এতিম কিশোরীদের যৌনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় হোপবক্স সম্প্রসারণের সুপারিশ গবেষকদের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: এতিম কিশোরীরা সহজেই যৌন নির্যাতন, শোষণ এবং জবরদস্তির শিকার হয়। ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়তেও বাধ্য হয় এই কিশোরীরা। এ অবস্থায় তাদের মাসিক স্বাস্থ্য, আধুনিক গর্ভনিরোধক এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) সংক্রান্ত জ্ঞান বৃদ্ধিতে ‘হোপবক্স’ টুলকিট কার্যকর সমাধান হতে পারে।
রোববার (১ জুন) আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা সংক্রান্ত এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে ‘জার্নি টু এভিডেন্স: সিরিজ ডিসেমিনেশন অব অ্যাডসার্চ ইনোভেশন–রাউন্ড ওয়ান’ শীর্ষক এক সেমিনারে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সেমিনারে দেশের তিনটি সরকারি এতিমখানায় এই কার্যক্রমের সাফল্য বিবেচনায় মেয়েদের সব সরকারি ও বেসরকারি এতিমখানায় হোপবক্স সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআর,বির অ্যাডভান্সিং সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাকটিভ হেলথ অ্যান্ড রাইটস (অ্যাডসার্চ) প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত চারটি উদ্ভাবনী গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। একই সাথে কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্ভাবনী সমাধানের কার্যকারিতা নিয়ে উপস্থাপনা হয়। এর একটি এতিম কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা।
অন্য গবেষণার মধ্যে রয়েছে মুখরিত অ্যাপের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের এসআরএইচআর শিখন, কিশোরী খেলোয়ারদের মাসিক স্বাস্থ্য এবং পোশাক শ্রমিকদের মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা।
এতিম কিশোরীদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষায় দিশা দেখাবে হোপবক্স
আলোচকরা জানান, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৫.৩ কোটি এতিম রয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশে রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ। দেশে ৮৫টি সরকারি এতিমখানায় ১৭ হাজার ৫০০ এতিম থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, যার মধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে আট হাজার ৭০০ মেয়ে রয়েছে। এতিম কিশোরীরা সহজেই যৌন নির্যাতন, শোষণ এবং জবরদস্তির শিকার হয় এবং তারা ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়।
এতিম কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্য, আধুনিক গর্ভনিরোধক এবং এসআরএইচআর অধিকার সংক্রান্ত জ্ঞান বিচার করতে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার (জিএসি) অর্থায়নে আইসিডিডিআর,বির অ্যাডসার্চ প্রকল্প ‘হোপবক্স’ নামের একটি প্রাসঙ্গিক ও বয়স উপযোগী এসআরএইচআর টুলকিট নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। টুলকিটটিতে রয়েছে চিত্রসহ পাঁচটি বই, প্ল্যাকার্ড এবং পাজল, যা এসআরএইচআর বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করে। ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা ও ফরিদপুরে তিনটি সরকারি এতিমখানায় এই হোপবক্স কার্যক্রম চালানো হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্য, আধুনিক গর্ভনিরোধক এবং এসআরএইচআর অধিকার সংক্রান্ত জ্ঞান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হস্তক্ষেপের আগে যেখানে আধুনিক গর্ভনিরোধক সম্পর্কে জানত মাত্র ৪% থেকে ১১%, হস্তক্ষেপের পরে তা বেড়ে ৫১% থেকে ৫৯ শতাংশে পৌঁছে। গবেষণায় হোপবক্সকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেয়েদের এতিমখানায় সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়।
এ বিষয়ে ইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সৈয়দ রুবায়েত বলেন, ‘যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত ছিল, বিশেষ করে কিশোরীদের ক্ষেত্রে। এতিম কিশোরীরা সবচেয়ে অবহেলিত একটি শ্রেণি। এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’
বাংলাদেশ অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটির (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান বলেন, ‘ওজিএসবি কিশোরবান্ধব কর্নার চালু করেছে এবং আমরা এতিম কিশোরীদের আমাদের সেবার আওতায় আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
মুখরিত অ্যাপে এসআরএইচআর শিখছে কিশোর শিক্ষার্থীরা
অনুষ্ঠানে জানানে হয়, বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা প্রায় ৩৬ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই কিশোরেরা সমাজে প্রচলিত ট্যাবুর কারণে এসআরএইচআর তথ্য ও সেবার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ‘মুখরিত’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়, যাতে কিশোর-কিশোরীরা নিজেরাই এসআরএইচআর বিষয়গুলো শিখতে পারে। জিএসির অর্থায়নে ২০২৩ সালে ফেনীর তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (ছেলে, মেয়ে এবং কো-এডুকেশন) এই অ্যাপের কার্যকারিতা ও প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়।
অ্যাপটির ইন্টার্যাকটিভ ডিজাইন, গল্পভিত্তিক কনটেন্ট এবং বন্ধুভাবাপন্ন উপস্থাপনা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শেখার সুযোগ করে দেয়। গড় জ্ঞান স্কোর ৫.৭ থেকে বেড়ে ৭.৫ এবং সচেতনতা ৬.৬ থেকে বেড়ে ৮.৭-এ পৌঁছায়, যা ১৬% উন্নতি নির্দেশ করে। এই অ্যাপ কিশোরদের মাঝে এসআরএইচআর বিষয়ে সামাজিক ট্যাবু দূর করতে সহায়তা করে এবং তারা শিক্ষক, সহপাঠী এমনকি পরিবারের সঙ্গেও খোলামেলা আলোচনা করতে শুরু করে।
অনুষ্ঠানে এক ছাত্রী (১৫) বলেন, ‘মুখরিত অ্যাপের মাধ্যমে আমি অনেক নতুন কিছু শিখেছি, যা আগে জানতাম না। এটা আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (কিশোর স্বাস্থ্য) ডা. মো. শামসুল হক বলেন, ‘কিশোরদের সঠিক এবং বয়স উপযোগী তথ্য দিতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরণে দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।’
উপেক্ষিত কিশোরী খেলোয়ারদের মাসিক স্বাস্থ্য
ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলা হয়, মাসিক হলো নারীর প্রজনন চক্রের একটি স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ক্রীড়াবিদ কিশোরীদের জন্য মাসিকের সময় শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যা তাদের পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করে। দুঃখজনকভাবে, ক্রীড়া নীতিতে মাসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থেকে গেছে।
জিএসির সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি বাংলাদেশের ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ১২–১৯ বছর বয়সী ১০০ কিশোরী ক্রীড়াবিদের মধ্যে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। তাদের মধ্যে ৬২ শতাংশ মাসিক শুরুর আগেই কিছুটা ধারণা পেয়েছিল, তবে ৮৬ শতাংশ মনে করে তাদের জ্ঞান ছিল অপর্যাপ্ত। পরিবার থেকে তথ্য পেয়েছে ৮৮%, বন্ধুদের থেকে ৬১%, অথচ পাঠ্যপুস্তক থেকে মাত্র ১১% এবং শিক্ষক বা কোচের কাছ থেকে মাত্র ৫%। মাসিক চলাকালে ৫৭% খাদ্য সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এবং ৬৫ শতাংশ শারীরিক কার্যকলাপে বাধার সম্মুখীন হয়। কেউই বিদ্যালয়ভিত্তিক মাসিক শিক্ষা পায়নি এবং মাত্র ৮% স্যানিটারি টয়লেট সুবিধা পেয়েছে।
গবেষণাটি কিশোরী ক্রীড়াবিদদের জন্য বয়সোপযোগী মাসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, পুষ্টি, সাইকেল ট্র্যাকিং, নিরাপদ গর্ভনিরোধক ব্যবহার, কোচদের প্রশিক্ষণ এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল ক্রীড়া নীতির আহ্বান জানায়।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উন্নয়ন পরামর্শক অধ্যাপক অনুপম হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশি মেয়েরা ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রতিদিন নতুন নতুন সাফল্য অর্জন করছে। আমরা যদি একসাথে কাজ করে তাদের পথের বাধাগুলো দূর করতে পারি, তাহলে তাদের অগ্রযাত্রা আরও সহজ হবে।’
পোশাক শ্রমিকদের মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা
আয়োজকরা জানান, অধিক সংখ্যক নারী কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হলেও তাদের মাসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো গবেষণা ও নীতিতে যথাযথভাবে স্থান পায়নি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এই খাত নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই প্রেক্ষাপটে অ্যাডসার্চ প্রকল্প জিএসির অর্থায়নে ঢাকা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে পাঁচটি গার্মেন্টস কারখানায় ৮৫ নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণে ছয় মাসের জন্য একটি গবেষণা পরিচালনা করে। সেখানে মাসিক ব্যবস্থাপনায় মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিশ্লেষণ করা হয়। মেডিকেল গ্রেড সিলিকন দিয়ে তৈরি ঘণ্টার মতো আকারের এই মেনস্ট্রুয়াল কাপ যোনিতে প্রবেশ করিয়ে ঋতুস্রাব সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এটি খরচ কমায়, স্বস্তি দেয় এবং কর্মক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই। বিশেষ করে যেখানে ব্যক্তিগত টয়লেট বা পরিষ্কার জায়গা সীমিত।
বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার বলেন, ‘যদি আমরা কিশোরীদের স্বাস্থ্য চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যতে সুস্থ মা পাব না। আর সুস্থ মা ছাড়া আমরা সুস্থ প্রজন্ম আশা করতে পারি না।’
অনুষ্ঠানে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজর ফারজানা সুলতানা বাংলাদেশের এসআরএইচআর উন্নয়নে কানাডার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। আইসিডিডিআর,বির মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের গবেষণা প্রধান ডা. কামরুন নাহার ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন এবং বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের এসআরএইচআর চাহিদা পূরণে সমন্বিত ও প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এনএআর/
-
২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
২৯ নভেম্বর, ২০২৪
-
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩
-
১৬ অগাস্ট, ২০২২
-
২৭ মার্চ, ২০২২
-
০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২২