রংপুর মেডিকেলে রোগী ভর্তি থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বকশিশের নামে হয়রানির অভিযোগ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণায় বেশি ভোগেন। নিত্যদিনের এমন অভিযোগ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনদের। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত পদে পদে কর্মচারীদের ‘বকশিশ’ বা ‘ঘুষ’ বাণিজ্য সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করে তোলে। এমনকি রোগী মারা যাওয়ার পরও দেখা যায় এমন অমানবিকতা। সরকারি হাসপাতালগুলো যেন হয়ে উঠেছে ভোগান্তির আরেক নাম।
এই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে। সম্প্রতি এই হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) বিভাগে ঘটে যাওয়া এমনই এক ঘটনার বিবরণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেছেন আশাদুর জামান আকাশ নামের এক ভুক্তভোগী। তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।
তার দেওয়া পোস্টে উঠে এসেছে ভর্তি থেকে শুরু করে লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য এবং জরুরি সময়ে বকশিশের নামে হয়রানির করুন চিত্র।
ভর্তিতেই ট্রলি-বাণিজ্য
আকাশ লিখেছেন, ‘হার্ট অ্যাটাক করায় ৬ সেপ্টেম্বর (রোববার) দুপুর ৩টার দিকে মাত্র ৩০ টাকা দিয়ে দাদাকে হাসপাতালে ভর্তি করালেও মূল ভোগান্তি শুরু হয় এর ঠিক পরপরই। ইমার্জেন্সি থেকে দ্বিতীয়তলার সিসিইউতে নেওয়ার সময় ট্রলিচালক সরাসরি ২০০ টাকা দাবি করে বসেন। আমি ১০০ টাকা দিতে চাইলে তিনি নিতে রাজি হলেন না। রাগ করে ‘টাকা লাগবে না’ বলে চলে যান। রোগীর এমন সংকটাপন্ন মুহূর্তে তাঁকে ফেলে রেখে প্রায় ২০ মিনিট পর ফিরে এসে ওই স্টাফ সেই ১০০ টাকাই নিয়ে যান।’
জরুরি মুহূর্তে স্যালাইনের দাম বৃদ্ধি
রোগীর অবস্থা তখন সংকটাপন্ন। ওই সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আকাশ লিখেন, ‘রাত ৮টা থেকে ৯টার দিকে স্যালাইন ও স্যালাইন সেটের জরুরি প্রয়োজন হয়। হাতে সময় কম থাকায় একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর কাছ থেকে সেগুলো নিই। তিনি এর জন্য ৫০০ টাকা দাবি করেন। আমি পরে ফার্মেসিতে গিয়ে দাম জানতে পেরে হতবাক হই, কারণ এর আসল দাম ছিল মাত্র ১৫০ টাকা। পরে তাকে জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর না দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৫০ টাকাই নেন।’
বকশিশ না পেয়ে অমানবিক আচরণ
আশাদুর জামান আকাশ আরও লিখেন, ‘সোমবার ভোর ৫টায় ক্যাথেটার পরানোর পর স্টাফ ২০০ টাকা দাবি করেন। আমি ১০০ টাকা দিয়ে বললাম, ভাই, ওষুধ কিনতে কিনতেই আমাদের সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। আপনি আপাতত ১০০ টাকা নেন। তিনি রাগ করে টাকাটা নিলেন এবং পাশে থাকা আরেকজন স্টাফকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এসব কাজ করানোর জন্য আমাকে আর ডাকবি না।’
এ কথা শুনে পাশের স্টাফও রাগ করে বলে উঠলেন, ‘তোরা কেউ আর ওই রোগীর কাছে যাবি না।’
এই ঘটনার পর আকাশ আক্ষেপ করে লিখেন, মাত্র পাঁচ মিনিটের একটি সাধারণ কাজের জন্য রোগীর স্বজনদের সাথে এমন রূঢ় আচরণ সত্যিই খুব কষ্টদায়ক।
তবুও শেষ রক্ষা হলো না
সোমবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে আকাশের দাদার পালস রেট শূন্যে নেমে আসে। আকাশ লিখেন, ‘রোগীর পালস রেট শূন্যে নেমে এলে আমি দ্রুত ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই। ডাক্তার বললেন, আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছি, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।’
এ সময় চিকিৎসক রোগীকে মৃত ঘোষণা করেন।
‘ডেথ সার্টিফিকেট’ নিয়েও হয়রানি
প্রিয়জন হারানোর এই শোক সামলানোর আগেই মৃত্যুসনদ নিয়ে নতুন ভোগান্তি শুরু হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দাদা মারা যাওয়ার পর ভর্তির কাগজটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দেখি, একজন ওয়ার্ড বয় কাগজটি নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন ডেথ সার্টিফিকেট লেখানোর জন্য। আমি তাঁর পেছনে যাই। ডাক্তারের কক্ষে যাওয়ার পর ওই ব্যক্তি আমাকে বলেন, এখানে তোমার কোনো কাজ নেই, তুমি চলে যাও। যা যা করার আমরা করছি।’
আমি তাকে বললাম, ‘রোগী মারা যাওয়ার আগে ভর্তির কাগজ নিয়ে আমি অন্তত ২০-৩০ বার ডাক্তার ও নার্সদের কাছে গিয়েছি। তখন তো আপনাদের কাউকে এগিয়ে আসতে দেখিনি। এখন কেন? যা করার, আমিই করব। আপনার এখানে কোনো কাজ নেই, আপনি চলে যান। মূলত ডেথ সার্টিফিকেটটি নিজেদের কাছে রেখে টাকা আদায়ের পাঁয়তারা করছিলেন তারা।’
লাশ নিচে নামানোর সময়ও টাকা দাবি
লাশ নিচে নামানোর সময়ে আবারও টাকা দাবি করা হয় জানিয়ে আকাশ লিখেন, লাশ ট্রলিতে করে নিচে নামানোর পর গেট আটকে দিয়ে ৬০০ টাকা দাবি করা হয়। আমি ২০০ টাকা দিতে চাইলে তারা রাজি হননি, পরে ৩০০ টাকা দিই। সিসিইউর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার সময় আরেকটি লাশের জন্য তিন হাজার টাকা দাবি করতে দেখেছি। সেই ডেথ সার্টিফিকেটটিও তখন ওয়ার্ড বয়দের কাছে ছিল।
বিড়ম্বনার নাম অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট
লাশ বাড়িতে নেওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কথা উল্লেখ করে আকাশ লিখেন, ‘প্রথমে ভাড়া ৫ হাজার টাকা চাওয়া হয়। পরে এক স্বঘোষিত ‘নিয়ন্ত্রক’ এসে ভাড়া সাড়ে তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেন এবং বাকি চালকদের এর নিচে যেতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, আমি সব ড্রাইভারকে কন্ট্রোল করি।’
আকাশ আরও লিখেন, দীর্ঘ দরকষাকষির পর একজন চালক আড়াই হাজারে যেতে রাজি হলেও, ওই ব্যক্তি (নিয়ন্ত্রক) তাকে বাধা দেন ও ভয় দেখান। শেষমেশ ওই চালক যেতে রাজি হলেও, যাওয়ার আগে সিন্ডিকেট প্রধানকে ২০০ টাকা চাঁদা দিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।
চিকিৎসকদের সহযোগিতার বিপরীতে কর্মচারীদের হয়রানি
এসব অমানবিকতা, হয়রানি ও চাঁদাবাজির মাঝেও আকাশের পোস্টে চিকিৎসকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়। তিনি লিখেন, ‘কোনো সমস্যার কথা জানানো মাত্রই ডাক্তাররা দ্রুত এসে রোগী দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাঁদের ব্যবহারও অত্যন্ত মার্জিত ও আন্তরিক। তাই চিকিৎসক ও নার্সদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা রয়েছে।’
তবে হাসপাতালের অন্যান্য স্তরের কর্মচারীদের এমন অমানবিক আচরণে তিনি চরম হতাশ। প্রিয়জনকে হারানোর শোকের মাঝে এই আর্থিক ও মানসিক হয়রানিকে মানবিকতার চরম অবক্ষয় উল্লেখ করে ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে আকাশ লিখেন, ‘এই দেশে জন্মই আমার আজন্ম পাপ। দেশের আনাচে-কানাচে যেন সব জায়গাতেই কোনো না কোনো সিন্ডিকেট। আর আমরা সাধারণ মানুষ সবার খোরাক।’
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের এখানে লোকবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালে শয্যা রয়েছে এক হাজার, লোকবল আছে মাত্র ৬০০ জনের। রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি, যা আড়াই হাজার থেকে তিন হাজারের মতো। এর মধ্যে রোগীরা বহিরাগত দালালের পাল্লায় পড়েন। লোকবল বাড়লে আশা করি এসব সমস্যা কমে আসবে।’
জেএইচ/এমইউ/
-
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
-
২৮ অগাস্ট, ২০২৪
-
১২ অগাস্ট, ২০২৪
-
১০ জুলাই, ২০২৪
-
০১ এপ্রিল, ২০২৪
-
০৭ জুলাই, ২০২৩
-
২৮ অক্টোবর, ২০২২
-
১৬ জুলাই, ২০২২