হামে শিশুমৃত্যু ও টিকার সংকট নিয়ে তদন্ত চলছে: স্বাস্থ্য সচিব
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর নেপথ্য ঘটনা জানতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের দায় রয়েছে এবং জনগণের জানার স্বার্থে সেসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
আজ শনিবার (৯ মে) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি। ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এ গোলটেবিলের আয়োজন করে স্বাস্থ্য সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ)।
তিনি বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের নেপথ্য কারণ ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। তদন্তে উঠে আসবে কেন আমরা এতগুলো শিশু হারালাম। কী কারণে, কোথায় আমাদের সমস্যা ছিল, আমাদের কোনো গাফিলতি ছিল কিনা বা আমাদের কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণে কোনো অবহেলা ছিল কিনা। তদন্ত হলে যা হয়, তার সব কিছু হচ্ছে। এ নিয়ে আর বেশি কিছু না বলি। আমরা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবো। এর আলোকেই আপনারা সব কিছু জানবেন।
তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে স্বাস্থ্য সচিব আরও বলেন, ‘প্রত্যেকটি ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার। জনগণের জানা দরকার। আমাদের সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জবাবদিহিমূলক সরকার। আমি বিশ্বাস করি, সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করার জন্য প্রস্তুত।’
বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘হাম-রুবেলার মতো রোগ প্রতিরোধে টিকার ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন নিয়মিত করা জরুরি। অথচ দেশে ২০১৯ সালের পর আর কোনো ন্যাশনাল ক্যাম্পেইনিং হয়নি। দেশের হাম আক্রান্ত শিশুদের রোগের ধরন ও অন্যান্য জটিলতা নিরূপনের ইতিমধ্যে রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অনুরোধ করেছি। হাম ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুদের ডেথ রিভিউয়ের বিষয়টি আমরা জাতীয় টিকাদান সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) এ উপস্থাপন করবো। তারা পরামর্শ দিলে আমরা শিগগিরই ডেথ রিভিউ শুরু করবো।’
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে বিএমইউ প্রো- ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তা না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারতো। এত দ্রুত টিকা এনে সেই টিকাদান কর্মসূচি দেশব্যাপী চালু করা—এটি নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল, সরকার সেখানে উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন আমাদের উচিত হাম মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসূচি সুচারুরূপে চলমান রাখা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।’
জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ, ‘কোনো মহামারী দেখা দিলে বিষয়টি আমরা স্বীকার করি না, মহামারি ঘোষণা করি না। কিন্তু মহামারী মোকাবেলায় কাজ করি। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়।’
হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি ন্যাশনাল গাইডলাইন প্রণয়ন করে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, ‘আমাদের সচেতনতার অনেক অভাব, সেটা ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে—সর্বত্র। এজন্য অনেক শিশুর টিকা নেওয়া হয়নি। হাম নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। কারণ এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের অনেকের বয়স ছয় মাসের নিচে। একটা পরিসংখানে এসেছে, ৫০ ভাগ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয় না। এই পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা বাড়ানো উচিত।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘ডিজি অফিস থেকে অনেক তথ্য পাওয়া যায় না। যেখানে আওয়ামী দোসররা এখনো বসে আছে, সেখানে কতটুকু তথ্য পাওয়া যাবে, সেটা আমি নিয়ে আমি সন্দিহান।’
বাংলাদেশে হেলথ সেক্টরে এখন একটা ক্রান্তিকাল চলছে জানিয়ে ড্যাব মহাসচিব বলেন, ‘ডিজি অফিসসহ অনেক জায়গায় আওয়ামী দোসররা বসে আছে। টিকা আনা, দেওয়া ও পরিবেশনের যে অব্যবস্থাপনা—এর জন্য কারা দায়ী, এর একটা তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তে যারা দোষী সাব্যস্ত হবে, তাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, ‘আমরা হয় তো এখান থেকে উৎরে যাবো, প্রাদুর্ভাব অনেকাংশে কমে এসেছে। ৯৫ ভাগ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে হাম থেকে উত্তরণ ঘটবে। কিন্তু এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবো কিনা, জানি না। করোনা সংকট থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি? নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলো, অথচ জেলা পর্যায়ে আইসিইউগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। আইসিইউ চালাবার জনবল নেই, তৈরিও হয়নি। ফলে চালানো যাচ্ছে না। শিশুদের আইসিইউ দেশে খুবই কম। হামের কারণে হয় তো অনেক ভ্যান্টিলেটর পাওয় যাবে, এই সংকট দূর হওয়ার পর সেগুলো চালানো যাবে না। এভাবে আমরা বেশি দূর আগাতে পারবো না। আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর টিবি রোগী বেড়ে যাচ্ছে, ম্যালেরিয়া বেড়ে যাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওপি বন্ধ হওয়ার পর অনেক জনবল বসে আছে। তাদের পদায়ন নেই, কাজ নেই।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) প্রতিনিধি অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সংক্রামক রোগ কোথাও ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এক নম্বরের কাজ হলো রোগ শনাক্ত করা। এজন্য সরকারসহ বিভিন্ন অংশীজনরা কাজ করছেন। এটা খুবই দক্ষতার সঙ্গে করা হলেও আইসোলেশনে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। কোভিডে এ ক্ষেত্রে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে এনডিএফ একটি পরামর্শও দেয়, তবে সময়ের অভাবে হয় তো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘এর পাশাপাশি অনলাইনে টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থা করা যেত। যেখানে অভিভাবকরা সন্তানদের স্বাস্থ্য সংকট তুলে ধরলে মেডিকেল অফিসার সমাধানমূলক পরামর্শ দিতেন। আমি অনেক পরিচিত-স্বজনকে এভাবে কার্যকর পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে করা সম্ভব হয়নি। তাহলে আইসোলেশনের পরিধি বাড়ানো যেত। এটা না হলে এক রোগী হাসপাতালে আসার সুযোগ পেলে গড়ে ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে খুশির খবর হলো, ব্যাপক সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এটা সরকারের বিরাট সাফল্য।’
অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) মুখ্য সমন্বয়ক ডা. হুমায়ুন কবির হিমু বলেন, ‘হাম ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ না দিয়ে আমরা ভিন্ন হাঁটা শুরু করি। আমরা দোষারূপের পথে গেলাম। এ কারণে যতটা সক্রিয়ভাবে কাজ করা সম্ভব হতো, দ্রুততার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হতো—তা অনেকাংশে ব্যাহত হয়েছে। কোনো জাতীয় সংকটে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে না আগালে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না।’
হাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপের গ্রহণের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার এতো তাড়াতাড়ি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে যে, ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মধ্যে তারা হাসপাতাল তৈরি করতে সক্ষম হয়। আইসোলেশন তৈরি করে ফেলেছে, আইসিইউগুলো প্রস্তুত করে ফেলেছে। এজন্য তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।’
‘আমাদের খুঁজে বের করা উচিত, হামের ক্যাম্পেইন সরকার দুই-তিনবার পিছিয়েছে। এটা কেন হলো? এখানে আলোচনা হয়েছে যে, আমাদের টিকা ছিল, ইউনিসেফ কর্মকর্তাও জানিয়ে গেছেন, আমাদের টিকা ছিল। তাহলে কেন ক্যাম্পেইন পেছানো হলো। আমরা একবার বললাম, জুলাইয়ে করবো, আরেকবার বললাম সেপ্টেম্বরে, পরে কেন সেটা ২০২৬ পর্যন্ত গড়াল। এটা আমাদের জানা প্রয়োজন’—যোগ করেন তিনি।
এনএইচএ মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, ‘আরেকটি বিষয় আমাদের জানা প্রয়োজন, টাইফয়েডে আমাদের কতটা শিশু মারা যায়? দেশে টাইফয়েডের খুব ভালো চিকিৎসা আছে। তাহলে আমরা কেন টাইফয়েডকে এত গুরুত্ব দিয়ে হামের ক্যাম্পেইনে গুরুত্ব দিলাম না।’
হাম ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা থাকলে অবশ্যই তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বিএইচআরএফ সভাপতি প্রতীক ইজাজ। গোল টেবিলে হাম পরিস্থিতি কাভারে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিষয়ে তুলে ধরেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক তবিবুর রহমান।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি: ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে কি-নোট উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পিডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও ও হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরির ভাইরোলজিস্ট ও সাবেক সাবেক প্রধান ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল, বিএমইউর নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান, জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন, টিকা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাবেক গবেষক ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি, বিএমইউর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, বিএমইউ ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, পুষ্টিবিদ ও ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সাইকা সিরাজ, ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (ইমিউনাইজেশন) ডা. চিরঞ্জিত দাস প্রমুখ।
এমইউ/