অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: বিশ্বে ১৩ লাখ ও দেশে প্রতি লাখে প্রাণহানি এক-দুইশ’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিশ্বে ২০১৯ সালে ব্যাকটেরিয়াজনিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অভিন্ন কারণে বাংলাদেশে প্রাণ হারিয়েছেন প্রতি লাখে ১০০-২০০ মানুষ। চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গবেষণায় বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে কয়েকটি ব্যাকটেরিয়াকে ভবিষ্যতের আশঙ্কা কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশে হাসপাতালজনিত সংক্রমণের হার আশঙ্কাজজনক হারে বেড়ে চলেছে।
জীবানুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের সংবেদনশীলতার রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে আজ সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মিল্টন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা জানানো হয়।
এ সময় নিজেদের দেড় বছরের (জানুয়ারি ২০২২-জুন ২০২৩) গবেষণা তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে দেশের প্রধান সংক্রমণ ঘটানো জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় ৯০ ভাগ অকার্যকর হয়ে গেছে। রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৭২ হাজার ৬৭০টি নমুনা পরীক্ষা করে এমনটি নিশ্চিত হয়েছে বিএসএমএমইউ।
এসব তথ্য তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, দেশে অন্তত ৭৫ ভাগ ইনফেকশন হয় টাইফয়েড, ই-কোলাই, স্ট্যাফাউরিয়াস, ক্লিবশিয়েলা ও সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে। এসব ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাকসেস ও ওয়াচ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক অকেজো হয়ে গেছে প্রায় ৯০ শতাংশ, এ ছাড়া নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) রোগীদের যে অ্যান্টিবায়োটিকে চিকিৎসা চলতো তা এখন ওয়ার্ডের রোগীদেরও দিতে হচ্ছে। এতেই বোঝা যায় পরিস্থিতি কত খারাপের দিকে যাচ্ছে।
গবেষণা প্রবন্ধের তথ্য তুলে ধরে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০১৯ সালে ব্যাকটেরিয়াজনিত এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্সে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে কয়েকটি ব্যাকটেরিয়াকে ভবিষ্যতের আশঙ্কা কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে। এগুলো হল—MDR TB, Quinolone এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী টাইফয়েট, ESBL producing E.coli এবং Klebsiella সংক্রমণ এবং Carbapenam প্রতিরোধী Enterococci সংক্রমণ। এ ছাড়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিউমোনায়া জনিত অসুখ, সেপসিস এবং এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী প্রস্রাব সংক্রমণে সঠিক এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা পালন করা উচিত। এ ছাড়াও হাসপাতালজনিত সংক্রমণের হার বাংলাদেশে আশঙ্কাজজনক হারে বেড়ে চলেছে।
অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রসঙ্গে ডা. মো. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, ‘কিছু অ্যান্টিবায়োটিক আছে যেগুলোকে একেবারে শেষ ধাপ হিসেবে রিজার্ভ করে রাখা হয়েছে। সে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একান্ত বিপদে না পড়লে এই রিজার্ভ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকগুলো একেবারেই ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখছি, অহরহ এসব রিজার্ভ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। যেগুলো সাধারণত সর্বোচ্চ মুমূর্ষু অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়া উচিত, সেগুলো এখন হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ডেই আমরা ব্যবহার করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, রিজার্ভ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো এখনই ব্যবহার করা হলে পরে আর যাওয়ার কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না। তখন অনেক বড় বিপদে পড়তে হবে। এটা চলতে থাকলে এক পর্যায়ে সর্দি-জ্বরেও অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না।সামান্য অসুখ-বিসুখেই প্রাণ হারাতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসএমএমইউ ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএসএমএমইউ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কঠিন রোগে মানুষকে সেবা দিতে এবং দেশে সকল মানুষের চিকিৎসা দিতে। তাই ভবিষ্যতে চিকিৎসাখাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং আরও নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া চিকিৎসকরা যেন রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক না দেন। যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে জীবাণুগুলো রেজিস্ট্যান্ট বা রোগ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সের কারণে দেশে প্রতিবছর এক লাখ ৭০ হাজার লোক মারা যায়। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ২০৫০ সালে গিয়ে দেখা যাবে করোনা থেকেও বেশি রোগী এ কারণে মারা যাবে।
অনুষ্ঠানে মাইক্রো বায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাঈদা আনোয়ার একটি গবেষণা পত্র তুলে ধরেন।
এ ছাড়া মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগে ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত রোগীর নমুনায় সব ধরনের জীবাণুর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সংবেদনশীলতার রিপোর্ট প্রকাশ করেন বেসিক সায়েন্স ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. আহমেদ আবু সালেহ।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্ট মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের সক্ষমতা ও কার্যক্রম তুলে ধরেন বিএসএমএমইউর মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. চন্দন কুমার রায়। তিনি রোগীর নমুনায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, মাইক্রোব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের উপস্থিতি নির্ণয় ও শনাক্তকরণের বিভিন্ন ধরনের ল্যাবরেটরি পদ্ধতির বর্ণনা প্রদান করেন। একই সঙ্গে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিতে পরিচালিত সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় জীবানু শনাক্তকরণ ও জীবানুর অ্যান্টিমাইক্রোরিয়াল রেজিস্ট্যান্ট নির্ণয়ের পদ্ধতিসমূহ তুলে ধরেন।
স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন ও বিরল প্রজাতির জীবানু শনাক্তকরণ ও তাদের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ধরন নির্ণয়ে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরির বিশেষ অবদান তুলে ধরেন। তিনি তার বক্তব্যে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিতে মলিকুলার টেকনিকসমূহ ব্যবহারের মাধ্যমে যক্ষ্মার জীবানু মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস, নন-টিউবারকুলার মাইকোব্যাকটেরিয়াম শনাক্তকরণসহ উল্লিখিত জীবানুসমূহের Drug Resistance Pattern নির্ণয়ের পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা করেন।
এএনএম/এসএস