বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞ ভাবনা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত নিজেদের বাজেট উপস্থাপন করা
মুন্নাফ রশিদ: ২০২১-২০২৫ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসারে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির দুই শতাংশ বরাদ্দের পরিকল্পনা করে সরকার। তবে গত ২০২০-২১ অর্থবছরসহ চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ওই পরিকল্পনার সামঞ্জস্য খুঁজে না পাওয়ায় বিষয়টিকে হতাশাজনক বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ৩ জুন (বৃহস্পতিবার) পুরো দেশ যখন জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তখন স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি ছিল স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের ওপর। এদিন দেশের ৫০তম বাজেট পেশ করছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
তবে বাজেট অধিবেশনের আগে থেকেই স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সারাদেশে চাউর হয়েছিল। যদিও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়ও তেমনটিই বলেছেন। কিন্তু, বাজেটে এর প্রতিফলন মেলেনি। ফলে চিকিৎসা খাতের অব্যবস্থাপনা এবং করোনা বিধ্বস্ত স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
যদিও গত অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটে নতুন তেমন কিছু নেই। অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতের জন্য ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা প্রস্তাব করেছেন, যা মোট বাজেটের পাঁচ দশমিক ৪২ শতাংশ অথবা জিডিপির মাত্র ০.৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ, জিডিপির ১ শতাংশও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হয়নি। অথচ স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবার জন্য জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ থাকা উচিত।
বাজেট পরবর্তী অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে করোনাভাইরাসের টিকা কেনার জন্য ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
গত ১২ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্যে সরকারের ব্যয় ছিল জিডিপির এক শতাংশেরও নিচে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ, স্বাস্থ্যখাতে মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ থাকতে হবে।
এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ বাজেট অপ্রতুল। এই বাজেট দিয়ে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু বাজেট বরাদ্দের আগে দু’একটা বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। প্রথমত, যে বাজেট বরাদ্দ হবে তা খরচ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজেট যারা খরচ করবেন তারা খরচ করার মতো যোগ্য কি না সেটি দেখতে হবে। পাশাপাশি তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ খাতে যা বরাদ্দ দেওয়া হয় সক্ষমতা না থাকার ফলে তার কিছুই যদি খরচ না হয় অথবা অনৈতিকভাবে খরচ হয়ে যায়। তাহলে তো বাজেট বৃদ্ধি করে কারো পকেট ভারি করে লাভ নেই। এ বিষয়গুলো প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া খরচ করার প্রক্রিয়াটাকে যুগোপযোগী এবং বাস্তবসম্মত করতে হবে। আর স্বাস্থ্যখাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা অবশ্যই অপ্রতুল। এই অপ্রতুল বাজেট দিয়ে কোনওভাবেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব না।’
বাজেট ব্যয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ অবশ্যই দিতে হবে তবে প্রশিক্ষণের চেয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরীর বলেন, ‘বাজেটেরে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাব বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়। তবে ডাব্লিউএইচও যতটুকু বলছে ততটুকু না হলেও একটা যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে রাখা উচিত ছিল। স্বাস্থ্যখাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা এক শতাংশেরও কম। তবে এটি কমপক্ষে দুই শতাংশ করা উচিত ছিল।’ 
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের ওপর ভিত্তি করে এখানে ব্যয়ের নির্দিষ্ট খাতগুলোতে আগামী একবছরে কী পরিমাণ ব্যয় করা হবে তার একটি খসড়া বাজেট স্বাস্থ্যমন্ত্রী দিতে পারেন। তার মধ্যে ভারি যন্ত্রপাতি ক্রয়, হাসপাতালের উন্নয়ন ব্যয়, আইসিইউ স্থাপনসহ নির্দিষ্ট খাতগুলো হতে পারে। তবে স্বাস্থ্যখাত এমন একটি খাত যেখানে আগাম কোনও প্রাক্কলন দেওয়া কষ্টকর।
প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটার ওপর ভিত্তি করে আগামী সাত দিনের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণা করা উচিত। যেখানে তিনি আগামী একবছরে এই বরাদ্দকৃত টাকা কিভাবে ব্যয় করবেন, কোন কোন খাতে ব্যয়
করবেন তা স্পষ্ট করুক। শুধু বিদেশ ভ্রমণ আর বিদেশে প্রশিক্ষণ করেই যদি ব্যয় করা হলে তো হবে না। ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে তাদের নিজেদের স্বাস্থ্য বাজেট উপস্থাপন করা।’
অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গত অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে কত বরাদ্দ ছিল সেটা আমরা জানি, কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে কোন খাতে কত খরচ করা হয়েছে সেটা আমরা জানি না। জেলা পর্যায়ে আইসিইউ স্থাপন এবং সেন্ট্রাল অক্সিজেন স্থাপনের জন্য ৭৯টি প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো না। ফলে সামগ্রিক বিষয়ে বাজেট নিয়ে এখনই তেমন বলার কিছু নেই।’
-
১১ অগাস্ট, ২০২৫
-
০৬ জুন, ২০২৪
-
২১ জুন, ২০২৩
-
২২ মে, ২০২৩
-
০৬ জুন, ২০২১
বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞ ভাবনা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত নিজেদের বাজেট উপস্থাপন করা