ডা. নুরুল হুদা নাঈম

ডা. নুরুল হুদা নাঈম

নাক-কান-গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিশেষজ্ঞ সার্জন ও  পরিচালক
কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রম
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতাল।
 


০৩ মার্চ, ২০২২ ১২:৩৩ পিএম

বিশ্বে প্রতি চারজনে একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে

বিশ্বে প্রতি চারজনে একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে
২০১৬ সালে ‘World Hearing Day’ অর্থাৎ ‘বিশ্ব শ্রবণ দিবস’ নামকরণ করা হয়। ফাইল ছবি

বিশ্ব শ্রবণ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‌‘শুনতে চাইলে আজীবন, শোনায় চাই সযত্ন’। অর্থাৎ আমরা যদি শোনার ক্ষেত্রে সচেতন হই, তাহলে শব্দদূষণের কারণে শোনার সমস্যা প্রতিরোধে সক্ষম হতে পারবো। সুতরাং উচ্চশব্দ পরিহারের মাধ্যমে আমরা শোনাটাকে নিরাপদ করতে পারি। আমাদের শোনার অঙ্গ হচ্ছে কান। এর তিনটি ভাগ বহিঃকর্ণ, মধ্যকর্ণ ও অন্তঃকর্ণ। 

বহিঃকর্ণ ও মধ্যকর্ণ বাতাসের শব্দ তরঙ্গকে অন্তঃকর্ণের তরলে পৌঁছায় ঠিক পুকুরে বা বদ্ধ জলাশয়ে ঢিল মারার মতো। আর অন্তঃকর্ণের কক্লিয়াতে থাকে অতি সংবেনশীল হেয়ার সেল, যা তরলের ঢেউয়ে আন্দলিত হয় এবং শব্দ তরঙ্গকে ইলেকট্রিক্যাল ইমপালসে রূপান্তর করে এবং আমরা শুনতে পাই।

ঝড় এলে যেমন উঁচু গাছপালা ভেঙে পড়ে, ঠিক তেমনি উচ্চশব্দে অন্তঃকর্ণের পানিতে শক্তিশালী ঢেউয়ের তৈরি করে এবং হেয়ার সেলগুলো ধ্বংস করে দেয় ফলশ্রুতিতে দেখা দেয় শ্রবণ সমস্যা।

শ্রবণেন্দ্রীয়ের যত্ন বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ২০০৭ সালের এই দিনে প্রথমবারের মতো পালিত হয় 'ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার কেয়ার ডে'। কানের বহিরাংশ বা বহিকর্ণ দেখতে ইংরেজি সংখ্যা ৩ বা থ্রির মতো। তাই ইংরেজি বছরের তৃতীয় মাসের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ৩ মার্চকে বিশ্ব কানের যত্ন দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এরপর ২০১৬ সালে এ দিবসের নামকরণ করা হয় ‘World Hearing Day’ অর্থাৎ ‘বিশ্ব শ্রবণ দিবস’। সে সময়ে শব্দদূষণকে শ্রবণ হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের জন্য প্রচারণা চালানো হতো দিবসটিকে কেন্দ্র করে। এরই ধারাবাহিকতায় শ্রবণতন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টিকারী নানা বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী নানাবিধ কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে পালিত হয় এ দিবস।

আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম 'শব্দ'। কিন্তু এই শব্দই যখন মাত্রা ছাড়িয়ে হয়ে যায় বিকট বা উচ্চশব্দ, তখন তা অবতারণা করে নানা জটিলতার। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৬ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন কারণে বধিরতায় ভোগে। এদের মধ্যে সাড়ে ১০ শতাংশ মানুষই কানে কম শোনে উচ্চশব্দ বা শব্দদূষণজনিত কারণে। যেখানে মধ্যকর্ণের প্রদাহের কারণে সাড়ে ছয় শতাংশ এবং মধ্য কর্ণে পানি জমার কারণে ছয় শতাংশ মানুষ কানে কম শোনে। অন্যান্যদের বধিরতার কারণ মূলত বাড়তি বয়স এবং জন্মগত বা বংশগত ত্রুটি।

বধিরতার অনেকগুলো কারণের মধ্যে শব্দদূষণ বড় একটা কারণ। এ কারণে কানে কম শোনা বা বধিরতা ছাড়াও দেখা দেয় উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মাথা ধরা, খিটখিটে মেজাজ, পেটের আলসার, অনিদ্রা ও স্ট্রোকসহ আরো নানা ধরনের সমস্যা। উচ্চশব্দের কারণে মারাত্নক ক্ষতির শিকার হয় শিশুরা। বাধাগ্রস্থ হয় তাদের মানসিক বিকাশ, দেখা দেয় মনোযোগের অভাব, কমে শ্রবণ ক্ষমতা, কোমলমতি শিশুদেরকে ঠেলে দেয় বধিরতার দিকে।

মূলত শহর এলাকায় উচ্চ আওয়াজসম্পন্ন গাড়ির হর্ন ব্যবহারে শহরের মানুষের শ্রবণতন্ত্রের জটিলতার হার বেশি। এ ছাড়া উচ্চশব্দে হেডফোনে গান শোনা,মাইক ব্যবহার, জনসভা, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ ও পরিবেশগত কারণেও যে শব্দ তৈরি হয়, তার দ্বারা শ্রবণজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়।

কিন্তু কানের অন্যান্য রোগ নিয়ে মানুষের মাঝে মোটামুটি ধরনের সচেতনতা থাকলেও উচ্চশব্দজনিত শ্রবণযন্ত্রের জটিলতার বিষয়ে জনমনে নেই সচেতনতা, নেই শব্দদূষণ হ্রাসে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা।

ডব্লিউএইচও’র দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি চার জনের মধ্যে একজন শ্রবণ সমস্যায় ভুগছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের শ্রবণ সমস্যা নিয়ে বসবাস করবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে ২৫০ কোটি মানুষের মধ্যে ৭০ কোটি মানুষের অবস্থা এমন নাজুক পর্যায়ে পৌঁছবে যে, তাদের শ্রবণসহায়ক যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা এমনকি অনেকের পুনর্বাসনেরও প্রয়োজন হবে।

সময়োপযোগী ও যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই বিপুলসংখ্যক শ্রবণশক্তি হ্রাস ঠেকাতে পারে। আর এ লক্ষ্যকে সফল করতে আজকের সময়ে শ্রবণজটিলতার অন্যতম প্রধান কারণ শব্দ দূষণ কমিয়ে আনার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।

এজন্যে প্রয়োজন নিজ নিজ জায়গা থেকে উচ্চশব্দ এড়িয়ে চলা এবং উচ্চশব্দের উৎস যেমন হেডফোন,মাইক, গাড়ির হর্ন, কল-কারখানার ও নির্মাণ কাজের যন্ত্রপাতি, সাউন্ডবক্স ইত্যাদির  নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। তবেই কমবে শব্দদূষণ জনিত শ্রবণ জটিলতা,অকালেই বধির হতে হবে না কোন শিশুকে, পরিবার ও সমাজের বোঝা হতে হবে না কোনও তরুণকে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত