ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া

ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া

নবজাতক শিশু বিশেষজ্ঞ,
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ),
বিসিএস (স্বাস্থ্য),
এমডি, নিওনেটোলজি
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়,
রেজিস্ট্রার, শিশু বিভাগ
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


০১ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৪৪ পিএম

গবেষণাপত্র পড়া ও নোট নেওয়ার সহজ উপায়

গবেষণাপত্র পড়া ও নোট নেওয়ার সহজ উপায়
ছবি: সংগৃহীত

অনেকের ধারণা, একটি গবেষণাপত্র পড়তে হলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি লাইন মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। বাস্তবে অভিজ্ঞ গবেষকেরা খুব কম ক্ষেত্রেই এভাবে পড়েন। কারণ একটি গবেষণাপত্রের সব অংশ সব সময় সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি কেন গবেষণাপত্রটি পড়ছেন, তার ওপর নির্ভর করবে কোন অংশ বেশি গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে। ধরুন, আপনি একটি নির্দিষ্ট রোগ নিয়ে গবেষণা করতে চান এবং সেই বিষয়ে ১০০টি গবেষণাপত্র পেলেন। যদি প্রতিটি গবেষণাপত্র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে যান, তাহলে হয়তো কয়েক মাস লেগে যাবে। কিন্তু একজন দক্ষ গবেষক মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই বুঝে ফেলতে পারেন, গবেষণাপত্রটি তাঁর গবেষণার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই গবেষণাপত্র পড়ারও একটি নির্দিষ্ট কৌশল রয়েছে।

গবেষণাপত্র পড়ার সময় নিজেকে যে প্রশ্নগুলো করবেন

প্রতিটি গবেষণাপত্র পড়ার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা উচিত। যেমন—গবেষণার মূল প্রশ্ন কী, কেন এটি করা হয়েছে, গবেষণার ধরন কী, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কত, প্রধান ফলাফল কী, ফলাফল কতটা বিশ্বাসযোগ্য, গবেষণার সীমাবদ্ধতা কী, এবং এই গবেষণা আপনার নিজের গবেষণায় কীভাবে কাজে লাগতে পারে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখে রাখলে পরে সাহিত্য পর্যালোচনা (literature review) লেখা অনেক সহজ হয়ে যায়।

গবেষণাপত্র পড়ার সময় কী কী দাগিয়ে রাখবেন (Highlighting)

সবকিছু দাগিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং গবেষণার উদ্দেশ্য, প্রধান ফলাফল, গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা, নতুন ধারণা, সীমাবদ্ধতা, ভবিষ্যৎ গবেষণার পরামর্শ এবং আপনার গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতিগুলো চিহ্নিত করুন। এতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।

প্রথম ধাপ: শিরোনাম (Title) পড়ুন 

গবেষণাপত্র হাতে পাওয়ার পর প্রথমেই শিরোনাম পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন গবেষণাটি আপনার বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না। এই পর্যায়ে নিজেকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন—গবেষণাটি কি আপনার গবেষণার প্রশ্নের সঙ্গে মেলে, এটি কি মানুষের ওপর করা হয়েছে নাকি পরীক্ষাগারে, এবং এটি কোন ধরনের জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত হয়েছে। যদি শিরোনামই আপনার প্রয়োজনের সঙ্গে না মেলে, তাহলে পুরো গবেষণাপত্র পড়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপ: সারসংক্ষেপ (Abstract) পড়ুন 

শিরোনামের পর সারসংক্ষেপ পড়ুন, কারণ এটি পুরো গবেষণাপত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়। এখানে সাধারণত গবেষণার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, প্রধান ফলাফল এবং গবেষকের সিদ্ধান্ত উল্লেখ থাকে। সারসংক্ষেপ পড়ে আপনি দ্রুত বুঝতে পারবেন গবেষণাটি আপনার কাজে লাগবে কি না। যদি মনে হয় এটি প্রাসঙ্গিক, তাহলে পরবর্তী অংশগুলো পড়া শুরু করুন।

তৃতীয় ধাপ: ভূমিকা (Introduction) পড়ুন

ভূমিকা অংশ পড়ে বোঝার চেষ্টা করুন গবেষক কোন সমস্যার কথা বলেছেন, কেন এই গবেষণা করেছেন এবং আগে কী কী গবেষণা হয়েছে। এছাড়া কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা রয়েছে, সেটিও এখানে উল্লেখ থাকে। একটি ভালো ভূমিকা আপনাকে শুধু গবেষণাটিই নয়, বরং পুরো বিষয়টির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়।

চতুর্থ ধাপ: গবেষণার পদ্ধতি (research Methodology) পড়ুন

অনেক নতুন গবেষক এই অংশটি এড়িয়ে যান, যা একটি বড় ভুল। গবেষণার পদ্ধতি পড়ে আপনি জানতে পারবেন গবেষণার ধরন কী, কতজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, কীভাবে তাঁদের নির্বাচন করা হয়েছে, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কীভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই অংশ ভালোভাবে না পড়লে গবেষণার ফলাফল কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা বোঝা সম্ভব নয়।

পঞ্চম ধাপ: ফলাফল (Results) পড়ুন 

এই অংশে গবেষণায় কী পাওয়া গেছে তা উপস্থাপন করা হয়। এখানে প্রধান ফলাফল, সারণি ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তথ্য তুলে ধরা হয়। খেয়াল করুন কোন ফলাফল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গবেষণার উদ্দেশ্যের উত্তর পাওয়া গেছে কি না। মনে রাখবেন, এই অংশে গবেষকের ব্যক্তিগত মতামত থাকে না; শুধুমাত্র তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

ষষ্ঠ ধাপ: আলোচনা (Discussion) পড়ুন

আলোচনা অংশটি গবেষণাপত্রের সবচেয়ে বিশ্লেষণধর্মী অংশ। এখানে গবেষক তাঁর ফলাফল ব্যাখ্যা করেন, আগের গবেষণার সঙ্গে তুলনা করেন এবং কেন একই বা ভিন্ন ফলাফল পাওয়া গেছে তা ব্যাখ্যা করেন। এ ছাড়া গবেষণার সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনাও এখানে উল্লেখ থাকে। এই অংশ পড়লে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বোঝা যায়।

সপ্তম ধাপ: উপসংহার (Conclusion) পড়ুন

উপসংহার অংশে গবেষণার মূল বার্তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। এখানে গবেষক কী সুপারিশ করেছেন এবং এই গবেষণা বাস্তবে কীভাবে কাজে লাগতে পারে, তা জানা যায়। এটি পুরো গবেষণার সারমর্ম বুঝতে সাহায্য করে।

অষ্টম ধাপ: তথ্যসূত্র দেখুন (References)

অনেক গবেষক এই অংশটি পড়েন না, অথচ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যসূত্র দেখে আপনি একই বিষয়ের আরও গবেষণাপত্র খুঁজে পেতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ গবেষকদের চিনতে পারেন এবং কোন গবেষণাগুলো বেশি উদ্ধৃত হয়েছে তা জানতে পারেন। অনেক সময় একটি ভালো গবেষণাপত্র থেকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্রের সন্ধান পাওয়া যায়।

গবেষণাপত্র কতবার পড়বেন?

একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র একবার পড়লেই শেষ নয়। প্রথমবার পড়ুন সামগ্রিক ধারণা পাওয়ার জন্য, দ্বিতীয়বার পড়ুন পদ্ধতি ও ফলাফল ভালোভাবে বোঝার জন্য, এবং তৃতীয়বার পড়ুন নিজের গবেষণার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে বের করার জন্য। প্রয়োজন হলে আরও কয়েকবার পড়তে পারেন।

গবেষণাপত্র পড়ার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ ভুল

গবেষণাপত্র পড়ার সময় নতুন গবেষকেরা প্রায়ই কিছু ভুল করেন। অনেকেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি শব্দ পড়েন, ফলে অল্প সময়ে খুব কম গবেষণাপত্র পড়া হয়। কেউ কেউ শুধু সারসংক্ষেপ পড়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যা সব সময় সঠিক নয়। আবার অনেকে গবেষণার পদ্ধতি পড়েন না, ফলে গবেষণার মান বিচার করতে পারেন না। কেউ শুধু ফলাফল পড়েন কিন্তু আলোচনা পড়েন না, ফলে ফলাফলের ব্যাখ্যা বোঝা যায় না। এছাড়া অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখেন না বা অন্যের লেখা হুবহু নোট করে রাখেন, যা পরে সমস্যার কারণ হতে পারে।

পড়ার একটি সহজ অভ্যাস নোট লিখে রাখা

প্রতিটি গবেষণাপত্র পড়ার পর একটি পাতায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যেমন—গবেষণার শিরোনাম, লেখকের নাম, প্রকাশের বছর, গবেষণার উদ্দেশ্য, গবেষণার ধরন, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, প্রধান ফলাফল, সীমাবদ্ধতা এবং আপনার গবেষণার জন্য এর প্রাসঙ্গিকতা। গবেষণাপত্র পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নোট তৈরি করলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। এতে একই গবেষণাপত্র আবার পড়তে হয় না, বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল সহজে তুলনা করা যায়, সাহিত্য পর্যালোচনা লেখা দ্রুত হয় এবং তথ্যসূত্র খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। সবচেয়ে বড় কথা, অন্যের লেখা হুবহু নকল করার ঝুঁকি অনেক কমে যায়, কারণ নোট সাধারণত নিজের ভাষায় লেখা হয়। তাই গবেষণাপত্র পড়া শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই নোট তৈরি করা উচিত। অনেকেই ভাবেন পরে লিখবেন, কিন্তু কয়েক দিন পর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। তাই গবেষণাপত্র পড়ার দিনই নোট সম্পন্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

অনেক সময় কোনো গবেষণাপত্রের একটি নির্দিষ্ট তথ্য বা বাক্য পরে ব্যবহার করতে হয়। সে ক্ষেত্রে শুধু তথ্যটি লিখে রাখলেই হবে না, এর উৎসও উল্লেখ করতে হবে। যেমন, আপনি যদি লিখেন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মূত্রনালির সংক্রমণ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা, তাহলে এর সঙ্গে লেখকের নাম, প্রকাশের বছর এবং প্রয়োজনে পৃষ্ঠার নম্বরও লিখে রাখতে হবে। এতে পরবর্তীতে তথ্যসূত্র খুঁজে বের করতে সুবিধা হয় এবং ভুল উদ্ধৃতির সম্ভাবনা কমে যায়।

বর্তমানে কাগজের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও নোট সংরক্ষণ করা যায়। কম্পিউটার বা মোবাইলে নোট রাখার সুবিধা হলো এগুলো দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়, সহজে সম্পাদনা করা যায় এবং একাধিক স্থানে সংরক্ষণ করা যায়। প্রতিটি গবেষণার জন্য আলাদা ফোল্ডার বা নথি তৈরি করে সেখানে গবেষণাপত্র, নোট, সারণি, চিত্র এবং তথ্যসূত্র একসঙ্গে রাখা যেতে পারে। ফাইলের নাম এমনভাবে রাখা উচিত যাতে পরে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, যেমন— লেখকের নাম, প্রকাশের বছর এবং বিষয় উল্লেখ করে। পাশাপাশি সব নোটের একটি ব্যাকআপ অন্য একটি নিরাপদ স্থানে রাখা উচিত, যাতে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যায় তথ্য হারিয়ে না যায়।

এমআর/এমইউ

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত