এমবিবিএস পাস করেও ইন্টার্নশিপ করতে পারছেন না ২১ শিক্ষার্থী
মাহফুজ উল্লাহ হিমু: মেডিকেল শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত প্রফেশনাল পরীক্ষা শেষে হাসপাতালের ওয়ার্ডে ব্যস্ত সময় পার করার কথা থাকলেও তা করতে পারছেন না ২১ শিক্ষার্থী। তারা সবাই রংপুর নর্দান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের। এখন তাদের সময় কাটছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের দুয়ারে ঘুরে ঘুরে। কেননা পাঁচ বছর পরিশ্রমের পর এমবিবিএস ডিগ্রি পেলেও প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন না থাকায় ইন্টার্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বেসরকারি এই মেডিকেলের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে ১২ জন নেপালি শিক্ষার্থীও রয়েছেন।
জানা যায়, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত নর্দান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেই। এমনকি বিএমডিসি থেকে যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকার কথা সেটিও নেই প্রতিষ্ঠানটির। ফলে ইন্টার্নশিপে যোগদান করতে পারছেন না মেডিকেল কলেজটির শিক্ষার্থীরা।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন দিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। নিয়মিত তিন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করালেও মন্ত্রণালয়ের শর্ত পূরণ না করায় কলেজটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অনেক দেন-দরবার করে ২০০৯ সালে আবারও শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি পেলেও ২০১৫ সালে কঠোর হয় মন্ত্রণালয়। অনিয়ম ও নানা কারণে কলেজটির কার্যক্রম বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে উচ্চ আদালতে যায় কর্তৃপক্ষ। আদালতের রায় কলেজের পক্ষে গেলে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়।
শিক্ষার্থীরা জানান, ২০১৫ সালে মন্ত্রণালয় থেকে কলেজটির ভর্তিসহ সামগ্রিক কার্যক্রমে কঠোর স্থগিতাদেশ থাকলেও সকল কার্যক্রম চালিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৮ সাল থেকে এ সমস্যার সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানালেও কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এ অবস্থায় ফাইনাল প্রফে কৃতকার্য হওয়ার পর এক বছর পার হয়ে গেলেও ইন্টার্নশিপে যোগদান করতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। সমস্যার সমাধান না হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয়সহ বিদেশি শিক্ষার্থীরা। এমনকি ঢাকায় অবস্থিত দূতাবাসে যোগাযোগ করেও কোনো ফায়দা হয়নি।
নর্দান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মো. নাজমুল হাসান শুভ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ১২ জন নেপালি এবং ৯ জন বাংলাদেশিসহ মোট ২১ জন শিক্ষার্থী রয়েছি। আমাদের ব্যাচ থেকে পরের কোনো ব্যাচেরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেই। ফলে আমাদের বিএমডিসির নিবন্ধন নম্বর নেই। আমরা ২০১৮ সাল থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে জানিয়ে আসছি, তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। তারা শুধু আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’
সরকারের বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করেছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিএমডিসি ও মন্ত্রণালয় দুই জায়গাতেই যোগাযোগ করেছি। আমাদের সেশন থেকে পরের কোনো সেশনের কারোরই প্রভেশনাল বিএমডিসি নিবন্ধন নেই। অধিদপ্তর থেকে অনুমতি দিলে তখনই বিএমডিসি আমাদেরকে নিবন্ধন দেবে। নিবন্ধন পেলে আমরা যেখানে খুশি ইন্টার্নশিপে যোগদান করতে পারবো।
আমরা গত পাঁচ-ছয় দিন আগেও বিএমডিসিতে যোগাযোগ করেছি। তারা জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের থেকে অনুমোদন না থাকায় তাঁরা কিছুই করতে পারবে না। আমরা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) রংপুর শাখার সভাপতির সঙ্গেও কথা বলেছি। তবে কোনো সমাধান পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কলেজের হাসপাতাল গত সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ। এ অবস্থায় ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪ সেশনের ইন্টার্ন চিকিৎসক যারা আছেন তাদেরও দিন গণনা হচ্ছে না। আবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল খোলারও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। তাঁরা এখন অন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন হিসেবে যোগদান করতে চাচ্ছেন। সে ব্যাপারেও কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনো সহযোগিতা করছে না।’
নর্দান মেডিকেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ ব্যাপারে নর্দান মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সমস্যা সমাধানে কলেজ কর্তৃপক্ষ আন্তরিক। তাঁদের যোগদানের বিষয়ে সকল কাগজ-পত্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য সচিব এবং অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) অফিসে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বেশ কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছিল। আমরা এ সংক্রান্ত একটা অঙ্গীকারনামা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। এখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে মন্ত্রণালয় ও ডিজি অফিস।’
কলেজ কর্তৃপক্ষ ইন্টার্নদের সমস্যা সমাধানে উদাসীন—শিক্ষার্থীদের এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান এক বছরের মধ্যে শর্তগুলো পূরণের জন্য অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন। এর মধ্যে যেহেতু কলেজ ও হাসপাতালের অনুমোদনগুলো রিনিউ করা হয়নি, ফলে শিক্ষার্থীদের একটি দল ইন্টার্ন হিসেবে যোগদান করতে পারছে না। আরেকটি দল নিবন্ধিত হলেও কাজ শুরু করতে পারছে না।
একইসঙ্গে হাসপাতাল বন্ধ থাকায় আরেকটি গ্রুপ কাজে যোগদান করেও কাজ করতে পারছে না। আমরা ডিজি অফিসে আবেদন করেছি তারা মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য পাঠিয়েছি। আশা করছি, খুব শীঘ্রই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মন্ত্রণালয় এবং ডিজি অফিস সাবাই তাঁদের প্রতি সদয়।’
মাইগ্রেশনের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. খলিলুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা বলেছি তাঁদের, আমাদের এখানে অনুমতি দিক বা মাইগ্রেশনের সুযোগ করে দিক। যেখানেই হোক তাঁদের ইন্টার্ন করার সুযোগ করে দেওয়া হোক। আমার পক্ষ থেকে আমি কর্তৃপক্ষতে চিঠি দিয়েছি। তাদের সময়টা যেনো নষ্ট না হয়, এটাই আমাদের কাম্য।’
এছাড়া শর্তগুলোর সাথে যেহেতু অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত, তাই অনেকগুলো শর্তই সময় সাপেক্ষ। এটি কলেজ ম্যানেজমেন্টের হাতে। তিনি তাঁর এখতিয়ারের মধ্যে থেকে যতটা করা সম্ভব করেছেন এবং ম্যানেজমেন্টও কাজ করে যাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন নর্দান মেডিকেলের অধ্যক্ষ।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের বক্তব্য
কলেজ কর্তৃপক্ষের আবেদন ও অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তাঁরা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। মন্ত্রণালয় তাঁদের আবেদন এবং শর্তগুলোর বিষয়ে পর্যালোচনা করে অনুমোদনের বিষেয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এটা মন্ত্রণালয়ের বিষয়।’