২১ জানুয়ারী, ২০২৫ ০৮:০১ পিএম

ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (২০ জানুয়ারি) দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে কলেজের ডা. মনসুর খলিল ছাত্রাবাসে এই ঘটনা ঘটে। তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে হামলার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) মানববন্ধন করেছেন একদল শিক্ষার্থী। একই সাথে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কলেজ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজ প্রশাসন বিষয়টির সুরাহা না করে উল্টো ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করছে। 

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, রোববার (১৯ জানুয়ারি) বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮৯তম জনবার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রদল ক্যাম্পাস শাখার ব্যানারে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তবে মেডিকেল কলেজটিতে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের ১৩ আগস্টও ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে একটি নোটিসও জারি করে প্রশাসন।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে কলেজটির সর্বশেষ ব্যাচ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের পাঁচ-ছয়জন ছাত্র জড়িয়ে পড়ায় সোমবার (২০ জানুয়ারি) রাত ১০টার দিকে ব্যাচ মিটিং আহ্বান করা হয়। সেখানে ছাত্র রাজনীতি শুরু করার প্রতিবাদ করেন শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সিয়াম, নাবিল, মাশরাফি, আরাত, অপূর্ব এবং জাহিদ তাদের ওপর হামলা চালায়।

শিক্ষার্থীরা বলেন, হামলায় সাজ্জাদ হোসেন নাদিম, ইকরামুল খান নামে দুইজন আহত হন। পরে তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে অভিযুক্তদের দাবি, এ ঘটনায় আরাতও আহত হয়েছেন।

মানববন্ধনে এস এম রাকিবুল ইসলাম ও নাজমুল বাসার নাঈম তাদের বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। একই সাথে কলেজ ক্যাম্পাসে যেন কোনো ছাত্র রাজনীতি না চলে—তা নিশ্চিত করারও দাবি জানান তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, মানববন্ধনে অংশ নিতে চাইলে নারী শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া লিখিত অভিযোগ জানাতে গেলে কলেজ প্রশাসন শিক্ষার্থীদেরকে উল্টো দোষারোপ করেন বলেও জানান তারা। এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন এসব শিক্ষার্থী।

হামলায় সম্পৃক্তদের কেউ কেউ নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগও করেছেন শিক্ষার্থীরা। বলেন, নাবিল, আরাত ও অপূর্বকে বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি নাহিদুল ইসলামের সঙ্গে দেখা গেছে। 

সূত্রপাত যেভাবে

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী আজ বিকেলে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে আগে থেকেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। কিন্তু সম্প্রতি সিনিয়রসহ আমাদের ব্যাচের কয়েকজন মিলে ‘সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদল’ ব্যানারে প্রোগ্রাম করে। এ নিয়ে আমরা প্রতিবাদ জানালে তারা আমাদের উপর হামলা চালায়। এতে দু’জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।’

একই অভিযোগ করে আরেক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ছাত্রলীগ রাজনীতি করে আসছিল। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের নোটিস পুনরায় বলবৎ হয়। কিন্তু কিছু দিন আগে দুই-একজন স্থানীয় শিক্ষার্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তারা ক্যাম্পাসের বাইরে রাজনীতি করলে সমস্যা নেই, কিন্তু হোস্টেলে ব্যানার টানিয়ে রাজনৈতিক প্রোগ্রাম করেন। এরপর ব্যাচ হিসেবে বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা মিটিং ডাকি। কিন্তু তারা বলে এটি তাদের ‘অধিকার’।

হামলায় জড়িতদের পাঁচ-ছয়জন আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে একজন তাদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, তোরা কিছু দিন আগে ছাত্রলীগ ছিলি, এখন ছাত্রদল করছিস। তোরা তো রূপ বদলাচ্ছিস। এটি বলার কারণেই তার উপর হামলে পড়েন ছাত্রদল সমর্থকরা। তার মাথায় আঘাত করেন, কিল-ঘুসি শুরু করেন। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরেকজন হামলার শিকার হন। পরে ছাত্রদল সমর্থকরা বেরিয়ে গিয়ে লাঠি-সোঁটা নিয়ে ফিরে এসে ভাঙচুর শুরু করেন। এ সময় সিনিয়ররা তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়। এর মধ্যে আহতদের আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু রাত একটা-দেড়টার দিকে বহিরাগতরা হাসপাতালে প্রবেশ করে। পরে নিরাপত্তার হুমকি বিবেচনায় আহতদের রুমে নিয়ে আসি। আমরা হাসপাতালে গেলে তারাও একজনকে (আরাত) ভর্তি করতে নিয়ে আসে। তাদের দাবি, আমরা নাকি তাদেরকে মেরেছি। কিন্তু ক্যাম্পাসের সকলে জানে, আমরা তাদের গায়ে হাত দেইনি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা আজকে মানববন্ধন করতে চাইলেও মেয়েদেরকে ভয় দেখিয়ে হোস্টেলে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। আমরা শুধু নিরাপদ পরিবেশে শান্তিতে পড়াশোনা করতে চাই। যখন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছিল, তখন আমাদের এবং মেয়েদের নিরাপত্তা ছিল না। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা এই নিষিদ্ধ রাজনীতি ক্যাম্পাসে হতে দিতে চাইনি। আমরা ব্যাচের ৯৮ জন শিক্ষার্থী, এর মধ্যে ৯০ জনই ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে। ছয়জন মাত্র এর পক্ষে। আমাদের অন্যায়টা কোথায়?’

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি থাকলে পাওয়ার পলিটিক্স হয়। তারা ছাত্রদের পক্ষে কথা বলার তুলনায় বিপক্ষে বেশি বলে। অনেক শিক্ষার্থীর উপর জুলুম-হেনস্তা করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকেই আমরা এ ব্যাপারে একমত হই যে, কোনো ছাত্র রাজনীতি থাকবে না। কিন্তু এখন আবার আমরা ব্যানার দেখতে পাচ্ছি। আগে যখন ছাত্রলীগ ছিল, তখন মারামারি করে নিষিদ্ধ হয়। এরপর আবার তারা ফিরে আসে, আবার একই ঘটনা ঘটে। আমরা আর এটি হতে দিতে চাই না।’

এ ঘটনায় অভিযোগের মুখে থাকা ছয় শিক্ষার্থীর সকলের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আহত দাবি করা আরাতের সঙ্গে কথা বলতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে কল দেওয়া হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি।

আরেক অভিযুক্ত অপূর্ব মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এখানে শিক্ষার্থীদের আঞ্চলিকতা বিষয়ক ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু এটিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা কাউকে আঘাত করিনি। উল্টো তাদের হামলায় আমাদের একজন আহত হয়েছে।’

এ সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত নন বলেও জানান অপূর্ব। তবে ছাত্রলীগ সভাপতি নাহিদুল ইসলামের সাথে ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, নাহিদুল ইসলাম আমার এলাকার সিনিয়র। এজন্য তার সাথে ছবি তোলা।’

তিনি বলেন, ‘এখানে দুটি পক্ষ আছে। দুই পক্ষই কলেজ প্রশাসনের কাছে গিয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করবে প্রশাসন।’

অভিযোগের তীর প্রশাসনের দিকেও

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা স্যারদের কাছে যে রকম আশা নিয়ে গিয়েছি, তেমন সাড়া পাইনি। তাঁরা আমাদের কথা শোনেননি। উল্টো আমাদেরকেই দোষারোপ করেছেন। শুধু বলা হয়েছে, একটি গভর্নিং বোর্ড গঠন করে মারামারির ঘটনা তদন্ত করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলিনি। আমরা আজকে ক্লাস বর্জন করেছি। কিন্তু স্যার আমাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘তোমাদের ক্লাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিলাম। পরবর্তী নোটিস না দেওয়া পর্যন্ত তোমাদের ক্লাস বন্ধ থাকবে।’ তারা আমাদেরকে বিষয়টি প্রকাশ করতেও কঠোরভাবে নিষেধ করে দেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি ‘সমাধান হয়ে গেছে’ উল্লেখ করে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. এহসানুল হক জুয়েল অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তবে অধ্যক্ষ ডা. মো. মুজিবুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি তিনি।

এনএআর/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
হামলা-হুমকি উপেক্ষা করেই আহতদের সেবা দেন চিকিৎসকরা: এনডিএফ
জুলাই উদযাপনে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা 

হামলা-হুমকি উপেক্ষা করেই আহতদের সেবা দেন চিকিৎসকরা: এনডিএফ

জুলাই উদযাপনে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা 

হামলা-হুমকি উপেক্ষা করেই আহতদের সেবা দেন চিকিৎসকরা: এনডিএফ

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত