১৮ অগাস্ট, ২০২৫ ০৭:১০ পিএম

জুলাই অভ্যুত্থান-মাইলস্টোন ট্রাজেডি: মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বারোপ

জুলাই অভ্যুত্থান-মাইলস্টোন ট্রাজেডি: মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বারোপ
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত এবং মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আজ সোমবার (১৮ আগস্ট) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘বিয়ন্ড দ্য হেডলাইনস: মেন্টাল হেলথ কন্সিকোয়েন্সেস অব দ্য জুলাই আপরাইজিং অ্যান্ড মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি’ শীর্ষক সেমিনার তারা এসব কথা জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ব্লক অডিটোরিয়ামে ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল সেমিনার সাব-কমিটির উদ্যোগে এই সেমিনার আয়োজিত হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোর্শেদ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান তাদের গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সেমিনারে জানানো হয়, জুলাই আহতদের ৮২.৫% তরুণ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। এ ছাড়া ৬৪ শতাংশ তীব্র আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপে (পিটিএসডি) ভুগছেন।

‘ইম্প্যাক্ট অব ট্রমা অ্যান্ড ভায়োলেন্স অ্যামং চাইল্ড অ্যান্ড এডোলোসেন্ট পপুলেশন’ শীর্ষক প্রবন্ধে অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোর্শেদ জানান, শৈশবের ট্রমা ও সহিংসতা শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দিলে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক রোগ ও আচরণগত সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শিশুর মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করেন, সাইকোলজিক্যাল ফাস্ট এইড প্রদান করেন, প্রমাণভিত্তিক থেরাপি প্রয়োগ করেন, প্রয়োজনে ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থা সমন্বয় করেন এবং পরিবার, শিক্ষক ও কমিউনিটিকে নিয়ে সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

‘প্রকৃতপক্ষে, সহানুভূতিশীল পরিবার, সচেতন শিক্ষক এবং নিরাপদ সমাজ একসাথে কাজ করলে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা তৈরি হয়’—যোগ করেন তিনি।

অধ্যাপক নাহিদ মাহজাবিন বলেন, ‘অভিভাবক, শিক্ষক ও যত্নদাতাদের আহ্বান জানাই, শিশুর মানসিক কষ্ট বা পরিবর্তন লক্ষ করলে দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। দ্রুত হস্তক্ষেপ মানে ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধ। মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা শুধু চিকিৎসকই নয়, তারা শিশুদের জন্য সহায়ক, পথপ্রদর্শক এবং ভবিষ্যৎ রক্ষাকারী।’

‘মেন্টাল হেলথ ইম্প্যাক্ট অব ভায়োলেন্স অ্যান্ড ট্রমা’ শীর্ষক প্রবন্ধে ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের মধ্যে বিএমইউ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (নিটোর) এবং জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২১৭ জন রোগীর মাঝে বিষণ্ণতার হার পাওয়া গেছে ৮২.৫ শতাংশ। একই সাথে তীব্র আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপে (পিটিএসডি) ভোগা মানুষের হার ৬৪ শতাংশ। তাদের মধ্যে অনেকই বিষণ্ণতা ও পিটিএসডি—এই উভয় সমস্যায় ভুগছেন।

তিনি জানান, আহতদের মধ্যে যারা গ্রামীণ এলাকার রোগী তারা নিজেদেরকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন ও তারা অধিকমাত্রায় উদ্বিগ্ন। তাদের ধারণা, হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার পরে তারা যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাবেন না। সেই কারণে সার্বজনীন শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে তৈরি করা জরুরি।

মাইলস্টোন ট্রাজেডি সম্পর্কে তিনি বলেন, এতে যারা ভুগছেন—তাদের জন্য ইতোমধ্যে বিএমইউ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ), স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাজেদা ফাউন্ডেশন ও ব্র্যাকের সমন্বয়ে মানসিক স্বাস্থ্য টিম গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ টিম প্রাথমিক প্রতিরোধের উপর কাজ করবে। বিশেষ করে যাদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হয়নি, তাদের যেন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা না হয়, সেদিকে মনোনিবেশ করবেন। এক্ষেত্রে কাউন্সিলিং, গ্রুপ সেশন ও প্রয়োজনে কিছু ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। আর যারা বার্ন ভিক্টিম, ইনজুরড তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিরূপণ করা ও চিকিৎসা দেওয়া হবে। আর পূর্বে থেকেই যদি কারো মানসিক সমস্যা থাকে তাহলে সেটা যাতে আর বৃদ্ধি না পায় সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া।

ডা. শামসুল আহসান আরও জানান, মাইলস্টোন ট্রাজেডিতে আক্রান্তদের মানসিক সহায়তার জন্য হটলাইনে সেবা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং বিএমইউর ডাক্তাররাও এর অংশ। সবার ও সকল প্রচেষ্টার একটাই লক্ষ্য তা হলো মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির শিকার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবকদের সাইকোথেরাপিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।

সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, ট্রমা, ভায়ালেন্স, এবং মেন্টাল ইলনেস প্রতিরোধের জন্য পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। একই সাথে মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলে আরও দায়িত্ববান ও যত্নশীল হতে হবে।

সেন্ট্রাল সাব-কমিটির সদস্য সচিব ডা. খালেদ মাহবুব মোর্শেদ মামুনের সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সাব-কমিটির চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেসা।

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত