জন্মগত ত্রুটির কাঙিক্ষত চিকিৎসা নিশ্চিতে জেনেটিক ল্যাব করার আহ্বান ওজিএসবি সভাপতির
মেডিভয়েস রিপোর্ট: শিক্ষকের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় রাস্তায় মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম। অপরিকল্পিত মেডিকেলের কারণে পড়াশোনার মান পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকরা যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন না বলেও মনে করেন তিনি।
রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) শহীদ ডা. মিলন হলে বিশ্ব জন্মগত ত্রুটি দিবসের বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। সচেতনতামূলক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢামেক হাসপাতালের ফিটো-ম্যাটারনাল মেডিসিন ইউনিট।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রাস্তায় রাস্তায় মেডিকেল কলেজ তৈরি করছি, অথচ আমাদের কি এত মেডিকেল কলেজ দরকার আছে? আমাদের কি পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছে? শিক্ষক সংকটের কারণে আজকাল মেডিকেল কলেজগুলো যেন পাঠশালার মতো হয়ে গেছে এবং এতে আমাদের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু কিছু জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে সকল জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধযোগ্য নয়। বিশেষ করে আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ফলে বিরল ত্রুটিযুক্ত সন্তান প্রসব হয়, এসব ত্রুটিযুক্ত শিশুর আসলে চিকিৎসা মেলে না।’
ওজিএসবি সভাপতি বলেন, যেসব জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশুর চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না তারা পরিবারের জন্য বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই বোঝা অন্য দেশগুলোর মতো দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকবে।
তিনি জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং আক্রান্তদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশে জেনেটিক ল্যাব করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক ফিরোজা বেগম।
দেশে অনেক অভিজ্ঞ স্পেশালিস্ট রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এক দিনে ১০০ রোগী পর্যন্ত দেখি। অথচ প্রতিটি রোগীর জন্য ন্যূনতম ১৫ মিনিট সময় দেওয়া উচিত, যাতে আমরা সঠিকভাবে রোগীর ইতিহাস জানতে পারি এবং তার সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারি। তবে দুঃখজনক হলো, আমাদের কাছে এত সময় নেই। যতক্ষণ না আমরা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিবো, ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক চিকিৎসা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ওজিএসবি প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগেই কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি এবং ভবিষ্যতেও করবো। চেষ্টা করে যাবো যতদিন আমি বেঁচে আছি, যাতে আমাদের দেশে একটি ভালো মলিকুলার ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি সুইজারল্যান্ডের জিক ইউনিভার্সিটি হসপিটালে গিয়েছিলাম, যেখানে তাদের জেনেটিক ল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নয়, বরং অনেক দূরে অবস্থিত। সেখানে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং সারা সুইজারল্যান্ড থেকে নমুনা এক জায়গায় সংগ্রহ করা হয়।’
‘যদি আমরা চাই, প্রতিটি ইনস্টিটিউটের সঙ্গে একটি করে ল্যাব তৈরি করতে ..., তবে আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা রাস্তায় রাস্তায় মেডিকেল কলেজ তৈরি করছি, অথচ আমাদের কি এত মেডিকেল কলেজ দরকার? আমাদের কি পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছে? শিক্ষক সংকটের কারণে আজকাল মেডিকেল কলেজগুলো যেন পাঠশালার মতো হয়ে গেছে এবং এতে আমাদের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে’—যোগ করেন তিনি।
সম্মানের সঙ্গে রোগীদের সঠিক চিকিৎসা প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, চিকিৎসা শুধুমাত্র ওষুধ দিয়ে নয়, বরং সহানুভূতির সঙ্গে হতে হবে। রোগী যেন চিকিৎসায় সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায়, সেটাই চিকিৎসকদের লক্ষ্য।
ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, ‘আমাদের অনেক কিছু করার আছে, কিন্তু আমরা তা যথাযথভাবে করছি না। আমরা যদি আমাদের রোগীকে আমাদের সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখার চেষ্টা করি, তবে দেশের উন্নতি সাধনে সফল হতে পারব। তাই আমাদের সবাইকে একযোগে দেশের উন্নতির জন্য চেষ্টা করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে জন্মগত ত্রুটি বিষয়ে ডা. আরিফা শারমিন মায়ার রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত একটি নাটক প্রদর্শিত হয়। সচেতনতামূলক এই নাটক দর্শকসহ উপস্থিতি বিশিষ্টজনদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়, যার কলাকুশলীদের সবাই দেশের বড় বড় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক।
এমআই/এমইউ