২৬ মার্চ, ২০২৬ ০৯:৩৮ পিএম

লিভার সিরোসিসে মাকে হারিয়ে লিভার গবেষণায় মায়ো ক্লিনিকে ডা. মুবিন

লিভার সিরোসিসে মাকে হারিয়ে লিভার গবেষণায় মায়ো ক্লিনিকে ডা. মুবিন
মায়ো ক্লিনিকে লিভার গবেষণায় বাংলাদেশি চিকিৎসক মুবিন ইবনে মকবুল।

লিভার সিরোসিসে মাকে হারানোর গভীর বেদনা থেকে হৃদয় কোণে জন্ম নেয় দুরারোগ্য এই ব্যাধির সহজ চিকিৎসা আবিষ্কারের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে শক্তিতে রূপ দিয়ে গবেষণার পথে এগিয়ে যান মুবিন ইবনে মকবুল। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ালেখার শুরু থেকে গবেষণার প্রতি অদম্য কৌতূহল, নিজ উদ্যোগে রিসার্চ ক্লাব গঠন আর নিরলস পরিশ্রম করে যান। আর এই সোপান বেয়েই স্বাস্থ্যসেবার সনদ গ্রহণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পৌঁছে যান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকে। আজ তিনি লিভার সিরোসিসের কারণ ও সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে কাজ করছেন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক দলের সাথে।

এই সাক্ষাৎকারে তুলে ধরা হলো মায়ো ক্লিনিকের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি বিভাগের রিসার্চার ডা. মুবিনের বেদনা, স্বপ্ন আর মানবকল্যাণে তাঁর অঙ্গীকার নিয়ে এক অনুপ্রেরণার গল্প।

গবেষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার অনুভূতি 

আলহামদুলিল্লাহ। প্রথমেই আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া আমাকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য। সত্যি বলতে এখানে আসা ও কাজ করা আমার জন্য স্বপ্নের চেয়ে বড়। এখানকার চিকিৎসক ও গবেষকরা প্রত্যেকেই বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তাদেরকে সামনাসামনি দেখা, একসাথে কাজ করা ও তাদের থেকে শেখা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। 

যুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা যেমন ছিল

সত্যি বলতে ছোটবেলা থেকেই আমার নতুন কিছু জানার ও জ্ঞান তৈরি করার আগ্রহ ছিল। আমি প্রথম রিসার্চ পেপার পাবলিশ করি কলেজ লাইফে, নটর ডেম কলেজে পড়াকালে। ঢাকা মেডিকেল কলেজেও আমি এই গবেষণা চালিয়ে যাই। এ ছাড়াও বুয়েটের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের সাথে টুকটাক গবেষণায় যুক্ত ছিলাম। ফাইনাল ইয়ারে থাকতে আমি আর আমার কয়েকজন বন্ধু মিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ রিসার্চ ক্লাব গড়ে তুলি। এটি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অন্যতম বড় ও সক্রিয় ক্লাব, যা মেডিকেল স্টুডেন্টদের মধ্যে গবেষণা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। 

লিভার সিরোসিসে গবেষণায় আগ্রহের কারণ

এটার কারণ মূলত ব্যক্তিগত। সত্যি বলতে আমি ব্রেইন বা নিউরোসায়েন্স রিলেটেড গবেষণায় বেশি আগ্রহ ছিলাম। মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় আম্মু লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হোন। চূড়ান্ত বর্ষের শুরুতে আম্মু পৃথিবী থেকে চলে যান। এর পর থেকে আমার লিভার নিয়ে গবেষণার আগ্রহ জাগে। আম্মু কখনোই লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে চাইতেন না। ফ্রম দ্যাট টাইম, আই অলওয়েজ আস্কড মাইসেলফ—ক্যান্ট উই ডিসকভার অ্যান ইজিয়ার ট্রিটমেন্ট অপশন ফর ইট?

বিদেশে গবেষণার পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা

সত্যি বলতে মায়ো ক্লিনিকে গবেষণার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। এখানে হাই স্কুল থেকেই শিক্ষার্থীরা পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) করা শিখে, উন্নত বিভিন্ন গবেষণার স্কিল অর্জন করে। এখানে পরিকাঠামো, অর্থায়ন, দক্ষ টেকনিক্যাল সাপোর্ট, মেন্টরশিপ—সব কিছু এমনভাবে সমন্বিত যে, আপনি আপনার ভাবনাকে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার, ভাবার ও প্রয়োগের অবকাশ মেলে। এই পরিবেশ শুধু কাজ নয়, চিন্তার মানকেও পাল্টে দেয়।

গবেষণার ফল রোগীদের জন্য কতটা সহায়ক?

