০১ মে, ২০২৪ ০৫:৩৩ পিএম

সৈয়দ নজরুল মেডিকেলে মারধরের ঘটনা ভিত্তিহীন, দাবি অভিযুক্তদের

সৈয়দ নজরুল মেডিকেলে মারধরের ঘটনা ভিত্তিহীন, দাবি অভিযুক্তদের
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: কিশোরগঞ্জের শহীদ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ ইকরামকে মারধরের ঘটনা সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা। গত ২৯ এপ্রিলের মারধরের ঘটনা তদন্তে ঘটিত কমিটির কাছে লিখিতভাবে এ দাবি করেছেন তারা।

অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা হলেন, সৌরভ পাল, হোসাইন সিদ্দিক রাফি, মাহির তাজওয়ার তাবীব, সানদেব দাস শাওন, অনিমেষ দাশ প্রতীম, তাসনিমুল হাসান নাফিজ, মোবারক মিয়া, মোহাম্মদ শাদিদ, অভিক বণিক, হাসান মোর্শেদ হোসাইনী, আব্দুল্লাহ আল মারুফ ও তানভীর আহমেদ অনিক।

অভিযুক্ত ১২ শিক্ষার্থীর দাবি, ‘ঘটনাটি সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক ও ভিত্তিহীন, যার প্রমাণ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ভর্তিকৃত কাগজপত্র।’

তারা বলছেন, ‘ফয়সাল আহমেদ ইকরামের দাবি তাকে ২৪ এপ্রিল ভোরে একই মেডিকেলের কিছু শিক্ষার্থী তার রুমে প্রবেশ করেন এবং তাকে মারধর করার কারণে তার ডান হাতের সোল্ডার ডিজলোকেশন হয়। পরে শরীরে বিভিন্ন জখম হয়। যার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এই ঘটনা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক। সেদিন এপ্রিল সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেদিন ৬টা ১১ মিনিটে তার রুম ৩০১ থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপড়ে উঠে যায়। এ সময় তার চলাচলে কোন ধরনের জখম বা আঘাত, সোল্ডার ডিজলোকেশন বা অসঙ্গতি দেখা যায়নি এবং সে ডান হাতেই ফোনে কথা বলছিল। সেই সঙ্গে ৮টা ৩২ মিনিটের ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলা করতে দেখা যায়।’

অভিযুক্তদের দাবি, ‘ফয়সাল আহমেদ ইকরামের দাবি তাকে মেরে সোল্ডার ডিজলোকেশন করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই দিনের ৯টা ৯ মিনিটে ফয়সাল ক্লাস করার জন্য কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ক্লাসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, যা সিসিটিভিতে স্পষ্ট এবং সে ৯টা ৩০ মিনিটে ক্লাসেও অংশগ্রহণ করে।’

তারা আরও বলছেন, ‘ফয়সাল আহমেদ ইকরাম ঘটনা আরো বড় করার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের ফাইল ও মেডিসিন বিভাগের ভর্তিকৃত চিকিৎসা নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়। ভর্তির সময় ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার তার গায়ে কোনো ধরনের মারামারির চিহ্ন খোঁজে পায়নি। এমনকি মেডিসিন বিভাগের ভর্তি হবার পর মেডিসিন বিভাগের ডাক্তারদের পরীক্ষা মাধ্যমে কোন আঘাত বা জখম বা সোল্ডার ডিজলোকেশনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ভর্তিকৃত চিকিৎসা নথিপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, তার মাসকুলোস্ক্যালিটাল এক্সামিনেশনের প্রতিবেদন পুরোপুরি স্বাভাবিক। এসব কিছুর লিগাল ডকোমেন্ট আছে, যা সংযুক্ত করা হলো। ফয়সাল আহমেদ ইকরাম তার সাজানো নাটকে ফায়দা হাসিলের জন্য সামান্য ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে তার টার্গেটকৃত একদল শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করে। যেখানে মেডিকেলের ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থী লিমনও রয়েছে। অথচ ঘটনার দিন লিমন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। সিসিটিভি ফুটেজ বা কোন ঘটনায়ও লিমন জড়িত না।’

অভিযুক্তদের মধ্যে মেডিকেলের ১০তম ব্যাচের রেজওয়ান স্বনন বলেন, ‘২৪ তারিখের ঘটে যাওয়া ঘটনা মারধর বা হামলার নয়। সেখানে কেউ কাউকে হামলা বা মারধর করেনি। আমরা ক্যাম্পাসে পূর্বে চলমান ফয়সালকে নিয়ে একটি ঘটনা সমাধানে গিয়েছিলাম, কিন্তু ভিক্টিভ ফয়সাল আহমেদ সমাধানের পক্ষে ছিল না। তারপর আমরা তাকে বুঝিয়ে চলে আসি। তারপর তিনি আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বানোয়াট অভিযোগ তুলে নিজের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে।’

