আগস্ট পেরিয়ে সেপ্টেম্বরেও বাড়তে পারে ডেঙ্গু, সবচেয়ে ঝুঁকিতে ঢাকা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি বছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগস্টজুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব সেপ্টেম্বর পর্যন্তও গড়াতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ হাজার ৮৮০ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের।
আক্রান্তের হিসাবে বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা। এ বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছয় হাজার ৮৭১ জন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতেই আক্রান্ত হয়েছেন চার হাজার ৪০৪ জন।
সংক্রমণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৬৪৭ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে তিন হাজার ৮২ জন এবং খুলনা বিভাগে দুই হাজার ২৭২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
মৃত্যুর হিসাবেও শীর্ষে ঢাকা বিভাগ। এ বিভাগে এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জনই ঢাকা শহরের বাসিন্দা। খুলনায় ১২ জন, চট্টগ্রামে সাত জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকায় কেন বেশি ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার অতিরিক্ত জনঘনত্ব, বছরজুড়ে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দুর্বলতার কারণে রাজধানীতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক গণমাধ্যমে বলেন, ঢাকার ঘনবসতি ও পরিবেশগত পরিস্থিতি এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল। বছরের বিভিন্ন সময় বাড়িঘর, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন ঘটছে। ফলে শুধু বর্ষাকেন্দ্রিক উদ্যোগ নিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি মহিলা কলেজে পরীক্ষা তদারকির সময় পানিভর্তি ছোট একটি পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এমন ছোট ছোট প্রজননস্থল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে।
এই বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, বর্তমানে মশা নিয়ন্ত্রণের বড় একটি অংশ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পর পরিচালিত হয়। অর্থাৎ সংক্রমণ বাড়ার পর কার্যক্রম জোরদার করা হয়। অথচ সংক্রমণ কম থাকার সময় থেকেই প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো গেলে বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ জন্য কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকি করা যেতে পারে।
সেপ্টেম্বরেও থাকতে পারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক অধ্যাপকও চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, আগস্ট মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এমনকি সেপ্টেম্বরেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁর ধারণা, আগস্টেই যে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ হবে এমনটি নিশ্চিত নয়। চলতি বছর সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় সেপ্টেম্বরেও দেখা যেতে পারে। তাই আগস্ট ও সেপ্টেম্বরকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর
এই কীটতত্ত্ববিদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে দ্রুত ধ্বংস করা। যেসব স্থানে পানি জমে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে, সেসব স্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
যেসব প্রজননস্থল পুরোপুরি অপসারণ করা সম্ভব নয়, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতার কীটনাশক কিংবা মশার বংশবিস্তার বন্ধে কার্যকর উপাদান ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ওয়ার্ড পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সংক্রমণের মৌসুমে অভিযান চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বছরজুড়ে প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। না হলে আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এনএইচ/