ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া
নবজাতক শিশু বিশেষজ্ঞ
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ)
বিসিএস (স্বাস্থ্য),
এমডি, নিওনেটোলজি
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
রেজিস্ট্রার, শিশু বিভাগ
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:৩৬ পিএম
আব্রাহামের দৃঢ়চেতা এভারেস্ট অভিযান নিয়ে গল্প
গ্রিন বুট
আব্রাহাম নামটা কেউ জানতো না প্রথম দিকে। পাহাড়ের কাছে গেলে মানুষ নাম-পরিচয় হারিয়ে ফেলে—শুধু একটা সত্তা হয়ে যায়, যে ওপরে উঠতে চায়, যে ছুঁতে চায় ওই সফেদ হিমালয়ের ভয়ংকর চূঁড়া। কিন্তু যারা তাকে চিনত, তারা জানত এই মানুষটার চোখে গাঢ় একটা ঘোর ছিল, হৃদয়ের গভীর বেদনা থেকে মোহ গ্রস্তের মতো পালিয়ে বেড়াতে সে, ছুটে চলতো পাহাড় থেকে পাহাড়ে।
আব্রাহামের বাড়ি ছিল উত্তর আমেরিকার এক ছোট শহরে, নাম ‘রিভারউড।’ শহরটা খুব বড় না, কিন্তু নিঃশব্দে বয়ে যাওয়া একটা নদী, শরতে লাল-কমলা পাতায় ভরে যাওয়া রাস্তা, আর দূরে নীলচে পাহাড়ের রেখা—সব মিলিয়ে জায়গাটা অদ্ভুত শান্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, এখানে মানুষের জীবনও নিশ্চয়ই শান্ত, সুশৃঙ্খল, সুন্দর। কিন্তু প্রতিটা বাড়ির ভেতরে একটা আলাদা গল্প থাকে। আব্রাহামের বাড়িটাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তার বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার—নিয়মতান্ত্রিক, হিসাবী, বাস্তববাদী। মা ছিলেন এক সময় শিল্পী—পিয়ানো বাজাতেন, ছবি আঁকতেন, খুব আবেগপ্রবণ একজন মানুষ। দুজন মানুষ, দুই ধরনের জগৎ।
শুরুতে সব ঠিকই ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে লাগল। ছোট ছোট মতভেদ, তর্ক, অভিমান—ধীরে ধীরে সেটা এমন এক জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে একই ছাদের নিচে থেকেও তারা আলাদা হয়ে গেল। পশ্চিমা সমাজে এটা নতুন কিছু না। ‘পার্সোনাল স্পেস’, ‘ইন্ডিপেনডেন্স’, ‘নিজের মতো থাকা’—এই কথাগুলো খুব সুন্দর শোনায়, কিন্তু অনেক সময় এগুলোর আড়ালে সম্পর্কগুলো নিঃশব্দে ভেঙে যায়।
আব্রাহাম তখন কিশোর। সে বুঝতে পারত বাড়ির ভেতরে কিছু একটা ঠিক নেই। রাতের খাবারের টেবিলে কথা কমে গেছে। হাসি নেই, শুধু প্রয়োজনীয় বাক্য বিনিময়। একদিন রাতে সে শুনেছিল—তার মা বলছে, ‘আমরা কি আর আগের মতো আছি?’ তার বাবা চুপ করে ছিলেন। এই নীরবতাটাই ছিল সবচেয়ে ভারী উত্তর।
কিছুদিন পর তারা আলাদা হয়ে গেল। আইনগতভাবে ‘ডিভোর্স’ একটা শব্দ, কিন্তু এর ভেতরে কত ভাঙা অনুভূতি লুকিয়ে থাকে, সেটা কাগজে লেখা যায় না।
আব্রাহাম তখন থেকেই নিজের ভেতরে একটা শূন্যতা অনুভব করতে লাগল। এই শূন্যতা থেকেই হয়তো তার পাহাড়ের প্রতি টানটা জন্ম নেয়। প্রথমে সেটা ছিল এক ধরনের পালিয়ে যাওয়া।
