অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন

চেয়ারম্যান, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বিএমইউ


১৮ অগাস্ট, ২০২৫ ০৭:১৬ পিএম

শুধু ডাক্তারদের নয়, সব পেশার জবাবদিহি দরকার

শুধু ডাক্তারদের নয়, সব পেশার জবাবদিহি দরকার
ছবি: মেডিভয়েস

শুধু চিকিৎসকদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ এই একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি মূলত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত সংকট আড়াল করে, বাড়ায় সংকটের মাত্রা। আমি মনে করি, সব পেশাতেই অনিয়ম ও দুর্নীতি আছে। তাই প্রয়োজন সবার জন্য সমান স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। চিকিৎসকদের সমস্যাকে সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করাই সময়ের দাবি।

একচোখা দৃষ্টিভঙ্গির বিপদ

দেশের প্রায় প্রতিটি পেশাতে সংকট বিদ্যমান। এ অবস্থায় শুধুমাত্র স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিকিৎসকদের একাংশের ভুলগুলো নিয়ে শোরগোল অনাকাঙিক্ষত। এই একচোখা ‍দৃষ্টিভঙ্গি সমস্যার ঘা বাড়ানো ছাড়া কমাবে না। 

জানতে ইচ্ছা করে, সব পেশাকে অসঙ্গতি থাকার পরও কী শুধু ডাক্তারদেরকেই জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে?

আইনজীবীরা কি নিজেদের ভেতরের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন?

স্থপতিরা কি সবসময় তাঁদের ব্যর্থতা স্বীকার করেন?

ঘুষখোর সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি কোথায়?

যদি এসব পেশার দুর্নীতি প্রশ্নের বাইরে থাকে, তবে কেন চিকিৎসক সমাজকেই বারবার টার্গেট করা হয়?

ডাক্তারিও একটি পেশা এবং এ পেশার প্রতি অন্যায্য মনোভাব স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের পরিবর্তে নতুন সংকট তৈরি করে।

রোগীদের বিদেশমুখিতা বাড়ার আশঙ্কা

শুধু ডাক্তারদের আক্রমণ করলে স্বাস্থ্যসেবা ভালো হবে না; বরং রোগীরা দেশের প্রতি আস্থা হারিয়ে বিদেশমুখী হবে। বর্তমানে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে রোগীরা চিকিৎসার জন্য ভারতে ছুটে যাচ্ছেন, যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই টাকা আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য কি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

যদি সরকারি ও বেসরকারি খাতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা হতো, অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার দেশের ভেতরে রাখা সম্ভব হতো।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব

আজ পর্যন্ত স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে রাষ্ট্র কী করেছে? কেবল কিছু ভবন নির্মাণ ছাড়া বড় কোনো অগ্রগতি নেই। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ কোথায়? বেসরকারি খাতে উন্নয়ন ও বিনিয়োগে রাষ্ট্রের নীতি কোথায়?

যদি এগুলো বাস্তবায়ন না হয়, তবে কেবল ডাক্তারদের দিকে আঙুল তুললে সমস্যার সমাধান হবে না।

চিকিৎসকদের বাস্তবতা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জন রোগী দেখতে হয়।

প্রশ্ন হলো, ডাক্তাররা কি রোবট? তাঁরাও রক্ত-মাংসের মানুষ।

তাঁদের পরিবার আছে, বাবা-মা আছেন, সামাজিক দায়িত্ব আছে, জীবিকার চাপ আছে। চাকরির অসন্তোষ, সীমিত সম্পদ এবং অমানবিক কর্মপরিবেশ তাঁদের প্রতিদিন ক্লান্ত করে তোলে।

চিকিৎসকরা সমাজের অংশ। সমাজ যদি অনিয়মে পরিপূর্ণ হয়, তাহলে কেবল চিকিৎসক সমাজের কাছ থেকে শতভাগ সততা দাবি করা অবাস্তব ও অন্যায্য।

সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়

আমাদের সমাজ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। আইন, প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা, নির্মাণ—প্রায় সবখানেই দুর্নীতি ও অনিয়ম বিদ্যমান। তখন কেন শুধু ডাক্তারদেরকেই আঙুল তোলা হয়?

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি হতে হবে সর্বত্র—শুধু ডাক্তার নয়, সব পেশার ক্ষেত্রেই।

উপসংহার

চিকিৎসক সমাজকে দোষারোপ করা সহজ; কিন্তু এটি সমাধান নয়। প্রকৃত পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন রাষ্ট্র সব পেশায় দুর্নীতি দমনে সমান গুরুত্ব ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।

ডাক্তাররা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নন। তাঁদের সমস্যাকে রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক সংকট থেকে আলাদা করে দেখা উচিত নয়। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন চাইলে রাষ্ট্রকে সবার আগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে—শুধু ভবন নয়, দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং নীতির মাধ্যমে।

টিআই/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
জুলাই উদযাপনে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা 

হামলা-হুমকি উপেক্ষা করেই আহতদের সেবা দেন চিকিৎসকরা: এনডিএফ

জুলাই উদযাপনে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা 

হামলা-হুমকি উপেক্ষা করেই আহতদের সেবা দেন চিকিৎসকরা: এনডিএফ

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত