চলতি বছরে চালু হচ্ছে চার ক্যান্সার হাসপাতাল: অধ্যাপক সায়েদুর রহমান
মেডিভয়েস রিপোর্ট: চলতি বছরে দেশে চারটি ক্যান্সার হাসপাতাল চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। একই সাথে ক্যান্সার হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালগুলোতেও রোগীদের জন্য দরকারি যন্ত্রপাতি দ্রুত আমদানি করা হবে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আজ শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) জনসংখ্যা ভিত্তিক ক্যান্সার পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান তিনি।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফার্সে রুমে বিএসএমএমইউর ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে ক্যান্সারের বোঝা: জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান।
নিত্য-নতুন জ্ঞান তৈরিতে গবেষণার বিকল্প নেই উল্লেখ করে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ পিএইচডি গবেষক এবং তার সুপারভাজার ছাড়া তৃতীয় কোনো মানুষের কাজে আসে না। এ রকম গবেষণা বিএসএমএমউ আর করতে চায় না। বিএসএমএমইউ থেকে সেই গবেষণায় পরিচালনা করা উচিত যা রোগীদের কল্যাণে কাজে আসে বা যে সকল গবেষণা দেশের মানুষের ও দেশের রোগীদের উপকার হবে। সেক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, জনগণের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণা কোথায় ছাপা হয়, কী গবেষণা হয়ে তা জানাতে হবে। গবেষণা মানুষের জন্য হতে হবে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে গবেষণা এগিয়ে নিতে পারে, তবে তা সাংঘর্ষিক হয়। তাই এটি এড়িয়ে প্রয়োজনে সাবেক শিক্ষার্থী এবং জনগনের কাছ অনুদানের মাধ্যেমে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
এ ছাড়া দেশের ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমান টাকার ওষুধ উৎপাদন করে, সমপরিমান বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলেও অনুষ্ঠানে জানান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।
ভিসি অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম বলেন, গণআকাঙ্ক্ষা পূরণ করে এমন গবেষণার জন্য ফান্ডের কোনো সমস্যা হবে না। বিএসএমএমইউর উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি থেকে যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, তা দেশের মানুষের ক্যান্সার প্রতিরোধ, প্রতিকার ও ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় বিরাট ভূমিকা রাখবে। একই সাথে এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশে ক্যান্সার নিয়ে গবেষণার বহুমুখী দ্বার উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশে ক্যান্সারের বোঝা: জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি শীর্ষক গবেষণার প্রধান গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ক্যান্সার বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি। বাংলাদেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন (পিবিসিআর) না থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোর তথ্য ব্যবহার করে ক্যান্সারের পরিস্থিতি অনুমান করতে হয়। এর ফলে বাংলাদেশে ক্যান্সারের সঠিক পরিস্থিতি জানার ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা আছে। তাই জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বা বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্যান্সারের পরিস্থিতি নির্ণয় করা জরুরি হয়ে পড়েছিল, এ জন্যই এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়।
তিনি জানান, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় ২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়ে আসছে। গবেষণায় প্রতিটি বাড়িতে বিশেষভাবে তৈরি করা ইন্টারনেটভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন সফটওয়্যার করে সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহণ করা হয়েছে। এক বছর পূর্তিতে একই পরিবারের ফলোআপ পরিদর্শন ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়েছে।
ডা. মো. খালেকুজ্জামান জানান, দুই লক্ষ মানুষের উপর এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশে ৩৮ ধরণের ক্যান্সারের রোগী পাওয়া গেছে। প্রতি লাখে ১০৬ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। ৯৩ শতাংশ রোগীর বয়স ১৮ থেকে ৭৫ বছর। ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে ২.৪ শতাংশ শিশু রয়েছে। ৫.১ শতাংশ রোগীর বয়স ৭৫ বছরের বেশি।
তিনি জানান, দেশে প্রধান পাঁচটি ক্যান্সার হলো স্তন, মুখ, পাকস্থলী, শ্বাসনালী এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সার। পুরুষদের পাঁচটি প্রধান ক্যান্সার হলো শ্বাসনালী, পাকস্থলী, ফুসফুস, মুখ ও খাদ্যনালীর ক্যান্সার। আর নারীদের ক্ষেত্রে হল স্তন, জরায়ুমুখ, মুখ, থাইরয়েড এবং ওভারির ক্যান্সার প্রধান। পুরুষ ক্যান্সার রোগীদের ৭৫.৮ শতাংশ ধুমপায়ী এবং ধোঁয়াহীন পান, জর্দ্দা, তামাক সেবনকারী ৪০.৫ শতাংশ। ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে ৬০.৬ শতাংশ নারী ধোঁয়াহীন পান, জর্দ্দা, তামাক সেবনকারী। ৪৬ শতাংশ রোগীর ক্যান্সারের সাথে ই তামাক সেবনের সম্পর্ক রয়েছে।
তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে তিনি আরও জানান, ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৬০ শতাংশ কমবাইন্ড চিকিৎসা নিয়েছে এবং ৭.৪ শতাংশ রোগী কোনো চিকিৎসাই নেয়নি। দেশে মোট মৃত্যুর ১২ শতাংশ ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী। মৃত রোগীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ফুসফুস, শ্বাসনালী ও পাকস্থলীর ক্যান্সার। প্রতি বছর নতুন করে প্রতি লাখে ৫৩ জন রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ফুসফুস, লিভার ও শ্বাসনালীর ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যা বেশি।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রো-ভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক।
অনুষ্ঠানে বর্তমান জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি স্থায়ী করার জন্য এই জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনটি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা, গবেষকদের বর্তমান রেজিস্ট্রি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ক্যান্সার গবেষণা পরিচালনা করতে উৎসাহিত করার সুপারিশ করা হয়। এই গবেষণায় অর্থায়ন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ (এনসিডিসি) শাখা এবং বিএসএমএমইউ।
গবেষণার ফলাফল
গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ৪৬ হাজার ৬৩১টি পরিবারের দুই লক্ষ এক হাজার ৬৬৮ জন গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত হন। এর মধ্যে ৯৭ হাজার ৪৫৭ জন (৪৮.৪%) পুরুষ এবং এক লক্ষ চার হাজার ২১১ জন (৫১.৬%) নারী। এদের মধ্যে ২১৪ জনের শরীরে ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি এক লক্ষের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত ১০৬ জন। এ ক্ষেত্রে নারীর তুলনায় পুরুষের হার বেশি, প্রতি লাখে ১১৮ জন, যেখানে নারীর হার লাখে ৯৬। এ ছাড়া আক্রান্তদের এক লক্ষ ৮৬ হাজার ৫৪৮ জনই (৯২.৫%) ১৮ থেকে ৭৫ বছর বয়সী। ১৮ বছরের নিচে চার হাজার ৮৪০ (২.৪%) এবং ৭৫ বছরের ঊর্ধ্বে ছিলেন ১০ হাজার ২৭৪ (৫.১%)।
শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা ৩৮টি বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচটি ক্যান্সার ছিল: স্তন (১৬.৮%), ঠোঁট ও মৌখিক গহ্বর (৮.৪%), পেট (৭%), গলা (৭%) এবং জরায়ু (৫.১%)। পুরুষদের মধ্যে গলার ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি প্রচলিত (১৩%)। অন্যান্য প্রধান ক্যান্সার পেট (১০.৪%), ফুসফুস (৮.৭%), ঠোঁট ও মৌখিক গহ্বর (৭%) এবং খাদ্যনালী (৬.১%)। নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার সবচেয়ে সাধারণ ক্যান্সার (৩৬.৪%)। এছাড়া জরায়ুর ক্যান্সার (১১.১%), ঠোঁট ও মৌখিক গহ্বরের ক্যান্সার (১০.১%), থাইরয়েড (৭.১%) এবং ডিম্বাশয় (৫.১%) অন্যান্য প্রধান ক্যান্সার। ১৯% মহিলা ক্যান্সার রোগী নারী প্রজনন প্রক্রিয়ার ক্যান্সারে আক্রান্ত (জরায়ু ১১%, ডিম্বাশয় ৫%, এবং জরায়ু ৩%)।
ক্যান্সার রোগীদের সহ-রোগের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ (১৭%), ডায়াবেটিস (১১%), হৃদরোগ (৬%), দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (৩%) এবং স্ট্রোক (২%)। ৭৫.৮% পুরুষ ক্যান্সার রোগী ছিলেন ধূমপায়ী। ৪০.৫% পুরুষ এবং ৬০.৬% নারী তামাকবিহীন সেবন করতেন। সর্বমোট ক্যান্সারের ৪৬% তামাক (ধূমপান ও তামাকবিহীন) সেবনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ৬০% ক্যান্সার রোগী সার্জারি, কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপির সংমিশ্রণ চিকিৎসা পেয়েছিলেন। ৭.৪% রোগীকে কোনো চিকিৎসা প্রদান করা হয়নি।
তবে ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪১১টি পরিবারের ৫৮ হাজার ৫৩৯ জন অংশগ্রহণকারীর ফলোআপ করা হয়। এক বছরে নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা যুক্ত হয়েছে প্রতি এক লাখে ৫২.৯ জন। নতুন সংযোজিত তিনটি প্রধান ক্যান্সার ফুসফুস (১৬.১%), যকৃত (১২.৯%) এবং গলা (১২.৯%)। পুরুষদের জন্য নতুন সংযোজিত ক্যান্সারের মধ্যে তিনটি প্রধান ক্যান্সার হলো ফুসফুস, যকৃত এবং স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার। নারীদের নতুন সংযোজিত ক্যান্সার হলো যকৃত (২৩.১%), জরায়ুর ক্যান্সার (১৫.৪%) এবং খাদ্যনালীর ক্যান্সার (১৫.৪%)। মোট মৃত্যুর মধ্যে ক্যান্সারে মৃত্যুর কারণ হলো ১১.৯% বা প্রায় ১২%। ক্যান্সারে মৃত রোগীদের মধ্যে ছিল ফুসফুসে ক্যান্সার (১১.৪%), স্বরযন্ত্র (গলা) ক্যান্সার (৮.৫%) এবং পেটের ক্যান্সার (৫.৭%)। পুরুষদের মধ্যে মৃত্যুর প্রধান দুটি ক্যান্সার হলো ফুসফুস (১৯%) এবং স্বরযন্ত্র (১৪.৩%) এবং নারীদের মধ্যে মৃত্যুর প্রধান কারণ স্তন ক্যান্সার (১৪.৩%) এবং পেটের ক্যান্সার (১৪.৩%)।
এনএআর/
-
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
তিন দিনব্যাপী দ্বাদশ জাতীয় বিজ্ঞান সম্মেলন অনুষ্ঠিত
বিএসপিএমআর’র লাইফ টাইম এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত অধ্যাপক কামরুল
-
০২ জুন, ২০২৫
গণঅভ্যুত্থানে হামলা-ভাঙচুর-হত্যাচেষ্টা
চাকরি হারাচ্ছেন বিএমইউর চিকিৎসকসহ ৩৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী
-
১৬ মার্চ, ২০২৫
-
১১ মার্চ, ২০২৫