ডা. মো. জাফর ইকবাল
ডিএ, এফসিপিএস (অ্যানাস্থেসিয়া)
এমডি (ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন)
কন্সালটেন্ট- আইসিইউ
এভার কেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।
আরএমসি- ৪১তম প্রজন্ম।
১২ জুলাই, ২০২৬ ০১:০৩ পিএম
হাসপাতালে চিকিৎসকদের বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা: বিদ্যমান ব্যবস্থা কতখানি নৈতিক?
স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান, চিকিৎসকের মর্যাদা এবং রোগীর স্বার্থ—এসব বিষয় নিয়ে খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রায়ই আলোচনা হয়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন খুব কমই সামনে আসে যে, বর্তমান আইন ও নীতিমালা কি সত্যিই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে, নাকি কেবল কাগজে-কলমে কিছু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বাস্তবে অনিয়মের পথ তৈরি করছে?
সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখানে আলোচনার প্রয়াস পাবো। মূলত এটি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধার দাবি নয়; বরং এমন একটি নীতিগত সংস্কারের আহ্বান, যা স্বচ্ছতা বজায় রেখে চিকিৎসকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
বর্তমান নিয়মের একটি বড় বৈপরীত্য হলো—আমি সরকারি চাকরি করি বলে নিজের নামে কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে পারি না। অথচ একই অর্থ স্ত্রী, পুত্র বা কন্যার নামে বিনিয়োগ করা সম্ভব। হয়তোবা তাদের কোনো বৈধ উপার্জনই নেই।
প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই নৈতিক বা স্বচ্ছ ব্যবস্থা? যাদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন আয় নেই, তাদের নামে আমার অর্থে বিনিয়োগ করা কি প্রকৃত স্বচ্ছতার পরিচয় বহন করে? মোটেও না, বরং এটি বাস্তবে নামমাত্র মালিকানা বা বেনামি বিনিয়োগের পথই সহজ করে দেয়।
আরও বড় সমস্যা হলো, যেসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই সরকারি চাকরিজীবী, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন।
অনেকে হয়তো বলবেন, ‘তাহলে সরকারি চাকরি করবেন না।’
কিন্তু প্রশ্নটি চাকরি করা বা না করার নয়। প্রশ্নটি হলো—যে নিয়ম বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ, সেই নিয়মের অর্থ কী? কেন তা পরিবর্তন হবে না। আমি সরকারি চাকরিও করব, আবার অন্যায্য ও অকার্যকর নিয়ম পরিবর্তনের দাবিও জানাব। কারণ আইন মানুষের জন্য; মানুষ আইনের জন্য নয়।
যেমন দাসপ্রথার ক্ষেত্রে আমরা বলি না, ‘আমি দাস ব্যবসা করব না, বরং বলি, দাসপ্রথাই চলবে না।’ একইভাবে, যে নিয়ম অনৈতিক আচরণকে নিরুৎসাহিত না করে বরং বিকল্প পথ খুঁজে নিতে বাধ্য করে, সেই নিয়মের সংস্কার হওয়া উচিত।
চিকিৎসকদের বিনিয়োগে মানসম্মত হাসপাতাল
কেন চিকিৎসকদের বিনিয়োগে আরও মানসম্মত হাসপাতাল গড়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
যখন একজন ব্যবসায়ী শত শত কোটি টাকা হাসপাতালে বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই সেই বিনিয়োগের সর্বোচ্চ আর্থিক রিটার্ন প্রত্যাশা করেন। অনেক ক্ষেত্রেই এই অর্থ আসে উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণের মাধ্যমে। ফলে তাঁর হিসাব খুবই বাস্তব যে, ৫০০ কোটি টাকা যদি গার্মেন্টস, রিয়েল এস্টেট বা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করতেন, তাহলে কত লাভ হতো, আর হাসপাতালে করলে কত?
এই রিটার্নের চাপ শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে হাসপাতালের ট্যারিফে। আর টার্গেট পুরন করার দায়িত্ব পরে ডাক্তারের কাধে। আর সেই ট্যারিফের বোঝা বহন করেন রোগী।
মুনাফা যায় বিনিয়োগকারীর কাছে, কিন্তু রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন চিকিৎসক। রোগীর কাছে হাসপাতালের মুখ চিকিৎসকই। ফলে অতিরিক্ত বিল, অসন্তোষ কিংবা ক্ষোভ—সবকিছুর ভার শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের ওপরই এসে পড়ে। অনেক সময় অন্যায়ভাবেই তাঁকে ‘কসাই’ বলা হয়।
অথচ হাসপাতালের বিলের বড় অংশ চিকিৎসকের ফি নয়। আইসিইউ চার্জ, বেড চার্জ, অপারেশন থিয়েটার, ওষুধ, কনজিউমেবল, ডায়াগনস্টিক, প্রশাসনিক ব্যয়—এসবই মূল ব্যয়ের অংশ।
আমরা প্রায়ই দেখি, রোগীর স্বজন চিকিৎসকের কাছে এসে বলেন, ‘স্যার, বিলটা একটু কমিয়ে দিন।’ চিকিৎসক অনেক সময় নিজের সম্মানির অংশ ছেড়ে দেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্যান্য খাতে কতটা ছাড় দিল, সে প্রশ্ন খুব কমই ওঠে। অথচ সেই সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের নয়।
এখন কল্পনা করুন, একই ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ যদি ৫০০ জন চিকিৎসক মিলে করেন। তখন হাসপাতাল ব্যবস্থপনার দর্শন ও চেহারা বদলে যেতে পারে। কারণ চিকিৎসকের কাছে হাসপাতাল শুধু একটি ব্যবসা নয়; এটি তাঁর পেশা, পরিচয় এবং সামাজিক দায়িত্বের অংশ। চিকিৎসকের লাভ রোগীর ক্ষতির ওপর নির্ভর করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সুনাম, সেবার মান এবং মানুষের আস্থার ওপর নির্ভর করে।
আমি বলছি না যে সব চিকিৎসক নিখুঁত, কিংবা ব্যবসায়ীরা অমানবিক। ব্যতিক্রম সব ক্ষেত্রেই আছে। কিন্তু চিকিৎসা পেশার মূল ভিত্তিই হলো রোগীর কল্যাণ। তাই চিকিৎসকদের নেতৃত্ব ও অংশীদারিত্বে পরিচালিত হাসপাতালগুলো রোগীকেন্দ্রিক, মানবিক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
সরকারি চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুযোগ থাকা উচিত
আমার বিশ্বাস, সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকদের স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে ব্যক্তি নয়, বরং উপকৃত হবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। চিকিৎসকদের মালিকানার অনুভূতি বাড়বে, মানসম্মত হাসপাতাল গড়ে উঠবে আর রোগীর স্বার্থই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত হবে।
মনে রাখবেন দেশের সরকারি ব্যাবস্থাপনায় হাসপাতাল বিছানার সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার আর বেসরকারি খতে হাসপাতাল বিছানার সংখ্যা প্রায় এক লাখ। এই এক লাখ বিছানার কতটার মালিক ডাক্তার অনুগ্রহ করে একটু খবর নিয়ে দেখবেন।
একটি ভালো নীতি মানুষের সৎ উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে না; বরং সঠিক পথে পরিচালিত করে। এখন সময় এসেছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নিয়মগুলো নতুন করে বিবেচনা করার।
এমইউ/