০১ মার্চ, ২০২১ ০৮:৪৬ এএম
চিকিৎসকদের অনিহা 

‘বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইগুলো গুদামে পচে’

‘বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইগুলো গুদামে পচে’
অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। ছবি: মেডিভয়েস।

মো. মনির উদ্দিন: আক্ষরিক অনুবাদ হওয়ায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইগুলো সমাদৃত হয়নি বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। তিনি বলেন, সুখপাঠ্য না হওয়ায় চিকিৎসকরা এসব গ্রন্থ সানন্দে গ্রহণ করেননি। ফলে মাতৃভাষা বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইগুলো গুদামে পচে। 

তবে বাংলা ভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞান হওয়াকে সমর্থন করেন জানিয়ে অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর উদাহরণ রয়েছে। ‘চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে বাংলায় রেফারেন্স গ্রন্থ হলে কোয়াকসহ কিছু মানুষ এর অপব্যবহার করবে’—এমন চিন্তাকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেন তিনি।  

চিকিৎসা বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৬০টি মৌলিক গ্রন্থ লিখেছেন লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। 

সাধারণ মানুষের জন্য লেখা এসব বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের কাহিনী (১৯৭৮), চিকিৎসাবিজ্ঞান পরিভাষা (১৯৮৩), আপনার কুশল (১৯৮৫), মনের এ দুয়ারটুকু (১৯৮৫), ক্যান্সার (১৯৮৫), শিশুর জগৎ (১৯৮৯), ডাক্তারী আলাপ (১৯৯১), ভালো খাওয়া ভালো স্বাস্থ্য (২০০৪) ও সুখে অসুখে (২০০৫)।

সৃষ্টিশীল এ পথে হাঁটার স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে গঠিত বাংলা একাডেমির চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইয়ের অনুবাদ বোর্ডে ডাক পান তরুণ চিকিৎসক শুভাগত চৌধুরী। 

চার-পাঁচজনের ওই বোর্ডের হাত ধরে অনুদিত হয় ডেভিডসন প্রিন্সিপালস্ এন্ড প্র্যাকটিস অব মেডিসিন, কানিংহামস ম্যানুয়াল অব এনাটমি ও চিকিৎসা বিজ্ঞান পরিভাষা। 

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার কর্মসূচির অংশ হিসেবে কিছু অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তখন বাংলা একাডেমি আমাদের কয়েকজনকে এ দায়িত্ব প্রদান করে। একাডেমি দুই কারণে আমাদেরকে এ দায়িত্ব প্রদান করে। প্রথমত তাদের দৃষ্টিতে আমরা এ কাজের যোগ্য ও উপযোগী ছিলাম। দ্বিতীয়ত এ কাজে আমরা সময় দিতে পারবো বলে তারা মনে করেছিলেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন আহমদ রফিক। সদস্যদের মধ্যে আমিসহ কয়েকজন বরেণ্য চিকিৎসক, একজন সিভিল সার্জন, বাংলা একাডেমির একজন পরিচালক ও একজন সাংবাদিক ছিলেন।’ 

‘তবে আক্ষরিক হওয়ায় এ অনুবাদ গ্রন্থগুলো অতটা সুখপাঠ্য ছিল না। ফলে এ প্রকল্প অতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। এ ছাড়া আর্থিক সহায়তা অব্যাহত না থাকায় বাংলা একাডেমি পরবর্তীতে এ প্রকল্প বাদ দেয়’, জানান ডা. শুভাগত চৌধুরী।

এমন প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই বাংলায় হওয়াকে কিভাবে দেখেন জানতে চাইলে এই চিকিৎসা গবেষক বলেন, ‘এ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নাই। এটা সরকারের নীতিনির্ধারণের বিষয়। আমি মুক্ত কণ্ঠে বলি, আমি বাঙালি। এ ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। এখান থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ—সব কিছুর ইতিহাস ভাষার সঙ্গে যুক্ত। অন্য কোনো দেশে এ রকম হয়নি। বাংলা ভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞান হওয়ার চিন্তাকে আমি সমর্থন করি।’ 

কোয়াকরা জ্ঞানী হলে রোগী হত্যা বন্ধ হবে

বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের রেফারেন্স গ্রন্থকে অবলম্বন করে কারও দ্বারা এর অপব্যবহার ও অপ্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোয়াক কি বই পড়ে তাদের কার্যক্রম চালায়? না, বরং তারা তাদের মনগড়া চিকিৎসা চাপিয়ে দিচ্ছে। তারা যদি বই পড়ে কোয়াকারি করে তাহলে তা ইতিবাচক। এতে তারা জ্ঞানী ব্যক্তি হয়ে যাবে। কোয়াকের সংজ্ঞা জানতে হবে সবাইকে। অপজ্ঞান ও অপব্যবহারের জনক হলো কোয়াক। তাদের যদি বই পড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় তাহলে তারা আর চিকিৎসা করবে না। নাপিতের ফোঁড়া কাটার গল্পটা হলো তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এসব অজ্ঞদের চোখগুলো খুলে দিতে পারলে চিকিৎসার নামে রোগীদেরকে খুন করা বন্ধ হবে। সুতরাং ‘বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞান হলে অজ্ঞরা (কোয়াক) জ্ঞানী হয়ে যাবে’—এটা একটি ভুল ধারণা।’ 

‘তবে বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞান হওয়ার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণর বিষয় আছে। এটা বাস্তবায়ন না করতে পারলে শুধু মুখে মুখে আওড়িয়ে তো কোনো লাভ নাই’, যোগ করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাব্কে এ অধ্যক্ষ। 

দেশে দেশে মাতৃভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞান

মাতৃভাষায় বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা বিজ্ঞান হচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী বলেন, ‘জার্মানিতে কেউ ইংরেজি ভাষা বলে না। সেখানে আমি বেশ অসুবিধায় পড়েছিলাম। জাপানিরা নিজের ভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ে। তারা কখনো ইংরেজি ভাষায় কথা বলে না। রাশিয়া-চীনেও তাই হচ্ছে। এমনকি ব্রিটিশরা চাইনিজ ভাষা ইংলিশে অনুবাদ করে চীনাদের বিজ্ঞান সম্পর্কে অবগত হয়।’ 

পৃথিবীর বহু দেশে এ রকম উদাহরণ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা নিজের ভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞান করছে এবং উৎকর্ষ সাধণ করেছে। বাংলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিষয়ে যারা আগ্রহী তাদের সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য কি সেটাই হলো মূল বিষয়। তবে এটা অসম্ভব কোনো কল্পনা না। দুরূহ হলে চীন, জাপান ও রাশিয়া কেউ এ পথে হাঁটতো না। 

আপনি এ ব্যাপারে কাজ করতে চান কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শেষ জীবনে এসে এটা করা সম্ভব না। এটা কঠিন কাজ। এখন শারীরিক আমার সেই সক্ষমতা নেই। আমার বয়স ৭৬ বছর। তখন আহমেদ রফিকের নেতৃত্বে রাতের পর রাত নিয়মিত ৭/৮ ঘণ্টা করে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছি। তখন আমরা ছিলাম তরুণ চিকিৎসক।’

কোনো যোগ্য ব্যক্তি থাকলে সরকার তাকে দিয়ে এ কাজ করিয়ে নিতে পারে জানিয়ে এ চিকিৎসা গবেষক বলেন, ‘এতে সাফল্য চাইলে একটি পরিসংখ্যান করা জরুরি। এর মাধ্যমে যাদের জন্য এটা করা হবে তারা এটা গ্রহণ করতে কতটা আগ্রহী এবং যারা কাজটি করবেন তাদের সক্ষমতার ব্যাপারে ভালোভাবে অবগত হওয়া যাবে। কারণ বাংলা একাডেমি থেকে আমরা যেটা করেছিলাম তা কেউ গ্রহণ করেনি। পরে এটা গুদামে পচলো।’ 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌলিক গ্রন্থ রচনার পরামর্শ 

এ ব্যাপারে বেশ কিছু পরামর্শ তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। তিনি বলেন, এটা জনপ্রিয় করার জন্য আক্ষরিক অনুবাদে না গিয়ে ভাবানুবাদ করা যেতে পারে। মৌলিক গ্রন্থ লেখা যেতে পারে। মেডিসিনের মৌলিক গ্রন্থ অধ্যাপকরা লিখতে পারেন। অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিসিনের একটি মৌলিক গ্রন্থ বাংলায় লিখে দিতে পারেন। তিনি তো ইংরেজিতে একটি ভালো বই লিখেছেন। এভাবে সার্জারিতে একটি গ্রন্থ বাংলায় লিখার দায়িত্ব কাউকে দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে বিভিন্ন বিষয়ে বাংলায় মৌলিক বই লিখে নিজেদের সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে। এ রকম সক্ষমতা দেশের অনেক চিকিৎসকের আছে।

তবে এই সময়ে এসে অনুবাদে হাত দেওয়াকে নিষ্প্রয়োজন বলে মনে করেন ডা. শুভাগত। তিনি বলেন, এখন ডেভিডসনের অনুবাদ পড়ে যথেষ্ট হবে না। কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অনেক তথ্য যোগ হচ্ছে। 

চিকিৎসকদের একাধিক ভাষাজ্ঞান জরুরি

চিকিৎসকদের বিভিন্ন ভাষার ওপর দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীর বিভিন্ন ভাষার ব্যুৎপত্তিগত জ্ঞান থাকা দরকার। বাংলা মাতৃভাষা হলেও ইংরেজি, জার্মানি, ফ্রেঞ্চ শেখা উচিত। এতে তিনি বিভিন্ন জার্নাল পড়তে পারবেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবেন। এটুকু উদারতা আমাদের থাকতে হবে। বাংলার প্রতি ভালোবাসা থাকা, আবেগ থাকাটা স্বাভাবিক। তবে এ ক্ষেত্রে বাস্তবতাবিবর্জিত কিছু করতে বলবো না।’ 

ডা. শুভাগত বলেন, সাধারণ মানুষের ভাষা বাংলা। চিকিৎসা দেওয়ার সময় তাদের সঙ্গে বাংলায় যোগাযোগ করতে হয়। তাই বিএমডিসি, বিএমএসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ফেরামের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে বাংলায় মেডিকেল শিক্ষা চালু করা সম্ভব কিনা।

‘তবে রেফান্সে গ্রন্থ তো হতেই পারে। এ জন্য অত বেশি ভাবনার দরকার নাই। টেক্সট বুক না হোক রেফারেন্স বুক বাংলায় হতে পারে। আমি চাই এই ধারাটি চালু হোক’, যোগ করেন তিনি। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসা বিজ্ঞান
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক