাইরের স্পন্সরে এই কাজগুলো হবে’—যোগ করেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক।

অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক পরিসংখ্যানের উদ্বৃতি দিয়ে ডাকসুর ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, ‘ডব্লিউএইচওর ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ছয় লাখ সত্তর হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে মারা গেছেন। বর্তমানে ১৫৭টি দেশের নারীরা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত। বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ নারী এই রোগে ভুগছেন। অথচ এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এ সংকোচ ভেঙে দিতেই আজকের এই আয়োজন।’

এ সময় ডাকসুর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, ‘আমাদের অঙ্গীকার ছিল আমরা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো। এর অংশ হিসেবে প্রতি মাসে হেলথ ক্যাম্প শুরু হয়েছে। গত মাসে জগন্নাথ ও শামসুন্নাহার হলে শুরু করেছি এবং এ ক্যাম্প প্রতি মাসে চলবে। একই সাথে বেসরকারি মেডিকেলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্বারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করছি। বিভিন্ন মেডিকেলের সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে। বারডেমের সঙ্গে কথা হয়েছে। সর্বোচ্চ ছাড়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা ও বোনেরা যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান।’

ঢাবির মেডিকেল সেন্টারের কর্মী সংখ্যা ৯৬

ডাকসুর ভিপি বলেন, ‘আমাদের মেডিকেল সেন্টারের জন্য আমরা কাজ করছি। এ সেন্টারে বিশাল সিন্ডিকেট। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের স্টাফ সংখ্যা কত জানেন? ৯৬ জন। কিন্তু ওখানে গিয়ে সাতজনকেও পাবেন না এবং আমাদের মেডিকেল সেন্টারের ইমার্জেন্সি ছিল দুইতলায়। সারাবিশ্বের সম্ভবত একমাত্র মেডিকেল সেন্টার এটি, যার জরুরি বিভাগ দুইতলায়। রোগী সেখানে যেতে যেতে মারা যাবে। আমরা আসার পর সিন্ডিকেটসহ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি, এর আগেও আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলী কাজ করছিলেন। বিভিন্ন অংশীজনরা কাজ করেছেন, তুরস্কের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। খুব দ্রুতই যন্ত্রপাতি চলে আসবে। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, অ্যাম্বুলেন্স, এসি ও শয্যাসহ যা যা দরকার ...। আমরা আমাদের মেডিকেল সেন্টারকে আধুনিকায়ন করবো। মেডিকেল সেন্টারে যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, তা আপনাদেরকে সাথে নিয়ে ভেঙে দেবো ইনশাল্লাহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বোনদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আসেন, এটা আমাদের খুব ভালো। আমাদের মায়েদেরও কিচিৎসা সংক্রান্ত সহযোগিতা দরকার, আমরা কথা দিচ্ছি, চিকিৎসাসহ যে কোনো বিষয়ে আপনাদের পরিবারের সদস্যরা যেভাবে পাশে থাকে, সেভাবে আপনাদের পাশে থাকবো।’

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রীরা বিনামূল্যে বারডেমে স্তন পরীক্ষা করাতে পারবেন। একই সঙ্গে মাত্র এক হাজার টাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাম, যার স্বাভাবিক মূল্য ১৫০০ টাকা এবং এক সপ্তাহের জন্য ২৫০০ টাকার ম্যামোগ্রাম মাত্র ১৫০০ টাকায় করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মা ও বোনেরাও নির্ধারিত সময়ে এই সুবিধা নিতে পারবেন।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ডাকসু
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত