ডা. মো. মেহেদী হাসান
ডা. মো. মেহেদী হাসান, এফসিপিএস (মেডিসিন), এমডি (কার্ডিওলজি), কনসালট্যান্ট, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল।
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৮ পিএম
হার্ট ভালো রাখতে ব্যায়াম করবেন যেভাবে
হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যায়াম করলে উপকারের বদলে শরীরে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও পরিমিতিবোধ জরুরি।
যেকোনো জিনিসই অতিরিক্ত হলে ক্ষতিকর হতে পারে। খাবারের মতো ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট মাত্রা ও নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন।
আমার এক রোগী নিয়মিত ব্যায়াম করতেন এবং জীবনযাপনেও বেশ পরিমিত ছিলেন। ধূমপানের অভ্যাসও ছিল না। একদিন তিনি প্রায় আধা ঘণ্টা ব্যায়াম করার পর শরীর ভালো লাগায় আরও আধা ঘণ্টা ব্যায়াম করেন। এরপর হঠাৎ তার বুকে ব্যথা শুরু হয় এবং তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন।
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, নিয়মিত ব্যায়াম করলেও হঠাৎ করে শরীরের সক্ষমতার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করা ঠিক নয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যায়াম করছেন, তাদেরও ব্যায়ামের সময়কাল ও তীব্রতা ধীরে ধীরে এবং নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
সপ্তাহে কতটুকু ব্যায়াম করবেন?
সাধারণভাবে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী। অর্থাৎ, সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট করে ব্যায়াম করা যেতে পারে।
এই সময় দ্রুত গতিতে হাঁটা, সাইক্লিং কিংবা সাঁতারের মতো মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা যায়। এমনভাবে ব্যায়াম করতে হবে, যাতে শরীর সক্রিয় থাকে এবং হৃদ্স্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেড়ে যায়। পাশাপাশি যারা উচ্চমাত্রার বা ভিগোরাস ব্যায়াম করেন, তাদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে প্রায় ৭৫ থেকে ১০০ মিনিট উচ্চমাত্রার ব্যায়ামই যথেষ্ট হতে পারে।
তবে ব্যায়ামের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, পূর্বের ব্যায়ামের অভ্যাস এবং কোনো রোগ আছে কি না, এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তরুণদের জন্য সতর্কতা
তরুণদের মধ্যে জিমে গিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করা কিংবা দ্রুত শারীরিক গঠন পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু শরীরচর্চার ক্ষেত্রে বেশি সময় ব্যয় করলেই যে বেশি উপকার পাওয়া যাবে, এমন নয়।
হঠাৎ করে ভারী ওজন তোলা, দীর্ঘ সময় কঠোর ব্যায়াম করা কিংবা শরীরের সক্ষমতার বাইরে গিয়ে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রামও শরীরের জন্য প্রয়োজন।
বিশেষ করে যারা আগে নিয়মিত ব্যায়াম করতেন না, তাদের একেবারে শুরুতেই কঠিন ব্যায়ামে না গিয়ে ধীরে ধীরে সময় ও ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো উচিত।
ব্যায়ামের পাশাপাশি খাবারেও পরিমিতি
হার্ট সুস্থ রাখতে শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না। খাবারের ক্ষেত্রেও পরিমিতিবোধ থাকা প্রয়োজন।
প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।তাই নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
একজন ব্যক্তি যদি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত খাবার গ্রহণ করেন এবং নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময় ব্যায়াম করেন, তাহলে হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কখন ব্যায়াম করা উচিত না?
ব্যায়াম করার সময় শরীরে অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে সাধারণ ক্লান্তি মনে করে চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা বুক ধড়ফড় করার মতো উপসর্গ দেখা দিলে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ থাকতে পরামর্শ
সুস্থ থাকার জন্য ব্যায়াম অবশ্যই করতে হবে, তবে তা হতে হবে নিয়ম মেনে ও পরিমিত মাত্রায়। শরীরের সক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যায়াম না করে নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত খাবার এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এনএইচ/এমআই/