সত্যি বলতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের যেকোনো মৌলিক গবেষণার ফল পেতেই অনেক সময় লাগে। এখানে আমার ল্যাবের টিম মূলত লিভার সিরোসিস কেন হয় এবং তা নিরাময় করতে ইমিউনোলজি, জেনেটিক্স, মলিকুলার বায়োলজি ও বায়োইনফরমেটিক্স—সব মিলিয়ে সম্মিলিত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যদি আগামী কয়েক দশকে এই রোগের কোনো সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ তা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে ভালো প্রভাব রাখবে বলে আশা করছি।

মেডিকেল শিক্ষার্থী ও তরুণ চিকিৎসকদের গবেষণায় আগ্রহ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ রিসার্চ ক্লাবে কাজ করার সুবাদে দেখেছি, মেডিকেল শিক্ষার্থী ও তরুণ চিকিৎসকদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ প্রবল। কিন্তু মেন্টরশিপ ও ফান্ডিংয়ের অভাবে তারা আগাতে পারছে না। তাই শিক্ষকদের উচিত গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

ছাত্র জীবনের অভিজ্ঞতা

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রজীবন যেকোনো DMCan এর জন্যই বিচিত্র অভিজ্ঞতা। প্রতিদিন লেকচার, আইটেম, কার্ড, টার্ম, প্রফ ও বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কাজ মিলিয়ে চোখের পলকে এমবিবিএস লাইফ পার হয়ে গেছে। আমি এখানে আমার বন্ধুদের পেয়েও অনেক কৃতজ্ঞ।

লব্ধ অভিজ্ঞতা দেশে কাজে লাগানোর প্রত্যয়

অবশ্যই আছে। আমি চাই, আমি এখানে যা শিখছি তা বাংলাদেশে কাজে লাগাতে ও এই শেখা জ্ঞান বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ভাল কোনো লিভার সেন্টার দেয়ার স্বপ্ন আছে ইনশাআল্লাহ, যেখানে উন্নতমানের চিকিৎসাসহ বিশ্বমানের গবেষণা হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

আমার ইচ্ছা হল একজন ভাল ফিজিসিয়ান-সায়েন্টিস্ট হওয়া। একটু বুঝিয়ে বলি। এখন উন্নত বিশ্বে চিকিৎসক ও গবেষক আলাদা দুইটি পেশা নয়। একই ব্যক্তি দুইটি কাজেই সমানভাবে পারদর্শী। উদাহরণস্বরূপ, মায়ো ক্লিনিকের বেশিরভাগ ডাক্তার যেভাবে ভালভাবে চিকিৎসা দিতে জানেন, ঠিক সেভাবেই তার ফিল্ডে উনি উনার ল্যাবে গবেষক হিসেবেও চমৎকার কাজ করছেন। তো আমি একই সাথে একজন ভাল চিকিৎসক ও গবেষক হিসেবে হেপাটলজিতে অবদান রাখতে চাই ইনশাআল্লাহ। 

তরুণ চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ

১. প্রশ্ন করতে শিখুন ও নিজের কৌতূহলকে সম্মান করুন। এটাই গবেষণার প্রথম ধাপ।
২. প্রথমেই ‘বড় কিছু’ করতে গিয়ে আটকে যাবেন না, তার চেয়ে বরং ছোট ছোট গবেষণা প্রজেক্ট দিয়ে শুরু করুন। সেটা হতে পারে একটা ছোট কেইস রিপোর্ট। 
৩. একজন মেন্টর খুঁজে নিন, যিনি আপনাকে শুধু নির্দেশনা নয়, বরং অনুপ্রেরণাও দেবেন।
৪. ধৈর্য ধরুন। শুরুতেই পেপার পাবলিকেশনের নেশায় আটকে গেলে হবে না। কাজকে সম্মান করুন। সময় নিন। 

বেড়ে উঠার গল্প

আমি খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি। বাবা-মা দুইজনেই শিক্ষক ছিলেন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে অনেক স্নেহেই বড় হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। আমার বেড়ে ওঠা ঢাকার মিরপুরে।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত