বিশ্বের ভয়াবহ আবহাওয়া পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ভয়াবহ পরিবর্তন নিয়ে বার্তা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। জলবায়ুর চরম বিপর্যয়, তাপদাহ, খরা ও বন্যার মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, অত্যন্ত দ্রুত গতিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ‘এল নিনো’ সামনের মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে যাচ্ছে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, বর্তমানে আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতির মাঝেই এল নিনোর এই নতুন বার্তা বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংকটের গভীরতা তুলে ধরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, এল নিনো এখন আর আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে নেই, এল নিনো ইতেমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি তো কেবল শুরু বা ওয়ার্ম-আপ পর্ব। এল নিনো ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এখন তা জলন্ত এক পৃথিবীতে যেন নতুন করে আগুনের জোগান দিচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পানির পৃষ্ঠতলের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং স্বাভাবিক আবহাওয়া কাঠামোকে ওলটপালট করে দেবে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে সবচেয়ে বেশি দাবদাহ ছড়িয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব জানিয়েছেন, এই সংকট ত্বরান্বিত করার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে জীবাশ্ম জ্বালানির বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে অবিলম্বে কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের নতুন প্রকল্পগুলো বন্ধের জরুরি আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, ডাব্লিউএমও-এর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো দিয়ে বলেন, কেবল আবহাওয়ার পূর্বাভাস কোনো বিপর্যয় ঠেকাতে পারে না, সাধারণ মানুষ ও সরকারের সিদ্ধান্ত তা ঠেকাতে পারে। তাই আগাম সতর্কবার্তাকে কাজে লাগিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গবেষকদের ধারণা, চলতি বছরের শেষের দিকে এই এল নিনো সর্বকালের ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
এল নিনো এবং লা নিনা হলো ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ (এনসো)-এর দুটি বিপরীত পর্যায়। এটি বছরের পর বছর জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক। এটি একটি প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া জলবায়ু প্রক্রিয়া। এতে কেন্দ্রীয় এবং পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছরে একবার এল নিনো দেখা দেয়। এর স্থায়িত্ব থাকে প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস। এগুলো প্রায় মার্চ এবং জুনের মধ্যে তৈরি হতে শুরু করে। এরপর নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারির মধ্যে এটি সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায় এবং এর শুরুর পরের বছর বৈশ্বিক তাপমাত্রার ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
তবে প্রতিটি এল নিনো ঘটনার প্রভাব এর তীব্রতা, সময়কাল এবং বছরের কোন সময়ে এটি তৈরি হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়। এটি অন্যান্য জলবায়ু পরিবর্তনশীলতার (যেমন ভারত মহাসাগরের ডাইপোল) সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তাও গুরুত্বপূর্ণ।
ডব্লিউএমও এল নিনোর তীব্রতাকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এই চারটি স্তরে ভাগ করে। তবে ‘সুপার এল নিনো’ শব্দটি ডব্লিউএমও-এর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনগত শ্রেণিবিন্যাসের অংশ নয়।
এমআই/