বাড়ির অশান্তি থেকে, ভাঙা সম্পর্কের স্মৃতি থেকে, নিজের অস্থিরতা থেকে। সে একা একা কাছের পাহাড়ে যেতে শুরু করল। চুপচাপ বসে থাকত, দূরে তাকিয়ে থাকত। পাহাড় তাকে কোনো প্রশ্ন করত না, কোনো ব্যাখ্যা চাইত না। শুধু নিঃশব্দে তাকে জায়গা দিত। একদিন সে বুঝল পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে তার ভেতরের অস্থিরতা একটু কমে যায়। শ্বাস নিতে সুবিধা হয়, মাথা পরিষ্কার লাগে। সেদিনই হয়তো তার ভেতরে একটা নতুন আসক্তির জন্ম হলো।
ধীরে ধীরে এই ভালো লাগাটা নেশায় পরিণত হলো। সে ট্রেনিং শুরু করল, ক্লাইম্বিং টেকনিক শিখল, বরফে হাঁটা, রোপ ব্যবহার, ক্রেভাস রেসকিউ—সব কিছুতে নিজেকে ডুবিয়ে দিল।
তার জীবন যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল—একটা ‘নিচের পৃথিবী’, আরেকটা ‘পাহাড়ের পৃথিবী।’ নিচের পৃথিবীতে ছিল সম্পর্ক, দায়িত্ব ও সামাজিক নিয়ম। আর পাহাড়ের পৃথিবীতে ছিল শুধু সে আর আকাশ। বন্ধুরা বলত, ‘তুই একটু বেশি সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস না?’ আব্রাহাম হেসে বলত, ‘আমি আসলে ওখানেই সবচেয়ে স্বাভাবিক।’
আব্রাহাম একে একে অনেক পাহাড় জয় করেছে। নেপালের অন্নপূর্ণা, ভারতের স্টোক কাংরি, এমনকি আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো—সব জায়গায় তার পায়ের ছাপ আছে। কিন্তু তার ভেতরের ক্ষুধাটা কখনো মিটেনি। কারণ সে জানত, একটাই চূড়া আছে, যেটা ছুঁতে তার হৃদয়টা কিছুটা তৃপ্ত হবে। সেটার নাম এভারেস্ট।
সময় গড়াল। আব্রাহাম বিয়ে করল, সংসার করল। এনি চমৎকার একটা মেয়ে। খুব দরদ নিয়ে আব্রাহামের জীবনটাকে সে গুছিয়ে দিলো। দু বছর পর জিহান আসলো তাদের ঘর আলো করে। সে চেষ্টা করেছিল একটা স্থির জীবন গড়তে, যেটা তার বাবা-মা পারেনি। কিন্তু পাহাড়ের প্রতি ভেতরের সেই টানটা তার আর কখনো কমেনি। বরং সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর হয়েছে। একটা সময় পাহাড় তার কাছে শুধু শখ ছিল না—এটা ছিল আশ্রয়, পরিচয়, এমনকি এক ধরনের মুক্তি।
স্ত্রী মাঝে মাঝে বলত, ‘তুমি কি আমাদের চেয়ে পাহাড়কে বেশি ভালোবাসো?’ এই প্রশ্নের উত্তর আব্রাহাম কখনো ঠিকভাবে দিতে পারেনি। কারণ সে জানত, এটা তুলনা করার মতো কিছু না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাহাড় তাকে এমন একটা শান্তি দিত, যা সে জীবনের অন্য কোথাও পেত না।
যখন সে এভারেস্টের পরিকল্পনা করল, তখন তার বয়স, অভিজ্ঞতা সব কিছুই পক্ষে ছিল। শুধু শরীরটা একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অসুস্থতা তাকে প্রথমবারের মতো থামতে বলেছিল। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন কোনো নেশায় ডুবে থাকে, তারা জানে নেশা যুক্তি মানে না। পাহাড় তখন তার কাছে শুধু লক্ষ্য না, বরং এটা ছিল নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের শেষ পরীক্ষা। হয়তো তার ভেতরে কোথাও একটা ভয়ও ছিল—যদি সে না যায়, যদি সে চেষ্টা না করে, তাহলে সে কি সত্যিই নিজের জীবনটা নিয়ে পূর্ণভাবে বাঁচল?
এভারেস্টের যাত্রার আগে সে একবার মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। মা তখন একা থাকেন, ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্টে। ত্বকে বয়সের ছাপ পড়েছে, কিন্তু চোখে এখনো সেই পুরনো কোমলতা আছে। মা বলেছিলেন, ‘সব কিছু কি জেতার জন্য করতে হয়, আব্রাহাম?’ সে একটু হেসে বলেছিল, ‘না মা, কিছু কিছু জিনিস মনের জন্য করতে হয়।’
মা আর কিছু বলেননি। শুধু তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন একটু বেশি সময় ধরে।
তার স্ত্রী একদিন বলেছিল, ‘সব পাহাড়েই কি তোমাকে উঠতে হবে? এই একটাতে না উঠলে কি হবে? এটাতো পরীক্ষার কোনো সিলেবাস, যেটা তোমাকে শেষ করতেই হবে?’ আব্রাহাম হেসে বলেছিল, ‘সব নদী শেষমেশ সমুদ্রে মেশে। আমার গন্তব্যও একদিন এভারেস্ট এ গিয়ে শেষ হবে। এরপর আর পাহাড়ে চড়া নিয়ে বাড়াবাড়ি করবো না কথা দিচ্ছি!’
কিন্তু সেই সময়টাতেই আব্রাহাম একটু অসুস্থ হয়ে পড়ল। শরীরটা আগের মতো সাড়া দিচ্ছিল না। হালকা কাশি, মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট; এটা অবশ্য পাহাড়ের প্রতিকূল পরিবেশে নিয়মিত যাতায়াতের ফলাফল। ডাক্তাররা একটা দীর্ঘ বিশ্রাম নিতে বলেছিল। অন্তত এক বছর। বন্ধুরা বলেছিল, ‘এভারেস্ট অপেক্ষা করবে। তুই তারাহুড়ো করিস না।’ কিন্তু আব্রাহাম অপেক্ষা করতে রাজি হলো না। সে ভাবছিল একবার থেমে গেলে হয়তো আর কখনই সে শুরু করতে পারবে না।
এভারেস্টের প্রতি তার ভেতরের ডাকটা তখন এত জোরে বাজছিল যে, কোনো যুক্তি, কোনো ভয়—কিছুই তাকে থামাতে পারল না। যাত্রার দিন সে ছেলে জিহানকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘আমি যদি ফিরতে দেরি করি, ভয় পাস না। আমি ঠিক আছি—এই বিশ্বাসটা রাখিস।’ ছেলেটা কিছু বুঝতে পারেনি। শুধু বাবার জ্যাকেটটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল।
এভারেস্টের পথে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল এক ধরনের অদ্ভুত আশ্বাস নিয়ে—যেন সবকিছু হিসাব মতোই চলবে। বেস ক্যাম্পে প্রথম কয়েকদিন আব্রাহাম নিজেকে প্রস্তুত করছিল, শুধু শরীর না—মনকেও। চারপাশে রঙিন টেন্ট, বরফের ওপর হেঁটে বেড়ানো মানুষ, দূরে আইসফলের গর্জন—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত জীবন্ত মৃত্যুপুরী। এখানে সবাই হাসে, কথা বলে, প্ল্যান করে—কিন্তু সবাই জানে, এই হাসির আড়ালে একটা অনিশ্চয়তা লুকিয়ে আছে।
রাতে টেন্টের ভেতরে শুয়ে সে মাঝে মাঝে বরফ ভাঙার শব্দ শুনত। সেই শব্দটা কেমন যেন—নীরবতার মধ্যে হঠাৎ ভেঙে পড়া কোনো অজানা ভয়। তবুও তার ভেতরে তখনো দৃঢ়তা ছিল। সে জানত এই পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব না। ক্যাম্প ১-এর দিকে ওঠার সময় প্রথমবারের মতো সে বুঝতে পারল এটা কোনো সাধারণ পাহাড় না। খুম্বু আইসফল পার হওয়ার সময় প্রতিটা পদক্ষেপ ছিল হিসেব করে রাখা। নিচে অজানা গভীরতা, চারপাশে বিশাল বরফের স্তম্ভ—যেগুলো যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
অ্যালুমিনিয়ামের মই পেরিয়ে যখন সে একেকটা ক্রেভাস অতিক্রম করছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে, শুধু কয়েকটা ধাতব দণ্ডের ওপর ভর করে। কিন্তু এই ভয়ও তাকে থামাতে পারেনি। বরং অদ্ভুতভাবে সে আরও মনোযোগী হয়ে উঠছিল। যেন বিপদই তাকে জীবিত থাকার অনুভূতিটা আরও তীব্র করে দিচ্ছে।
ক্যাম্প ২—এখানে এসে সবকিছু একটু স্থির হলো। চারপাশে বিশাল বরফের দেয়াল, লোৎসে ফেস দূরে উঠে গেছে আকাশ ছুঁয়ে। এখানকার বাতাস পাতলা, কিন্তু এখনো সহনীয়।
আব্রাহাম মাঝে মাঝে বসে দূরে তাকিয়ে থাকত। তার চোখে তখন একটা অদ্ভুত প্রশান্তি দেখা যেত—যেন সে নিজের জায়গায় পৌঁছাচ্ছে ধীরে ধীরে। তবুও শরীর তখন সংকেত দিতে শুরু করেছে। কাশিটা বাড়ছিল। শুকনো, গভীর কাশি—যেন বুকের ভেতর থেকে কিছু ছিঁড়ে বের হয়ে আসতে চাইছে। রাতে শুতে গেলে শ্বাস নিতে একটু বেশি কষ্ট হতো। মাঝে মাঝে সে ঘুম ভেঙে উঠে বসে থাকত শুধু শ্বাস ঠিক করার জন্য। কেউ কেউ সেটা লক্ষ্য করেছিল। কিন্তু সে সবসময় বলত, ‘আমি ঠিক আছি।’ এই ‘ঠিক আছি’ কথাটা অনেক সময় সবচেয়ে বড় অস্বীকার।
ক্যাম্প ৩-এর দিকে ওঠাটা ছিল আরও কঠিন। লোৎসে ফেস বেয়ে উঠতে উঠতে তার পা ভারী হয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটা পদক্ষেপ যেন আগেরটার চেয়ে বেশি শক্তি দাবি করছিল। অক্সিজেন কমে আসছে, এটা এখন আর অনুভব না করে উপায় নেই। মাথাটা একটু ঝিমঝিম করছিল। মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল। কখনো কখনো মনে হচ্ছিল, সে ঠিকভাবে চিন্তা করতে পারছে না। তবুও তার চোখে সেই লক্ষ্যটা স্পষ্ট ছিল। হিমালয়ের চূড়া—একটা সরু রেখা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়।
ক্যাম্প ৪—ডেথ জোনের প্রান্তে এসে যেন পৃথিবীটাই বদলে গেল। এখানে বাতাস শুধু পাতলা না—প্রায় অনুপস্থিত। প্রতিটা শ্বাস নিতে হলে যেন লড়াই করতে হয়। শরীর আর নিজের মতো কাজ করে না মনে হয়, যেন সবকিছু ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আব্রাহাম টেন্টের ভেতরে বসে ছিল। অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে শ্বাস নিচ্ছিল, কিন্তু তবুও মনে হচ্ছিল যথেষ্ট না। তার মাথা ভারী হয়ে গেছে। কাশিটা এখন আরও গভীর, মাঝে মাঝে কাশি দিলে বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা হচ্ছিল। হাত-পা ঠাণ্ডায় অবশ হয়ে আসছে।
দলের লিডার তার পাশে এসে বসেছিল। ‘শুনো’, সে বলল, খুব শান্তভাবে, ‘এখান থেকে সবাই সামিটে যায় না। অনেকেই এখান থেকে ফিরে যায়—এটাই বুদ্ধিমানের কাজ।’ আব্রাহাম কিছুক্ষণ কিছু বলল না। তার চোখ তখন টেন্টের ছোট জানালার দিকে, সেখানে দেখা যাচ্ছে দূরের অন্ধকার আকাশ আর তার নিচে এক সরু সাদা রেখা—চূড়া।
লিডার আবার বলল, ‘তোমার শরীর ঠিক সাড়া দিচ্ছে না। তুমি চাইলে এখনই নামতে পারো। এখনো সময় আছে।’ এই ‘এখনো সময় আছে’—কথাটা যেন তার ভেতরে কোথাও আঘাত করল। কারণ সে জানত, এই ‘সময়‘ শুধু এই মুহূর্তের না। এটা তার পুরো জীবনের জন্য।
সে কি আবার ফিরে যাবে? আবার সেই নিচের পৃথিবীতে—যেখানে অপূর্ণতা, শূন্যতা, অসমাপ্ত প্রশ্ন? নাকি সে এগিয়ে যাবে, যেখানে হয়তো উত্তর আছে, অথবা… কিছুই নেই?
