আইসিডিডিআর,বির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: স্বাস্থ্যকর নগরী গড়ার তাগিদ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রাজধানী ঢাকার উন্নয়নের নামে পর্যায়ক্রমে বন্যার পানিপ্রবাহের জায়গা, কৃষিজমি, জলাভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। এতে গড়ে উঠছে অস্বাস্থ্যকর নগর ব্যবস্থা। ফলে নগরকে স্বাস্থ্যকর করতে পানিতে এক নম্বর গুরুত্ব দিয়ে অবকাঠামো গড়তে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসবে বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টের মহাপরিচালক স্থপতি ড. কাজী খালিদ আশরাফ এসব কথা বলেছেন।
এদিন নানা আনন্দঘন আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করে প্রতিষ্ঠানটি। গৌরবের ৬৪ বছর পেরিয়ে এ বছর ৬৫তে পা রেখেছে আইসিডিডিআর,বি। অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআর,বি-র কর্মীদের পাশাপাশি দাতা সংস্থা, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা অংশ নেন।
এ সময় ‘স্থাপত্যের চেয়ে স্বাস্থ্য বড়: স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তোলার প্রক্রিয়া’ শীর্ষক মূল বক্তব্য দেন স্থপতি ড. কাজী খালিদ আশরাফ। তিনি আইসিডিডিআর,বি-কে তার চমৎকার যাত্রার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এটি বিশ্বব্যাপী মর্যাদাপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান, যা স্বাস্থ্য ও উদ্ভাবনে অসামান্য অবদান রেখেছে। তিনি স্থাপত্য এবং জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন এবং ঢাকা শহরের নগরায়নের সমালোচনা করে স্বাস্থ্যকর, বসবাসযোগ্য শহর গড়ার জন্য ১১টি কার্যকর ধারণা উপস্থাপন করেন।
ড. কাজী খালিদ আশরাফ বলেন, ঢাকায় উন্নয়নের নামে পর্যায়ক্রমে বন্যার পানিপ্রবাহের জায়গা, কৃষিজমি ও জলাভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম মারাত্মক ভুল। ঢাকায় অবকাঠামো তৈরি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার নীতিমালার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হলে নদী, খাল, জলাভূমিগুলোর তীরে জায়গা রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়তে স্থাপত্য কাঠামো তৈরির নকশা ও পরিকল্পনাকে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। ভবন-অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে ভবনটাই হয় রোগ নিরাময়ের উপকরণ। যেখানে প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকবে, মানুষ নিশ্বাস নিতে পারবে।
নদী-খাল-জলাশয়ের তীরভূমি প্রাকৃতিক জনপরিসর উল্লেখ করে খালিদ আশরাফ বলেন, ঢাকার পরিকল্পনায় পানির প্রবাহকে এক নম্বরে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় হয় এর উল্টোটা।
শহরের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের মানে শুধু টাকার অপচয় উল্লেখ করে কাজী খালিদ আশরাফ বলেন, সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের নামে কিন্তু বাসযোগ্য কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত শহর করা হয় না। স্বাস্থ্যসম্মত শহরকে সুন্দর হতে হবে এমন নয়। স্বাস্থ্যসম্মত শহর করতে মৌলিক চিকিৎসাসেবা, খাদ্য সুরক্ষা, নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং তাদের জন্য প্রাকৃতিক খোলামেলা জায়গা রাখতে হবে।
শহরকেন্দ্রিক নতুন আবাসন প্রকল্পের বিষয়ে স্থপতি কাজী খালিদ বলেন, আবাসন ও ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক জলাভূমি ভরাট করে প্লট, উঁচু ভবন কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করছে; যেগুলোকে আবাসন প্রকল্প হিসেবে নামকরণের চেষ্টা করা হয়। বাস্তবে এগুলো শুধু একের পর এক ভবনই। জলাভূমি, ধান চাষ বা কৃষিকাজের জায়গা রেখেও যে আবাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, এ ধারণা দেশের আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই।
পরিবেশদূষণের বিষয়ে পানির উদাহরণ টেনে স্থপতি খালিদ আশরাফ বলেন, আগে পানিকে বিভিন্ন জিনিস বিশুদ্ধ বা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা হতো। আর এখন পানিকেই আগে বিশুদ্ধ করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসম্মত থাকার মানে এখন শুধু হাসপাতাল, ওষুধের ব্যবহার এবং নানা স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বোঝায়।
শহরে ফুটপাতে কিংবা মানুষের হাঁটাচলার জায়গার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজী খালিদ বলেন, দেশের কোনো সিটি করপোরেশনেই ফুটপাত নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা তৈরি করা হয়নি। জনপরিসর কিংবা মানুষের হাঁটাচলার জায়গা না রেখে যদি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা করা হয়, সেটা কখনো সমস্যার সমাধান নয়। দিনের পর দিন গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, ফুটপাতের জায়গা দিনকে দিন কমছে, রাস্তা বড় করা হচ্ছে। এটা যানজট সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এ সিদ্ধান্ত শহরকে মানুষের জন্য বসবাসের আরও অযোগ্য করে তুলছে।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে আইসিডিডিআ,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ প্রতিষ্ঠানের অবদান তুলে ধরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক চতুর্থ একক-ডোজ এইচপিভি ভ্যাকসিন সেকোলিনের অনুমোদনে আইসিডিডিআর,বির ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই মাইলফলকটি সার্ভিকাল ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যেখানে প্রতি দুই মিনিটে একজন নারী এই রোগে মৃত্যুবরণ করেন, এবং এর ৯০ শতাংশ মৃত্যু হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে।
তিনি আরও আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানী, গবেষক এবং কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যাঁদের অবদান এই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বব্যাপী শ্রেষ্ঠত্ব এবং স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার ফার্স্ট সেক্রেটারি (উন্নয়ন স্বাস্থ্য) এডওয়ার্ডস ক্যাব্রেরাও বক্তব্য রাখেন। স্বাস্থ্যখাতে আইসিডিডিআর,বির অসামান্য অবদানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, কানাডা থেকে আগত দর্শনার্থীরা সবসময় এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যতিক্রমী কাজ দেখে মুগ্ধ হন।
এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আইসিডিডিআর,বি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় আনন্দমেলা। এতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা বিভিন্ন পণ্য নিয়ে স্টল বসান, এবং দর্শনার্থীরা এসব পণ্য কিনে মুখরোচক খাবার খেয়ে একে অপরের সাথে মেলবন্ধনে উৎসবে অংশ নেন। এই মেলা আইসিডিডিআর,বির সামাজিক মেলবন্ধনের অনুভূতিকে প্রতিফলিত করে।
এরপর, সাসাকাওয়া মিলনায়তনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আইসিডিডিআর,বি-র কর্মীরা তাদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা প্রদর্শন করেন। অনুষ্ঠানে নাটক, ম্যাজিক শো, হাস্যরসাত্মক উপস্থাপনা, ইংরেজি গান এবং বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশন হয়। অনুষ্ঠানটি ছিল হাসি-খুশি ও প্রাণবন্ত, যা আইসিডিডিআর,বি-র সৃজনশীলতা এবং প্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এনএআর/
-
২২ মে, ২০২৬
-
১১ মে, ২০২৬
আইসিডিডিআর,বির শোক
ওআরএস উদ্ভাবনের অন্যতম বিজ্ঞানী ডা. মাজিদ মোল্লা আর নেই
-
২৩ অগাস্ট, ২০২৫
-
০২ জুলাই, ২০২৫
আইসিডিডিআর,বির গবেষণা
শিশুদের অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় আলো দেখাচ্ছে পেডিয়াট্রিক এনসিডি মডেল
-
২৬ জুন, ২০২৫
আইসিডিডিআর,বির গবেষণা
মহামারীতে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন শহুরে কর্মজীবী নারী