অভিযুক্ত আরেক শিক্ষার্থী সৌরভ পাল বলেন, ‘আমার বন্ধু ফয়সাল আহমেদ ইকরাম ক্যাস্পাসে নানা বিশৃঙ্খলামূলক কাজ করে আসতেছিল। সেটার সমাধানের জন্য আমরা ও সিনিয়ররা মিলে তাঁর রুমে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে সমাধানের জন্য রাজি না হয়ে উল্টো আরো আক্রমণাত্মক আচরণ করে। তখন আমরা বেরিয়ে আসি। তারপর তিনি আমাদের ফাঁসানোর জন্য বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টাকার দিয়ে সাজানো নাটক প্রচার করে। আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।’

গত ২৪ এপ্রিল ক্যাম্পাসের ছাত্রাবাসের নিজ রুমে নির্যাতন শিকার হন বলে দাবি করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ ইকরাম। পরে এ ঘটনায় গত ২৫ এপ্রিল সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আশুতোষ সাহাকে লিখিত অভিযোগ করেছেন ফয়সাল। এতে তিনি জড়িতদের বিচার ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

লিখিত অভিযোগে ফয়সাল আহমেদ ইকরাম বলেন, ‘বিনীত নিবেদন এই যে, আমি মো. ফয়সাল এসএন-১২তম ব্যাচ, রোল-০৬, সেশন ২০২২-২৩ অত্র কলেজের একজন নিয়মিত ছাত্র। বিগত ২২ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কলেজ মাঠে বহিরাগতদের অনৈতিক কার্যক্রম দমনের উদ্দেশ্য এসএন-১০ এর ভাইদের সাথে আমরা এসএন-১২ মাঠে উপস্থিত হই। আমি মাঠে উপস্থিত হতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় এসএন-১০ এর আসাদুজ্জামান ফয়সাল ভাই আমার মা-বাবাকে নিয়ে গালিগালাজ করেন। এই ক্ষেত্রে আমি ভাইকে মা নিয়ে গালিগালাজ করতে নিষেধ করি এবং তৎক্ষণাৎ বিষয়টা ভাই বেয়াদবি হিসেবে নিয়েছেন বুঝতে পেরে তার কাছে ক্ষমা চাই এবং ভাইকে বিষয়টা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য অনুরোধ করি।’

এতে আরও বলা হয়, ‘পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিল ২০২৪ তারিখ সন্ধ্যার দিকে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে রাজু ভাইয়ের রুমে যাই। ২৪ এপ্রিল সকাল আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে আমার রুমে ফেরত আসি। পরবর্তীতে আমি ঘুমিয়ে পড়লে হঠাৎ আমার উপর ১০-১২ জন মিলে ঘুমন্ত অবস্থায় আমাকে শরীরে আঘাত করতে থাকে এবং আঘাত থেকে মাথা রক্ষা করার জন্য আমি মাথায় হাত দিয়ে রাখি। এই সময় এসএন-১০ এর কয়েকজনকে (ফয়সাল ভাই, স্বনন, তীর্থ, জয়, শাফিন, তাহের, অর্ঘ, আনন্দ ও রাজকুমার) চিনতে পারি। তারা অনেক্ষণ আঘাত করার পর এসএন-১২ আমার কিছু ছেলে ব্যাচমেট রুমে প্রবেশ করে আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো আঘাত করতে থাকে। তাদের মধ্যেও আমি কয়েকজনকে (রাফি, সৌরত, নাফিজ, অনিমেষ, তাবিব, অনিক ও শাওন) চিনতে পারি।’

ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগে বলেন, ‘তারা অনেকক্ষণ ধরে আমাকে শারীরিক নির্যাতন করার পর ক্লান্ত হয়ে বেরিয়ে গেলে আমি কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে জীবন রক্ষার আশায় ৫মতলায় সিনিয়র ভাইদের কাছে চলে যাই। পরবর্তীতে আমি ঘটনাটি স্যারদের জানানোর উদ্দেশ্যে একাডেমিক ভবনে গেলে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পরে যাই। আমার বন্ধুরা আমাকে সাথে সাথেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মাধ্যমে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করায়। এমতাবস্থায় আমি এবং আমার পরিবার খুবই আতঙ্কিত ও মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণে নিজেকে অনিরাপদ মনে করছি। মহোদয়ের সমীপে আমার আকুল আবেদন, আমি বর্বর ও অমানবিক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং ভবিষ্যতে এই মেডিকেলে নির্ভয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার মতো নিরাপদ পরিবেশ কামনা করছি।’

গত ২৯ এপ্রিল ঘটনা জানতে মেডিকেলের অধ্যক্ষ ডা. আশুতোষ সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজকে (২৯ এপ্রিল) কমিটির সদস্যরা তদন্ত করছেন। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই বিষয়ে কোনো কথা বলা যাবে না।’

তবে ১ মে একাধিকবার ডা. আশুতোষ সাহার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।

এসএইচ/এএনএম

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক