‘স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ ভাগই রোগীর, দুই তৃতীয়াংশ ওষুধে’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ ভাগই রোগীর পকেটের আর সেই খরচের দুই তৃতীয়াংশ ওষুধের পেছনে। এভাবে স্বাস্থ্য ব্যয় বহন করতে গিয়ে বছরে প্রায় ৪০-৫০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়। ওষুধের কারণে অনেক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক খাতের অর্জন অর্থহীন হয়ে পড়ে। ন্যায়সঙ্গত মুনাফার সুযোগ রেখে মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি যৌক্তিকভাবে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা হলে দেশের জনগণের জন্য তা কল্যাণকর হবে।
মঙ্গলবার (১৩ মে) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির (ওএসবি) বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান এসব কথা বলেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, মানুষ মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ ভাগ নিজের পকেট থেকে খরচ করে। আবার সেই খরচের দুই তৃতীয়াংশ হয় ওষুধের পেছনে। বছরে প্রায় ৪০-৫০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয় স্বাস্থ্য ব্যয় বহন করতে গিয়ে। ওষুধের কারণে আমাদের অনেক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক খাতের অর্জন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এ কারণে ন্যায়সঙ্গত মুনাফার সুযোগ রেখে মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকার কর্তৃক যৌক্তিকভাবে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা হলে তা দেশের আপামর জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে।’
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ অফিসের সহযোগিতায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করছি। এটি হালনাগাদ করা সম্পন্ন হলে নতুন তালিকার আলোকে সরকারি প্রতিষ্ঠান, তার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অত্যবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া অপ্রশিক্ষিতদের দ্বারা পরিচালিত দেশব্যাপী ওষুধের দোকানগুলো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে ফার্মেসি নেটওয়ার্ক স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, মানুষের মৌলিক ও অন্যতম অপরিহার্য চাহিদা হচ্ছে স্বাস্থ্য। আর তাই স্বাস্থ্য নিয়ে এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা আকাশচুম্বি। এ রকম একটি প্রত্যাশার পাহাড় সামনে নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আজ সিভিল সার্জনদের এই সম্মেলন আয়োজন করেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সম্মেলন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে এটি একটি ইতিবাচক মাইলস্টোন হয়ে থাকবে।
যে কোনো দুর্যোগে চিকিৎসকদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘জাতির ক্রান্তিলগ্নে অকুতোভয় তরুণ সমাজ যখন অন্যায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন, অকাতরে রক্ত দিয়েছেন, অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন; তখন আমাদের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দায়িত্বশীলতার সাথে চিকিৎসা সেবা দিয়ে তাদের পাশে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। আজকের এই শুভ দিনে তাদের ধন্যবাদ জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিগত আট মাস স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজাতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে জনবল বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন পদ সৃজন, পদোন্নতি, পদায়ন ও ক্যারিয়ার প্ল্যানিং। আমরা বিশ্বাস করি, এগুলো বাস্তবায়িত হলে একটি কাঙিক্ষত কর্ম পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যার ফলে স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।’
এ সময় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই আমরা চেয়েছি, স্বাস্থ্যখাতে স্টিয়ারিংটা সরকারের হাতে আসুক এবং তার কর্মপরিকল্পনায় যেন গণমানুষের অধিকারসমূহ প্রতিফলিত হয়, কাজে ওভারলেপিং বন্ধ হয়। সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। সে কারণে আমরা দীর্ঘ পঁচিশ বছর যাবৎ প্রতিফলিত খাতভিত্তিক কর্মসূচির পরিবর্তে প্রকল্প বাস্তবায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করেছি। এতে কাজের ফোকাস সুনির্দিষ্ট হবে, স্থানীয় চাহিদা এবং বাস্তবতার আলোকে সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। অর্থ অপচয় এবং অব্যবস্থাপনা দূর হবে, সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে।’
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টার নিকট তাদের সুপারিশমালা দাখিল করেছেন। সুপারিশের আলোকে জাতীয় অগ্রাধিকার, সরকারের সামর্থ্য, বাস্তবায়নকাল বিবেচনায় আশু, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়ন শুরু হলে আপনাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। মনে রাখতে হবে, এ দায়িত্ব শুধু আপনার জন্য চাকরি নয়, বরং পরিবার, সমাজ, তথ্য সমগ্র দেশের কল্যাণমুখী রূপান্তরে আপনার ঐতিহাসিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ মাত্র।’
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাতের পুনর্গঠনকল্পে আগামীতে আমাদের অনেক অনেক কাজ করতে হবে। এর মধ্যে সকল নাগরিকের জন্য ইউনিক হেল্থ কার্ড, কার্যকরি রেফারাল পদ্ধতি, বয়স্ক নাগরিকদের চিকিৎসা সুবিধা, জরুরি চিকিৎসা সেবা—এ ধরনের নতুন নতুন অনেক কাজ রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের খোলনলচে বদলে ফেলার মতো একটি কাজ করতে মাঠ পর্যায়ে আপনার নেতৃত্ব অপরিহার্য। আপনার অঙ্গীকার, আগ্রহ, দায়িত্বানুভূতি একেবারেই প্রয়োজনীয়। দেশের একটি বৈষম্যহীন, ন্যায্যতা, সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন আমাদের সবার। একটি কথা আছে, যদি দ্রুত যেতে চাও, তাহলে একা চলো। যদি দূরে যেতে চাও, এক সাথে চলো। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে আমাদের এক সঙ্গে চলতে হবে। কারণ আমাদের যেতে হবে, বহুদূর।’
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘এই উপমহাদেশে সিভিল সার্জনের পদটা সৃষ্টি হয়েছিলে প্রায় আড়াইশ’ বছর আগে! অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপালনরত ব্যক্তিবর্গ কখনোই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের সাথে মিলিত হয়ে নিজেদের ইচ্ছা, ভাবনা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন প্রকাশের সুযোগ পাননি! প্রথম সিভিল সার্জন সম্মেলনে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্বাক্ষী হতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’