আব্রাহাম ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে তখন ক্লান্তি ছিল, ব্যথা ছিল। কিন্তু সেই পুরনো আগুনটাও ছিল, নিভে যায়নি এখনো। সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। কেউ তাকে তাড়া দেয়নি। এই সিদ্ধান্ত কেউ কারো জন্য নেয় না। অবশেষে সে আস্তে করে বললো, ‘আমি এতদূর এসেছি ফিরে যাওয়ার জন্য নয় …’ … শেষটা দেখতে।’ তার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু দৃঢ়তাও ছিল। এই কথাটা বলার পর সে আবার চুপ হয়ে গেল। কিন্তু এই নীরবতার মধ্যেই তার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে জানত, এই পথের শেষ কোথায় হতে পারে। তবুও সে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল।
সামিট পুশের রাতে বাতাস ছিল নির্মম। ঠান্ডা যেন শরীর ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে তার কষ্ট হচ্ছিল। শ্বাস নিতে গেলে মনে হচ্ছিল ফুসফুস আগুনে পুড়ছে। এক সময় আব্রাহাম থেমে গেল। দলের অন্যরা এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আব্রাহাম আর পারছিল না। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বুকটা যেন ছিড়ে যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকাল। সেই আকাশ যেটা ছোটবেলায় তাকে ডাকত। তার মনে পড়ল ছেলের মুখ, স্ত্রীর কথা, তার প্রথম পাহাড়ে ওঠার দিনটা। সবকিছু একসাথে এসে ভিড় করল। তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটল। হাত পা ছড়িয়ে আব্রাহাম সাদা বরফকে বিছানা বানিয়ে শুয়ে রইলো। সে খুব আস্তে বলল, ‘আমি চলে এসেছি … তুমি ডাকছিলে, আমি শুনেছি।’ তারপর আর কোনো শব্দ হয়নি।
পরদিন সকালে যারা সেই পথ দিয়ে উঠছিল, তারা আব্রাহামকে দেখলো। বরফের মধ্যে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে লোকটা—চোখ বন্ধ, মুখে শান্তির ছাপ। যেন একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। কমলা রঙের জ্যাকেট, নেভি ব্লু ট্রাউজার আর সবুজ রঙের বুট জুতা পায়ে। কেউ তাকে নিচে নামাতে পারেনি। এই উচ্চতায়, এই অবস্থায়—তা প্রায় অসম্ভব। তার পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছিল। কেউ আশা করেছিল—ওরা হয়তো দেহটা ফেরত নিতে চাইবে। কিন্তু তার স্ত্রী শুধু একটাই কথা বলেছিল, ‘ও যেখানে সবচেয়ে বেশি থাকতে চাইত, ওখানেই থাকুক।’
আজ বহু বছর পেরিয়ে গেছে। এভারেস্টে যারা ওঠে, তারা একটা জায়গায় এসে থামে। আব্রাহামের নাম ছাপিয়ে তার নাম হয়ে গেছে গ্রিন বুট। হিমালয় পর্বতারোহীদের কাছে সে একটা ল্যান্ডমার্ক। কেউ কেউ চুপ করে একটা মুহূর্ত দাঁড়ায়। আব্রাহামকে দেখে ওদের শিড়দাঁড়া দিয়ে হয়তো একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়। আব্রাহামের মতো আরো শত শত মৃত পর্বতারোহী রয়ে গেছে পাহাড়ের বরফের ভাঁজে ভাঁজে যুগ যুগ ধরে। এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একটু অসতর্ক হলেই হয়তো মৃত্যু। থাকতে হবে খুব সাবধান। কেউ কেউ বিড় বিড় করে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করে। কেউ আবার এক পলক তাকিয়েই ঠিক করে নেয় তার যাত্রার গতিপথ। আট হাজার মিটারের ও বেশি ওপরে কারো জন্য দীর্ঘ সময় বরাদ্দ করে শোক প্রকাশ কিছুটা বিলাসিতা।
গাইডরা বলে, ‘এই জায়গাটা পেরোলেই সামিট আর বেশি দূরে না।’ নতুন ক্লাইম্বাররা জিজ্ঞেস করে, ‘ওটা কে?’ কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলে না। শুধু বলে, ‘একজন … যে খুব ভালোবাসত পাহাড়কে। সে সেই জায়গাতেই পৌঁছেছে, যেখানে যাওয়ার জন্য সে সারা জীবন প্রস্তুতি নিয়েছিল।
এমইউ/