ডা. কে এম সোহেল আসকার

ডা. কে এম সোহেল আসকার

অ্যানেসথেশিওলজিস্ট,
ওয়াংদী হাসপাতাল, ভুটান। 


২৪ মার্চ, ২০২১ ০৩:০৪ পিএম

‘স্বপ্ন দেখি আমার দেশেও হবে ভুটানের মতো স্বাস্থ্যখাত’

‘স্বপ্ন দেখি আমার দেশেও হবে ভুটানের মতো স্বাস্থ্যখাত’
ছবি: সংগৃহীত

ভুটানে আমার এক বছর পূর্ণ হলো গত ১০ ফেব্রুয়ারিতে। নতুন কর্ম পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ভুটানিরা অত্যন্ত নিরীহ ও সহজ সরল। হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের অত্যাচার নেই। স্থানীয় নেতা ও মাস্তানদের দৌরাত্ম্য নেই। সকল স্টাফ মন থেকে কাজ করে। সকলেই স্ট্যার্ন্ডাড অব প্রোটোকল (এসওপি) মেনে চলে। সকল কাজের ডকুমেন্টেশন করে। হাসপাতালে যে ঔষধ সরবরাহ আছে তার বাইরে ঔষধ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যথেচ্ছাচার এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের উপায় নাই। হাসপাতাল পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও কোলাহল বিবর্জিত।

ফ্রি চিকিৎসাসেবা

সাধারণ জনগণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অত্যন্ত সম্মান করে। ওই দেশে চিকিৎসাসেবা পুরোটাই ফ্রি। সেটা দেশে হোক আর বিদেশে হোক। তারা জটিল রোগী ভারতে রেফার করে।  রোগী ও রোগীর একজন সহযোগীর বিমার ভাড়াসহ সকল খরচ রাষ্ট্র বহন করে। দেশের ভেতর একজন সাধারণ নাগরিকের জন্যও তারা এয়ার এম্বুলেন্স ব্যবহার করে।

শৃঙ্খল রেফারেল সিস্টেম

ভুটানের চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম ভালো দিক হলো রেফারেল সিস্টেম। এক কথায় অসাধারণ। সর্বনিম্ন হেলথ ইউনিট হলো বিএইচইউ। তারপর জেলা হাসপাতাল, তারপর রেফারেল হাসপাতাল। জনগন অ্যাম্বুলেন্স কাভারেজের মধ্যে রোগী বিএইচইউ থেকে রেফার করতে হলে বিএইচইউ- এর দ্বায়িত্বরত হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলা হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসককে ফোন দিয়ে রোগীর সমস্যা বর্ণনা করে চিকিৎসকের সম্মতি নিয়ে রেফার করবেন। 

তারপর সেই রোগী একজন নার্স বা ব্রাদার এসকর্ট করে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসবে জেলা হাসপাতালে। এসকর্ট ছাড়া কোনো জরুরি রোগী রেফার করার কোনো সুযোগ নেই। এর জন্য এসকর্ট হিসাবে নার্স বা ব্রাদার একটা ভাতা পাবেন। এরপর জেলা হাসপাতাল থেকে রোগী রেফারেল হাসপাতালে পাঠাতে হলে একইভাবে জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক রেফারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে ফোনে কথা বলে এসকর্টসহ রোগী পাঠাবেন।

নিয়মতান্ত্রিক ওটি

এখানকার ওটির পরিবেশ অত্যন্ত শৃঙ্খলাপূর্ণ। সকলের জন্য ডকুমেন্টেশন (নথিপত্র রাখা) বাধ্যতামুলক। আমার ওটিতে পাঁচজন স্ক্রাব নার্স আছেন। তারা শুধু সার্জারীতে অ্যাসিস্ট করেন। এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থায় নার্স প্রধান ভুমিকা পালন করেন। আমার একজন নার্স এনেসথেসিস্ট আছে, ব্রাদার কর্মা তার নাম। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে এক বছরের ট্রেনিং করা। আমার তিনজন এনেস্থিসিয়া টেকনিশিয়ান আছেন। ভুটানে এরাই আমার পরিবার। তারা এতো আন্তরিক যে তাদেরকে সব কথাই বলে ফেলি। দুইজন ক্লিনার আছে। একজন নার্স ওটি ইনচার্জ। 

প্রতি শনিবার ওটির ক্লিনিং দিবস। সেদিন শুধু ইমার্জেন্সি ওটি হয়। আমার দুইটা ওটি রুম। একটাতে শুধু লোকাল দিয়ে কেস হয়। আমরা সবাই একসাথে একরুমে চা খাই। আমরা একই পরিবারের মতো একটা কমন টয়লেট ব্যবহার করি। সব কিছু খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। ওটি ড্রেস পরে সবাই ওটির টয়লেট পরিস্কার করে। আমারটা তারা ক্লীন করে দেয়। প্রয়োজনে এখানেই গোসল করি। প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে। হাসপাতালের সরবরাহ। 

এই এক বছরে আমি Glidoscope দ্বারা ইনটুবেশনে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। প্রথম প্রথম ইনটুবেশনরে সময় রোগীর মুখের ভেতর তাকাতাম। আমার নার্স এনেসথেসিস্ট তখন বলতো, স্যার মনিটরে তাকান। সে আমাকে শুধরে দিতো। হাজার হলেও অভ্যাস বলে কথা। তারপর Whitcre needle দিয়ে স্পাইনাল দিতে অভ্যস্ত হলাম। Gas analyser এর দিকে তাকাতে শিখলাম। Circle absorber ব্যবহার করে  0.5 L/min অক্সিজেন ও 0.5 L/min নাইট্রাস ব্যবহার করি। Disposable HME filter ও Breathing circuit ব্যবহার করি। 

ওটিতে একটিভ গ্যাস স্ক্যাভেন্জিং সিস্টেম আছে। Capnography দেখে ET tube কর্নফার্ম করি ও NMB ব্যবহার করি। অত্যন্ত তথ্যবহুল Anaesthesia chart পূরণ করতে অভ্যাস হয়ে গেছে। তারপর অনলাইনে গুগল ফর্মে সেটা আপডেট করি। অ্যানেসথেসিয়া রেজিস্ট্রার খাতায় সেটা তুলতে হয়। রোগী রেফার করলে আলাদা খাতায় লিখে রাখতে হয়। এছাড়া মিনিস্ট্রিতে (মন্ত্রণালয়) মাসিক রিপোর্ট পাঠাতে হয়। যাইহোক ভুটান তাদের হাসপাতাল একটি উন্নত সিস্টেমের মধ্যে গুছিয়ে নিয়েছে। স্বপ্ন দেখি আমার দেশেও একদিন হবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : স্বাস্থ্যখাত
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি