দিনাজপুর মেডিকেলে নির্যাতনকারীদের স্থায়ী বহিষ্কার দাবি, তদন্তে কমিটি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: শিক্ষার্থী নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজের (প্রস্তাবিত নাম দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ) সাবেক ও বর্তমানদের বহিষ্কার ও অবাঞ্চিত ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে নির্যাতনের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীরা। এর প্রেক্ষিতে মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহাব আহমেদকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, মেডিকেল কলেজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের মারধর ও নির্যাতন করেছে ছাত্রলীগ, কায়েম করেছে ত্রাসের রাজত্ব। নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও কেউ কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনি। নির্যাতিতদের ছাত্রত্ব বাতিলসহ দেওয়া হতো বিভিন্ন ভয়-ভীতি। ছাত্রলীগের এসব কাজে সহযোগিতা করেছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষক, যারা আওয়ামী ঘরনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এরমধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। মেডিকেলের এক নোটিশে বলা হয়, দিনাজপুর মেডিকেল সকল শিক্ষক এবং সকল বর্ষের শিক্ষার্থীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, হত্যাচেষ্টা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড এবং শিক্ষার্থী নির্যাতনের জড়িত থাকার অপরাধে নিম্নোক্ত শিক্ষার্থীদেরকে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ও স্থায়ী শাস্তির আদেশ না আসা পর্যন্ত সাময়িকভাবে ক্যাম্পাস ও হোস্টেল থেকে বহিস্কার ও অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হলো। তাঁদের ক্যাম্পাসে ও হোস্টেলে অবাধ বিচরণ সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ করা হলো। সেইসঙ্গে ২৯ আগস্ট একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গঠিত তদন্ত কমিটির সম্মুখে প্রয়োজনে উপস্থিত হওয়ার জন্য বলা হলো।
বহিষ্কার ও অবাঞ্চিত হওয়ার তালিকায় রয়েছেন- দিনাজপুর মেডিকেলের ২৫তম ব্যাচের নিঝুম, পিয়াস, ২৬তম ব্যাচের রাকিব, ২৭তম ব্যাচের জাকির, আশিকুল, জয়, নয়ন, সাইমন, শিবলী, সালমান, ২৮তম ব্যাচের ফারহান, ইয়াকুব, সানাউল্লাহ, অপূর্ব, প্রিতম, জোবায়ের, শরীফ, তানভির, অনিক, দিদার, সাঈদ আরাফাত, ২৯তম ব্যাচের সাদমান সাকিব, তুর্য্য, রেদওয়ান সাকিব, বাপ্পা, সিদ্দিক, অনিক, আসাদ, জয় সাহা, রিফাত, ইনাম, আরাফাত, আমীর, ৩০তম ব্যাচের হৃদয় চন্দ্র শীল, দিহান, নাজমুল, নিবিড়, ফজলে রাব্বি ও জীবন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নানা শিক্ষার্থী নির্যাতনকারীদের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা আড়ালে থেকে এখনও অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, নিরপরাধীদের হয়রানি করার পায়তাঁরা চলছে। নানা সময়ে যারা শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করতেন, তাদের সবার নাম এখনও আসেনি।
শিক্ষার্থীরা আরও বলছেন, অপরাধীদের বিচার করা হোক। সেইসঙ্গে যারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তাদেরও তালিকা করা হোক। নিরপরাধ কোনো শিক্ষার্থীকে যেন হয়রানি না করা হয়।
তাঁরা আরও বলছেন, অপরাধের মূল হোতাদের অনেকেই অপকর্মে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও কলেজ কর্তৃপক্ষের তালিকায় নেই। তারা হলেন—দিনাজপুর মেডিকেলের ১৭তম ব্যাচের পিয়াল ও সাদিক, ১৯তম ব্যাচের ইব্রাহিম খলিল, ২৪তম ব্যাচের নাহিদ, সম্রাট, ২৫তম ব্যাচের আরমান, ২৬তম ব্যাচের নাসিম, ২৭তম ব্যাচের মিল্টন। মেডিকেলে ছাত্রলীগের নেত্রীরাও ছিলেন বেপরোয়া, তালিকাই তাদেরও নাম নেই। তারা হলেন—২৭তম ব্যাচের সুবাহ রাইহানা তাবাসসুম রুহি, সাবাহ তাসনিম সৌরি, নিপা, তাসরিন, মোহনা, শৈলি, ২৮তম ব্যাচের হুমায়রা আতিয়া বুশরাসহ আরও কয়েকজন। ছাত্রলীগের এ নেত্রীরা নারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানি করতেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
নির্যাতনের নমুনা
জানতে চাইলে ২০২২ সালে নির্যাতনের শিকার হওয়া ২৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. শামীমুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন সময়ে আমাকে টানা ১০ ঘণ্টা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ। নির্যাতন করে আমার কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়েছে। পুরো শরীরে ক্ষত করেছে, রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিল। আমার হিপে ৩ মাস ব্যথা ছিল, ১ বছর কানে ফড়ফড় শব্দ হতো। গাড়ির হর্ন বা জোরে শব্দ শুনলেই কানের ভেতর ফড়ফড় করে উঠতো আর যন্ত্রনা হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্যাতনের এক পর্যায়ে কয়েকজন আমার ফোন চেক করে। ফোনের কল লিস্টে অ্যাপসগুলাতে লগইনের ভেরিফিকেশন জন্য বিভিন্ন নাম্বার ছিল, যেগুলো নম্বর থেকে কল এসে ওটিপি বলে। তারা সেগুলো ট্রু কলারে দেখতেছিল আর বলতেছিল যে, এগুলো তো ইউরোপের দেশ থেকে কল এসেছে। তার মানে এই ছেলের সাথে জঙ্গী গোষ্ঠীর সম্পর্ক আছে, এখানে (মেডিকেল ছাত্রলীগের কাছে) ধরা পরেছে জেনে নিশ্চয় আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠীর লোকজন ফোন দিচ্ছে। এটি হয়তো ঠাট্টা মনে করবেন অনেকে। কিন্তু তারা বলেছে যে, আফগানিস্তানের তালেবানরা নাকি আমাকে টাকা পাঠায়। তাদের এজেন্ট আমি। এসব বলে আরেক দফা গণপিটুনি দিয়েছে। এটি করেছে হয়তো আমার দাঁড়ি, টুপি দেখে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে নানাভাবে ভয় দেখানো হয়েছে নির্যাতনের কথা কাউকে না জানানোর জন্য, এরপর আমি বলারও সাহস করিনি। সেদিন আমার কাছ থেকে ভিডিও রেকর্ড করে স্বীকারোক্তি নিয়েছে ছাত্রলীগ। অভিযুক্তদের আমি যথাযথ বিচার চাই।’
এছাড়া একাধিক ঘটনা জানিয়েছেন দিনাজপুর মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বলছেন, গত ১৬ এপ্রিল দিনাজপুর মেডিকেলের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হন ছাত্রলীগের হাতে। সেখানে নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি নয়ন ও সাধারণ সম্পাদক জাকির। আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ও ছাত্রলীগের ভয়ে বিচার চাওয়ারও সাহস করতে পারেনি এই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে মেডিকেলের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. এএফএম নুরুল্লাহ’র কাছে ফোনে একাধিকবার যোগোযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
-
০৮ এপ্রিল, ২০২৬
নিরাপদ কর্মস্থলের দাবিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি
দিনাজপুর মেডিকেলে চিকিৎসক ও নার্সের উপর হামলার অভিযোগ
-
৩১ অক্টোবর, ২০২৪
-
১২ জুলাই, ২০২৪
-
২৪ জুন, ২০২৪
-
১৯ মে, ২০২৪