শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় ডা. জাকিরের মহৎ উদ্যোগ
গত ১৪ বছর যাবত নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন। রংপুরে হাইপারটেনশন এন্ড রিসার্চ সেন্টার নামে একটি বেসরকারি ক্লিনিক স্থাপন করে এ সেবা দিয়ে আসছেন তিনি। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ সেবা নিতে আসেন সেন্টারে।
মেডিকেলে পড়া অবস্থায় রংপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে উচ্চরক্তচাপের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিজ হোস্টেলে রেখে সহযোগীতা করতেন ডা. জাকির হোসেন। এসময় রোগীদের নানা রকম ভোগান্তি ও হয়রানি খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তখন থেকে উপলব্ধি করেন নিজ এলাকায় স্বল্প খরচে এসব রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া দরকার। এ লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে এমবিবিএস পাস করার পর সিনিয়র ভাইদের এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে এলাকায় ক্যাম্প শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ফ্রি চিকিৎসা দিয়েছেন। এরপর ২০০৮ সালে রংপুর শহরে একটি হাইপারটেনশন সেন্টার স্থাপন করে মাত্র ৪০ টাকায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেন।
ভোগান্তি কমার পাশাপাশি রোগীদের রাজধানীমুখি স্রোত ঠেকাতে তাঁর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকে। মেডিভয়েসের সঙ্গে আলাপকালে উঠে আসে তাঁর মহতী এসব কাজের অনুপ্রেরণা ও পেছনের গল্প। সাক্ষাতকার নিয়েছেন সাহেদুজ্জামান সাকিব।
অনুপ্রেরণায় শিক্ষক
এমবিবিএস সম্পন্ন করে ১৯৯০ সালে পোস্ট গ্রাজুয়েশনে ভর্তি হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) বিখ্যাত অধ্যাপক ডা. মো. মনিরউদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় হয় ডা. জাকিরের। ডা. মনিরউদ্দিনের নিজ নামে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় একটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে দীর্ঘ ১০ বছর প্রতি শুক্রবার ফ্রী রোগী দেখতেন ডা. জাকির হোসেন। এরপর অধ্যাপক ডা. এস জি এম চৌধুরীর হাইপারটেনশন কর্ণারের বিষয়ে জানতে পারেন এবং সেখানেও কাজ করেন তিনি।
ডা. এস জি এম চৌধুরী অবসরে যাওয়ার পর গ্রীণরোডে ‘প্রফেসর এফজেএম চৌধুরী নিউমডেল হাইপারটেনশন সেন্টার’ নামে একটা হাইপারটেনশন সেন্টার খুলেন যেখানে দীর্ঘদিন অবৈতনিক হিসেবে কাজ করেন ডা. জাকির।
দুই শিক্ষকের সঙ্গে কাজের করার সময় তিনি অনুভব করতে পারেন হাইপারটেনশন নামক ঘাতকব্যাধি কখনোই নির্মূল করা যায় না, এটি প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি। একটা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটাকে প্রতিরোধ করতে হবে। এ রোগ চিহিৃত হলে সাশ্রয়ী ও নামমাত্র মূল্যে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, আমাদের দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন সাধারণ রোগীর পক্ষে এত টাকা ব্যয় করা সম্ভব হবে না। এই চিন্তা থেকেই কাজ শুরু করেন বলে জানান ডা. জাকির।
চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ থেকে রক্ষা পেতে নানা ধরনের পরামর্শও দেওয়া হয় এ সেন্টারে। এখানে চিকিৎসা নিতে তিন মাসের জন্য ৫০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। এরপর প্রতিবার মাত্র ৪০ টাকার বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা নেওয়া যায়। ৪০ টাকায় উচ্চরক্তচাপের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য রোগের চিকিৎসাও নিতে পারেন রোগীরা। প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ জন রোগী এখানে চিকিৎসা নেন। তবে প্রতি শুক্রবার জাকির হোসেন নিজের টিমসহ সেবা দিতে আসেন। এজন্য শুক্রবারে অনেক রোগী আসে, যাদের বেশিরভাগই ফলোআপ রোগী।
তাঁর স্বপ্ন
মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অন্যদের সেবায় ব্রত তিনি। সপ্তাহে ছুটির দিনে কর্মস্থল বগুড়া শহর থেকে চিকিৎসাসেবা দিতে ছুটে যান রংপুরে। একসঙ্গে এতো কাজ করতে কখনোই চাপ অনুভব করেন না এ গুণী চিকিৎসক। বরং এসব কাজ করে তৃপ্তি পান বলে জানান তিনি। হাইপারটেনশন সেন্টারটিকে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান ডা. জাকির। তিন বলেন, যতদিন দেশ থাকবে, ততদিন যেন এই চিকিসাকেন্দ্রটি টিকে থাকে। সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে।
অনুপ্রেরণা দেন শিক্ষার্থীদেরও
চিকিৎসার মতো একটি মহৎ পেশার সঙ্গে জড়িত থেকে খুব সহজেই দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা যায় বলে মনে করেন মানব সেবায় নিয়োজিত এই চিকিৎসক। নিজে মহৎ কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও এসব কাজে অনুপ্রাণীত করেন তিনি। ডা. জাকিরের মতে নিজের আয়ের অন্তত ২০ শতাংশ জনকল্যাণে ব্যয় করা উচিত। তাঁর গ্রামের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র দেখে অনেকেই এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন বলেও জানান তিনি।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
১৯৬১ সালে বগুড়া জেলার ধূনট থানার শিমুলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বগুড়ার শতবর্ষী গোস্বাইবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং রাজধানীর ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে । ১৯৮৫ সালে এমবিবিএস এবং ১৯৯৪ সালে এফসিপিএস সম্পন্ন করেন।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন
বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে ডা. জাকির রংপুর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও পরে অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি বগুড়া ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস) মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি একই মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অবদানের জন্য গত ২৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি ফেলোশীপ-২০২২ অর্জন করেন তিনি।
এএইচ
-
২৯ জুলাই, ২০২৩
টিএমএসএস মেডিকেলের অনুকরণীয় উদ্যোগ
এফসিপিএসে উত্তীর্ণ চিকিৎসকদের উৎসাহ ভাতা প্রদানের ঘোষণা
-
২৪ ডিসেম্বর, ২০২২