বছরজুড়ে চিকিৎসক নিগ্রহ: আলোর মুখ দেখেনি সুরক্ষা আইন
সাখাওয়াত আল হোসাইন: মানুষ অসুস্থ হয়ে শরণাপন্ন হন চিকিৎসকদের কাছে। আবার তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আরোগ্য শিল্পীদেরই মাঝে মাঝে লাঞ্চনা বা মাধররের শিকার হতে হয় সেবা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের হাতে। কখনও কখনও এমন ঘটনা নাড়া দেয় মানুষের বিবেক। সেইসঙ্গে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে সারাদেশে। কিছু ঘটনা ছাপিয়ে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে। এরকম ঘটনা কখনো জাতির জন্য শুভকর নয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বছর জুড়েই ঘটেছে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সুরক্ষা আইন করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হলেও, কোনো সায় নেই কর্তৃপক্ষের।
পিটিয়ে রক্তাক্ত
ডা. রবিন হাসান হাবিব
ভুয়া রিপোর্টের প্রতিবাদ করায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন রাজশাহীর শাহ মখদুম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রবিন হাসান হাবিব। পরে পাওনা টাকা চাওয়ায় তাঁকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে হাসপাতাল মালিকপক্ষের লোকজন। গত ১২ মে দুপুর দেড়টার দিকে হাসপাতাল চত্বরে তাঁকে রড দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। এ সময় তাঁর মুঠোফোন, মানিব্যাগ আর মোটর সাইকেল কেড়ে নেয় হামলাকারীরা।
ডা. রবিন হাসান হাবিব জানিয়েছেন, এক সময় এখানে কর্মরত ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের বায়োকেমেস্ট্রির স্বনামধন্য অধ্যাপক ডা. ইরফান রেজা। বেশ কিছু দিন আগে তিনি হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। এর পর তাঁর সিল ও স্বাক্ষর নকল করে পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলোর রিপোর্ট দেওয়া হতো। একইভাবে আল্ট্রাসাউন্ডেরও ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া হতো হাসপাতালে।
ডা. রবিন হাসান হাবিবের অভিযোগ, বিষয়টি জানার পর এ নিয়ে হাসপাতালের এক পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি এবং অনৈতিক এ কাজের প্রতিবাদ জানান। এর পর থেকেই তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয় কর্তৃপক্ষ। এক পর্যায়ে ঠুনকো অযুহাত দেখিয়ে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে শোকজ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে যথাসময়ে শোকজের জবাবও দেন তিনি। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
ডা. সাজ্জাদ হোসাইন
গত ৮ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ইন্টার্ন চিকিৎসক সাজ্জাদ হোসাইন। হামলায় তার নাক, চোখ, দাঁত ও কানে গুরুতর জখম হয়েছে। ডিএমসি কে-৭৩ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীদের নির্মম আঘাতে তার কানের পর্দা ছিড়ে গেছে। কানে কম শুনতে পাচ্ছেন। দাঁতের মাড়ি কেটে গেছে। নাকের সেপ্টাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুধু আইডি কার্ড দেখাতে না পারায় এ হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাজ্জাদ। হামলাকারীদের গলায় ঢাবির আইডি কার্ড ছিলো বলেও দাবি তার।
কুপিয়ে জখম
ঢাকার আশুলিয়ায় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আজহারুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ডা. রুমা আক্তারকে সড়কে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে রকি দেওয়ান নামে এক বখাটে যুবক। হামলায় অংশ নিয়েছেন রকি দেওয়ানের বাবা জামাল দেওয়ান ও তার স্বজনরা। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি দম্পতির শিশুকন্যা তুরফা আক্তারও।
