মেডিকেল দাওয়াহ সোসাইটির সিরাহ কনফারেন্স
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিমদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আহ্বান
মেডিভয়েস রিপোর্ট: চিকিৎসা পেশায় আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধ, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও পেশাগত উৎকর্ষের গুরুত্ব তুলে ধরে ‘সিরাহ কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কনফারেন্সে রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনাদর্শ অনুসরণ করে চিকিৎসকদের জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান বাড়ানো, গবেষণায় এগিয়ে আসা এবং রোগীর প্রতি কোমল ও মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
আজ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মুক্তিযোদ্ধা হলে মেডিকেল দাওয়াহ সোসাইটি অব বাংলাদেশের উদ্যোগে এ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠনে স্বাগত বক্তব্যে রাখেন মেডিকেল দাওয়াহ সোসাইটির আহ্বায়ক ডা. আব্দুল্লাহ আল আমিন। বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মেডিকেল জগতে ইসলামী সংস্কৃতির জাগরণ ও দাওয়াহমূলক কার্যক্রমের লক্ষ্যে মেডিকেল দাওয়াহ সোসাইটির যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে সিরাতুন নবী (সা.)সহ নানা ইসলামী আয়োজন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইসলামী সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাসে বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোবা ও দামেস্কের মতো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলোতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থায় চিকিৎসা পেশার সঙ্গে তাঁর আদর্শের চর্চা তেমনভাবে দেখা যায় না।
আব্দুল্লাহ আল আমিন আরও বলেন, মেডিকেল কলেজগুলোতে ইসলামী সংস্কৃতির জাগরণের লক্ষ্যে সোসাইটির উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি চলছে। গত এক মাসে দেশের প্রায় ২০টি ক্যাম্পাসে সিরাতুন নবী (সা.) উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। মেডিকেল সেক্টরে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটানোর আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি সবাইকে শৃঙ্খলার সঙ্গে অনুষ্ঠান সফল করার আহ্বান জানান।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান বাড়ানোর আহ্বান
কনফারেন্সে প্রথম আলোচনা করেন তারবিয়াহ এডুকেশনের ফাউন্ডার ও চেয়ারম্যান প্রফেসর মোখতার আহমেদ। তিনি বলেন, চিকিৎসা পেশা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন, হালাল-হারামের জ্ঞানের পর চিকিৎসাবিদ্যার চেয়ে উপকারী জ্ঞান তিনি জানেন না। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, মুসলিমরা চিকিৎসাবিদ্যার জায়গাটি অবহেলা করেছে এবং আহলে কিতাবরা এ ক্ষেত্রে তাদের ছাড়িয়ে গেছে। আজকের বাস্তবতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
ইবনে খালদুন (রহ.)-এর ‘আল-মুকাদ্দিমা’র উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, কোনো সমাজে অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিজ্ঞান ও জ্ঞানের বিকাশ সম্ভব নয়। মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগও এসেছিল যখন মুসলিম সমাজ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশে মুসলিমদের ঐতিহাসিক অবদান থাকলেও বর্তমান সময়ে গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরও এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, একজন মুসলিম চিকিৎসকের কাছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল, বিশুদ্ধ আকিদা ও ঈমান থাকা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, শুধু একজন ভালো চিকিৎসক হওয়াকে লক্ষ্য না রেখে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন অবদান রাখার স্বপ্ন দেখতে হবে, যা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কাজের ক্ষেত্রে উৎকর্ষের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ নিখুঁতভাবে কাজ করতে হবে। চিকিৎসকদেরও নিজেদের পেশাকে সেই মানে নিয়ে যেতে হবে—আধুনিক জ্ঞান, গবেষণা, দক্ষতা ও ইসলামী মূল্যবোধকে একসঙ্গে ধারণ করে।
মানবিক আচরণে চিকিৎসকদের মনোযোগ বাড়ানোর আহ্বান
দ্বিতীয় আলোচক নাগাইশ দরবার শরীফের পীর মাওলানা মোস্তাক ফয়েজি বলেন, রাসুল (সা.) পৃথিবীকে যে আলো দিয়েছেন, তা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির আলো নয় বরং অন্ধকার থেকে মানুষকে আলোতে নিয়ে এসে পশুপ্রবৃত্তি দমন ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানোর আলো। তিনি এমন এক সময়ে এসেছিলেন, যখন সমাজে শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর সংকট ছিল এবং নারীরা চরম অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হতেন। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ রাসুল (সা.)-কে রহমাতুল্লিল আল-আমিন হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁর জীবন ছিল মানুষের জন্য অনুপম আদর্শ। তিনি জাতি, বর্ণ, ধনী-গরিব, আরব-অনারবের বৈষম্য দূর করে মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল মানুষের চরিত্র ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধন।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে মাওলানা মোস্তাক ফয়েজি বলেন, চিকিৎসা পেশা শুধু রোগ নিরাময়ের পেশা নয়, এর সঙ্গে মানুষের প্রতি কোমল ব্যবহার ও সহমর্মিতাও জড়িত। বাংলাদেশের অনেক মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারত বা থাইল্যান্ডে যায়। এর পেছনে চিকিৎসার মানের পাশাপাশি সেখানকার সেবাকর্মীদের সুন্দর ব্যবহারও ভূমিকা রাখে। তাই একজন রোগী যেন শুধু চিকিৎসকের আচরণ বা সহকারীর দুর্ব্যবহারের কারণে বিদেশমুখী না হন, সেদিকে চিকিৎসকদের গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি রোগীকে মানসিক ও আত্মিকভাবে সাহস দিতে পারেন। নবীর জীবন থেকে কোমলতা, সহমর্মিতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা নিয়ে চিকিৎসকদের সেবামুখী মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
মাওলানা মোস্তাক আরও বলেন, একজন চিকিৎসক তৈরি হওয়ার পেছনে শুধু তাঁর বাবা-মায়ের নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও অবদান রয়েছে। গ্রামের মানুষ একজন চিকিৎসককে নিয়ে স্বপ্ন দেখে—একদিন বিপদে পড়লে গ্রামের সেই সন্তানই পাশে দাঁড়াবে। তাই চিকিৎসকদের উচিত মানুষের সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রাখা এবং পেশাটিকে শুধু জীবিকা হিসেবে নয়, মানুষের সেবার দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা।
ক্যালিগ্রাফিতে ইসলামী ঐতিহ্য তুলে ধরার আহ্বান
কনফারেন্সে বাংলাদেশ চারুশিল্পী পরিষদের সভাপতি ইব্রাহিম মন্ডল বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই ক্যালিগ্রাফির চর্চা হয়েছে। তবে নান্দনিকতা ও প্রসিদ্ধির দিক থেকে আরবি ক্যালিগ্রাফি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। আরবি অক্ষরের গঠন ও বিন্যাস বিভিন্ন নকশার সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি প্রাণীর চিত্রাঙ্কন নিয়ে নিষেধাজ্ঞার পর মুসলিম শিল্পীরা পবিত্র কুরআনের বাণীকে শিল্পের উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়ে অসাধারণ লিপিচাতুর্য তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে আরবি ক্যালিগ্রাফি বিশ্ব শিল্পকলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়।
ইসলামী শিল্পের বিকাশ মূলত তিনটি ধারায় হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো হলো—ক্যালিগ্রাফি, নকশাকলা ও স্থাপত্যশিল্প। নকশাকলায় ফুল-লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মসজিদের অলংকরণে এসব নকশা শুধু ধর্মীয় নয়, শিল্পগতভাবেও মানুষের মনে আনন্দ ও সুন্দর আবহ তৈরি করে। একইভাবে মসজিদ স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য নিয়েও আধুনিক স্থপতিরা গবেষণা করেছেন।
মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেও ইসলামী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ এই ধারা নিয়ে কাজ করায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের কাজগুলো অসাধারণ হয়েছে। যারা অংশগ্রহণ করেছেন, সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারা ইসলামী শিল্পের এই ধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশ্বে চলমান মানবিকতার সংকট মোকাবিলায় ইসলামী সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার চেষ্টা করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিরাতের আলোকে জীবন পরিচালনার আহ্বান
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে দাওয়াহ সোসাইটির উপদেষ্টা হাফেজ ডা. রেজওয়ানুল হক বলেন, ‘প্রাণবন্ত আলোচনা ও পরবর্তী জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়ায় আলোচকদের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিরাত সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন এবং তা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় ও কর্মজীবনে প্রয়োগের সুস্পষ্ট রোডম্যাপের অভাব রয়েছে। মেডিকেল দাওয়াহ সোসাইটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, যারা জেনারেল ব্যাকগ্রাউন্ডে পড়াশোনা করছেন, তারা যেন শুধু বৈষয়িক কাজকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের আলোকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মজীবন পরিচালনা করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ২৩ বছরের মধ্যে একটি বর্বর জাতিকে সোনার মানুষে পরিণত করেছিলেন। আমরা যদি তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে কাজ করতে পারি, তাহলে নিজেদেরকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে এবং একটি সোনালী জাতি উপহার দিতে পারব।
প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ
এর আগে সিরাতুন্নবী উপলক্ষে সারাদেশে দাওয়াহ সোসাইটি আয়োজিত তিনটি প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে ছিল একক হামদ-নাত, কোরাস হামদ-নাত এবং ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। পরে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কনফারেন্সের সমাপ্তি হয়।
একক হামদ-নাত প্রতীযোগীতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের আব্দুল্লাহ আল হিশাম অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘এ অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করছি। ছোটবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে ইসলামী সংগীতের সঙ্গে যুক্ত আছি। এর আগে ২০১৭ সালে এটিএন বাংলার ‘প্রতিভার খোঁজে ইসলামিক জিনিয়াস’ প্রতিযোগিতায় হামদ-নাতে সারাদেশে প্রথম হওয়ার সুযোগ হয়েছে। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পারফর্ম করেছি।’
মেডিকেল দাওয়াহ সোসাইটির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেডিকেল অঙ্গনে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দিতে এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বীন চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে তারা যে উদ্যোগ নিচ্ছে, এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
এমআর/