২৮ জানুয়ারী, ২০২৫ ০৮:৪০ পিএম

বিল ছাড়াই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা দেন ডা. সাদী

বিল ছাড়াই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা দেন ডা. সাদী
ডা. সাদী বিন শামস। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: কোনো ধরনের বিল না নিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছিলেন চিকিৎসায় অবহেলার মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করা ডেল্টা হেলথকেয়ার হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদী বিন শামস। আহতদের ওষুধ ও প্রয়োনীয় সরঞ্জামও বিনামূল্যে বহন করেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আজ মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে ইউনাইটেড মেডিকেল অর্গানাইজেশনস অব বাংলাদেশ (ইউমব) আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে এ তথ্য জানান ডা. সাদী।

জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন অগ্নিগর্ভে রূপ নেওয়ার পর ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় শহীদ হন রিকশাচালক ইসমাইল। তাঁর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে সাত দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্ত হয়েছেন ডা. সাদী। একই সাথে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিল হাসপাতালে কর্মরত আরও চারজনকে। বাকিরা হলেন মার্কেটিং অফিসার হাসান মিয়া, মেইনটেন্যান্স অফিস বোরহান উদ্দিন এবং নিরাপত্তা প্রহরী নাজিম উদ্দিন ও ইসমাইল হোসেন।

কারামুক্ত ডা. সাদী প্রেস কনফারেন্সে জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একটি ভুয়া পোস্ট ভাইরাল হওয়ার কারণে আমাদের পাঁচজনকে সাতদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।’

ডা. সাদী বলেন, ‘১৮ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত ডেল্টা হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে কর্মরত ছিলাম। প্রথম দিন সকাল ৯-১০টার পর পিলেটস ইঞ্জুরি (বিভিন্ন ধরনের আঘাত) এবং রাত ৯টার পর থেকে গানশট ইঞ্জুরির (গুলিবিদ্ধ) রোগী পাওয়া শুরু করি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, রোগী যে-ই আসুক, প্রত্যেক রোগীকে সেবা দিতে হবে। আমার চার কর্মদিবসে চিকিৎসা না পেয়ে কোনো রোগী আমাদের হাসপাতাল থেকে যায়নি।

তিনি বলেন, ‘এই রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসক হিসেবে আমি যখন রোগীকে সেবা দেই, স্বাভাবিকভাবেই আমি বিলের নির্দিষ্ট একটি অংশ পাই, কিন্তু ওই সময়ে আমি সেই বিলটি নেইনি।’

রিকশাচালক ইসমাইলের শাহাদাতের ঘটনা বর্ণনা করে ডা. সাদী বলেন, ‘১৯ তারিখে আসরের নামাজ পড়ে আনুমানিক বিকেল সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার দিকে হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম। হাসপাতালের সিঁড়ি এবং প্রধান ফটক খুব কাছাকাছি। নামার সময় আমি গুলির শব্দ এবং শোরগোল শুনতে পাই। সবাই ‘ডাক্তার ডাক্তার’ বলে ডাকতে থাকে। এ সময় আমি মেইন গেইটের দিকে দৌঁড়ে যাই। দেখতে পাই একজন পথচারী মৃত অবস্থায় আছে। গুলিতে তাঁর কপাল থেকে মাথার পিছন পর্যন্ত খুলিটি উড়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় আমি যখন তার সামনে দাঁড়িয়ে, তখন আমার দিকে দুটি বুলেট ফায়ার করা হয়। বুলেটের শব্দ এবং ফায়ারিংয়ের কারণে আমরা যারা শহীদ ইসমাইল ভাইকে দেখার জন্য গিয়েছিলাম এবং ট্রিটমেন্ট দিতে গিয়েছিলাম, আমরা ভিতরে চলে আসতে বাধ্য হই।’

এ সময় তাঁদের হুমকি দেওয়া হয় বলেও উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক। বলেন, ‘আমরা ভিতরে চলে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশের একটি দল এসে আমাদের সিকিউরিটি গার্ডদের অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে হাসপাতালের গেইট বন্ধ করতে বলে। তাদেরকে গুলি করারও হুমকি দেয়। এর ফলে আমরা কেউই মৃতদেহের সামনে যেতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু এ সময়ের একটি ছবি ঘটনার ছয়-সাত মাস পর সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়। ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়, গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিটি হামাগুড়ি দিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। আসলে এই দাবিটি পুরোপুরি মিথ্যা। তাঁর যেভাবে গানশট ইঞ্জুরি ছিল, তাতে তিনি ঘটনার সময়েই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ওখানে আমি উপস্থিত ছিলাম, হামাগুড়ি দেওয়ার মতো কোনো অবস্থা তাঁর ছিল না। গুলি করার সাথে সাথে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আমরা চিকিৎসায় অবহেলা করেছি। গানশুট ইঞ্জুরির ফলে যেখানে সাথে সাথেই তিনি মারা গেছেন, সেখানে চিকিৎসায় অবহেলার কোনো সুযোগই নেই।’

গ্রেপ্তার হয়রানির প্রসঙ্গে ডা. সাদী বলেন, ‘যেদিন আমাকে অ্যারেস্ট করা হয়, প্রসিকিউশনে যিনি ছিলেন, তানভীর হাসান জোহা এক মিনিটের জন্যও আমার সাথে ঠিকঠাকভাবে কথা বলেননি। তিনি শুধু বলেন, আমাদেরকে কো-অপারেট করেন, থানাতে চলেন। থানায় যখন যাই, চল্লিশ মিনিট বসিয়ে রাখা হয়। এরপর বলা হয়, আপনাদের মোবাইল-ওয়ালেটসহ যা কিছু আছে তা পুলিশের কাছে জমা দেন। পরে আমাদেরকে লকআপ করা হয়। আমাদের থেকে ব্যাখ্যা শোনা বা কী হয়েছে তা জানা, এই ইচ্ছার ঘাটতি আমরা তাদের মধ্যে লক্ষ্য করেছি।’

ডা. সাদী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের তো বিচার প্রক্রিয়ার অনেক দীর্ঘসূত্রতা আছে, আপনারা যে আন্দোলনটা করেছেন, এটা যদি না করা হতো, আমাদের হয়তো চার থেকে পাঁচ মাস জেলে থাকা লাগতো।’

তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যারা হত্যা করেছে, তাদেরকে আপনি খুঁজছেন না, উল্টো নতুন একটি অ্যাঙ্গেল ক্রিয়েট করে চিকিৎসকদের জড়িয়ে তাদেরকে ছোট করা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চিকিৎসকরা একটি প্রধান শক্তি ছিলেন। তারা যদি মানুষকে সেবা না দিতেন, তাহলে অনেকেই এ ভয়ে রাস্তায় নামতেন না।’

এ সময় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং শহীদ ইসমাইল হোসেনের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি করেন তিনি। প্রেস কনফারেন্স থেকে চিকিৎসার অবহেলার অভিযোগ খতিয়ে না দেখে চিকিৎসকদের গ্রেপ্তার বন্ধ করার আহ্বানও জানান কারামুক্ত এই চিকিৎসক। একই সাথে তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয়া সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ডা. সাদী।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় ডেল্টা হেলথকেয়ার হাসপাতালে কর্তব্য পালনকালে শহীদ রিকশাচালক ইসমাইলের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে ১৭ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় ডা. সাদীকে। একই সাথে গ্রেপ্তার হন ডেল্টা হাসপাতালের পাঁচজন। তাদের কারাগারে প্রেরণ করা হলে আন্দোলনে নামেন চিকিৎসকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জানুয়ারি তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। পরদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন তাঁরা।

এনএআর/

  ঘটনা প্রবাহ : ডা. সাদী বিন শামস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক