স্বাস্থ্য বাজেট: বেশি বরাদ্দ জরুরি রোগ প্রতিরোধে
মেডিভয়েস রিপোর্ট: এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট সবচেয়ে কম। প্রতি বছর স্বাস্থ্যে টাকার পরিমাণ বাড়লেও তা ৪.৩ থেকে ৫.৪ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই বরাদ্দের বড় একটি অংশ চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রশাসনিক কাজে যুক্তদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়। অন্যদিকে উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দ অবকাঠামো, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়। তবে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ হয় না। সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতা বৃদ্ধি নিশ্চিতে এদিকে মনোযোগ বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি এম এম রাশেদ রাব্বি মেডিভয়েসের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে এসব কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একটি দেশের সামগ্রিক আয়-ব্যয়, সুস্থতা ও কর্ম সংস্থান—সব কিছুর সঙ্গে স্বাস্থ্য সম্পৃক্ত। সরকারের উচিত সব সময় স্বাস্থ্য বাজেটকে গুরুত্ব দেওয়া। এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বাজেটের আকারের দিক থেকে আমরা উপমহাদেশের দেশগুলো থেকেও পিছিয়ে। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের স্বাস্থ্য বাজেট আমাদের চেয়ে বেশি। ভুটানের বাজেট চমৎকার। কিছু দিন আগে সংকটে নিপতিত শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য বাজেটও আমাদের চেয়ে বেশি।’
নেপালের চিকিৎসায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ একেবারেই সীমিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ আমাদের দেশে মেডিকেল উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্য বাজেটও ভালো। তাদের স্বাস্থ্য বাজেট গড়ে ৭ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ থাকে। অথচ আমরা এখনো ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারিনি। আমরা বরাবরই দেখি, স্বাস্থ্যে টাকার পরিমাণ বেড়েছে। তবে বাজেট ৪.৩ থেকে ৫.৪ এর মধ্যেই আছে। বরাদ্দের বড় একটি অংশ চলে যায় চিকিৎসক-স্বাস্থ্য স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রশাসনিক কাজে যুক্তদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাবদ।’
‘এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বাজেট আসলে কতটুকু, এটি নিরূপণ করা দরকার। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য বাজেট মূলত কোন কোন কাজে বেশি জরুরি তাও জানা দরকার। আমাদের ধারণা, ওষুধ কেনা, হাসপাতালের শয্যায় রোগীকে খাবার দেওয়া, ছোট-বড় বা ভারি যন্ত্রপাতি কেনা স্বাস্থ্য বাজেট। কিন্তু বিষয়টি আসলে এ রকম হওয়া যৌক্তিক না। স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ থাকা জরুরি রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায়। শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এতো হাসপাতাল, এতো ওষুধ, এতো স্বাস্থ্যকর্মী দরকার পড়ে না। ওষুধ খেয়ে রোগ সারানো হলো শেষ পর্যায়ের কাজ। সুতরাং প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রোগ প্রতিরোধ’, যোগ করেন তিনি।
এ সময় চিকিৎসা সেবা সহজতর করতে স্বাস্থ্যবীমা চালুর দাবি জানিয়ে বিএইচআরএফ সভাপতি বলেন, ‘অনেকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে অনেক খরচ। ওরা কিন্তু রোগ প্রতিরোধে প্রচুর ব্যয় করে। তাদের খুব কম সংখ্যক মানুষ হাসপাতালে যায়। যারা যান, তাদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। সেখানে বীমার ব্যবস্থা আছে। বেসরকারিতে চিকিৎসা ব্যয় প্রচুর হলেও সবাই এই বীমার আওতাভুক্ত। সুতরাং আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বীমা চালু করতে হবে।’
সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতা বৃদ্ধিতে স্বাস্থ্যবীমার গুরুত্ব তুলে ধরে এম এম রাশেদ রাব্বি বলেন, কিছু দিন আগে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতা বৃদ্ধি নিয়ে বড় একটি সম্মেলন হয়ে গেলো। সেখানে নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও চ্যাটাম হাউজ কমিশন অন ইউনিভার্সাল হেলথের কো-চেয়ার হেলেন ক্লার্ক এসেছিলেন। আমাদের এসডিজির একটি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তাহলো: ২০৩০ এর মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন ঘটানো।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, দেশের সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ চলছে। ইউনিয়ন সাব সেন্টার, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগুলো নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি, এটা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ নয়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে পরিপূর্ণরূপে সরকারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নাগরিকদের যে কোনো চিকিৎসা অনায়াসে মিলবে। মেশিনারিজ বা স্বাস্থ্যকর্মী সংকটের কারণে বেসরকারিতে রেফার্ড করা হবে না। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেখানে মিলবে। এজন্য হয় তো আমরা বাৎসরিক ১-২শ’ টাকার বীমার অংক পরিশোধ করবো। এর বিনিময়ে সরকার আমাকে সকল প্রকার স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করবে। সেটাই ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ। আমি মনে করি, আমাদের ওই জায়গায় পৌঁছানো উচিত।
তিনি বলেন, ‘ফিলিপাইনের মতো দেশও ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ বাস্তবায়ন করছে; ভিয়েতনামে হয়েছে, এমনকি আফ্রিকার অনেক অনুন্নত ও দরিদ্র দেশেও ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।’
‘সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে স্বাস্থ্যে যেই বরাদ্দটি আছে, আসন্ন বাজেটে তার আকার দ্বিগুণ করতে হবে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য বাজেট একবারে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব না। কিন্তু দ্বিগুণ করা সম্ভব। এটি করা হলে আমাদের শ্রমশক্তির শ্রমের প্রতিফলন আরও সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন হবে। বাৎসরিক উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের জিডিপি আরও সম্প্রসারিত হবে। স্বাস্থ্য বাজেট দ্বিগুণ করা হলে সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতি অনেক বেশি উপকৃত হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ ও টার্শিয়ারি পর্যায়—সর্বত্র বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে’, বলেন এম এম রাশেদ রাব্বি।
২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ; টাকার অঙ্কে তা ৯ হাজার ৭৯৪ কোটি। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৩৩ শতাংশ।
২০২১-২২ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ১৭ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা।
-
১১ অগাস্ট, ২০২৫
-
০৬ জুন, ২০২৪
-
২১ জুন, ২০২৩
-
২২ মে, ২০২৩
-
০৬ জুন, ২০২১
বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞ ভাবনা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত নিজেদের বাজেট উপস্থাপন করা