এ ঘটনায় থানায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসক। ঘটনার তিনদিন পর দুপুরে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত জামাল দেওয়ানকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে আশুলিয়া থানা পুলিশ।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুলাই রাত পৌনে ৮ টার দিকে আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকা থেকে প্রাইভেটকারযোগে নিজ বাড়ি কাঠগড়া উত্তরপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন ভুক্তভোগী দম্পতি। তারা আশুলিয়ার শেরআলী মার্কেট সংলগ্ন ধলপুর এলাকায় পৌঁছলে অভিযুক্ত রকি দেওয়ানের মোটরসাইকেলে সামান্য ধাক্কা লাগে। এ সময় রকি উত্তেজিত হয়ে অকথ্য গালিগালাজ শুরু করেন। পরে ভুক্তভোগী তার প্রাইভেটকার থেকে নেমে ঝগড়া না করার আহ্বান জানান, কিন্তু আরও উত্তেজিত হয়ে রকি পাশের সাদ্দামের হোটেল থেকে একটি ছুরি এনে ভুক্তভোগী আজহারুলকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। এ সময় তার স্ত্রী রুমা গাড়ি থেকে নেমে স্বামীকে বাঁচাতে গেলে সন্ত্রাসীরা তার মাথায় আঘাত করেন। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। এ সময় রুমার গলায় থাকা এক ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে চলে যায় তারা।
লাঞ্ছিত ইউএইচএফপিও
হাসপাতালের বাইরে মোটরসাইকেল রাখতে বলায় একটি ওষুধ কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধির হামলার শিকার হয়েছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা (ইউএইচএন্ডএফপিও) ডা. মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার। গত ৩০ জুন হাসপাতাল চত্বরে এ হামলার শিকার হন তিনি।
হামলার ঘটনা নিয়ে ডা. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, হাসপাতালের ভিতরে ওষুধ কোম্পানির লোকজন গাড়ি পার্কিং করার কারণে রোগীরা লাইনে দাঁড়াতে পারছেন না। তিনি গিয়ে গাড়ি বাইরে রেখে সংশ্লিষ্টদের ভেতরে আসতে বলেন। কিন্তু ফার্মাশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধি ইফেতাকারুল ইসলাম ওরফে ধলু (২৫) উত্তেজিত হয়ে ইউএইচএফপিও’র ওপর হামলা চালায়। হেলমেট দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করতে থাকে। পরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মচারী ও বহির্বিভাগের রোগীর স্বজনরা উদ্ধার তাকে উদ্ধার করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ ডাকে। কিন্তু পুলিশ আসে ঘটনার দুই ঘণ্টা পর। এ সময়ের মধ্যে ওই ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করে। পুলিশ নাকি সেদিন বৃষ্টির জন্য আসতে দেরি হয়েছে।’
সুরক্ষায় প্রয়োজন আইন
চিকিৎসকদের ওপর এসব হামলার প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সুরক্ষা আইন করার জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছি সরকারকে। সেইসঙ্গে রোগী সুরক্ষা আইনের জন্যও বলছি। চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিতে হবে সরকারকে। আইন হলে কিছুটা হলেও চিকিৎসকরা সুরক্ষা পাবেন।’
অনেক সময় ঠুনকো অভিযোগে চিকিৎসকের উপর মারধর বা হাসপাতাল ভাংচুর করে কিছু মানুষ। এগুলো কোনো সমাধান নয়। রোগীরা আবেগপ্রবণ হয়ে এসব কাণ্ড ঘটায়। এ ধরনে কাজ থেকে বিরত থাকতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান ডা. কামরুল হাসান।
তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি বিভাগে দুর্ঘটনায় আহত বা অন্য কারণে অনেক রোগী একসাথে যখন চলে আসে, তখন চিকিৎসকরা সেবা দিতে প্রচুর হিমশিম খায়। সেখানেও রোগীরা ক্ষুব্ধ প্রত্রিুয়া ব্যক্ত করে। অনেক সময় চিকিৎসকের ওপর চড়াও হয়। এটি ঠিক নয়। রোগীর কোনো অভিযোগ থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।’
চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘চিকিৎসক সুরক্ষা আইন করার জন্য আমরা অনেকবার অনেকভাবে কথা বলেছি। প্রায় সাত বছর ধরে এই আইনটি করার জন্য কাজ করছি, আইনটি সংসদে পাস হলে হয়তো চিকিৎসকদের কর্মস্থল কিছুটা হলেও নিরাপদ হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এই মহাদেশে প্রায় সময়ই চিকিৎসকরা অপমানিত হন। চিকিৎসকদের কর্মস্থল পুরোপুরি নিরাপদ নয়। চিকিৎসকদেরকে লাঞ্চনা করাও এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতা।’
-
১৬ মে, ২০২৬
হার্ট অ্যাটাকের রোগীর মৃত্যুর জের
শরীয়তপুরে রোগীর স্বজনদের সংঘবদ্ধ হামলায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসক
-
২১ এপ্রিল, ২০২৬
দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি
ক্যান্সার হাসপাতালের উপ পরিচালককে কুপিয়ে জখম: ড্যাবের নিন্দা ও প্রতিবাদ
-
১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