২২ জানুয়ারী, ২০২৫ ০৭:৪১ পিএম
জাতীয় মেধায় দ্বিতীয়

ক্যান্সারে বাবার মৃত্যু ও মায়ের ইচ্ছাতে মেডিকেলে সানজিদ সিরাজ

ক্যান্সারে বাবার মৃত্যু ও মায়ের ইচ্ছাতে মেডিকেলে সানজিদ সিরাজ
মো. সানজিদ অপূর্ব বিন সিরাজ। ছবি: মেডিভয়েস

হাসপাতালের শয্যায় ক্যান্সার আক্রান্ত পিতার দুঃসহ যন্ত্রণা অবলোকন, এক পর্যায়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে প্রিয় অভিভাবকের চিরবিদায় এবং মায়ের ইচ্ছা থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুনেন মো. সানজিদ অপূর্ব বিন সিরাজ। সেই বাসনা থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জাতীয় মেধায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী সানজিদ। ভর্তি পরীক্ষায় তার নম্বর ৯০.৫।

ইর্ষণীয় সাফল্যের অনুভূতি ও তার পড়াশোনার গল্প শুনতে মেডিভয়েস মুখোমুখি হয় এই কৃতি শিক্ষার্থীর। একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসে ভর্তি পরীক্ষায় তার বাজিমাত করার রহস্য। সেই সঙ্গে জানালেন, চিকিৎসা পেশায় নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু নাঈম মনির, সঙ্গে ছিলেন শাহাদাত হোসাইন। ছবি তুলেছেন আবু সাঈদ।

অভাবনীয় ফলাফল  

সানজিদ সিরাজ: আলহামদুলিল্লাহ। যেমনটা আশা করিনি কখনো, তেমনই একটি ফলাফল হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভালো ফলাফলের একটি প্রত্যাশা ছিল, এটা পূরণ করতে পেরেছি। এজন্য অনেক ভালো লাগছে। আসলে ফলাফলের আগে কেউ ধারণা করতে পারে না যে, পজিশন হবে কিংবা ভালো ফলাফল হবে। আমারও এতো ভালো করার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। ফলাফল শুনে অবাক হয়ে গেছি। পরীক্ষা দেওয়ার পর ফলাফলের আগে যে কয়েকটা দিন ছিল—কোচিংয়ের শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যরা যখন প্রশ্নে দেওয়া উত্তর মিলিয়ে দেখছিলেন, তখন সবাই বলছিলেন, হয় তো তালিকায় পঞ্চাশের ভিতরে থাকবে। তবে আমি অতটা আশাবাদী ছিলাম না।

সাফল্যের পেছনের গল্প 

সানজিদ সিরাজ: সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদান সবার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে আমার বড় দুই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। যেহেতু উনারা ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে ধারণাটা পেয়েছি। তারা আমাকে শুরু থেকেই সবসময় পড়াশোনার সার্বিক দিকনির্দেশনা দিতেন। কীভাবে পড়লে সময় কম লাগবে, অযাচিত পড়াশোনা না করে গুছিয়ে পড়া যাবে। এখানে আমার মেজ ভাইয়ের কথা স্মরণ করতে চাই। ভাইয়া চুয়েটে পড়ে। আগে বুয়েটে ছিল, স্থানান্তর করে চুয়েটে গেছে। ভাইয়া বিষয়গুলো ধরে ধরে বুঝিয়ে দিতো। পড়াশোনার কৌশল ঠিক করায় সে আমাকে বেশি সহযোগিতা করেছে। ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে পরিবারে একাধিকজনের অভিজ্ঞতা থাকায় এ ব্যাপারে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি।

শিক্ষকদের অবদান

সানজিদ সিরাজ: দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামের মুসলিম হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছি। এই স্কুলের শিক্ষকদের সব সময় পাশে পেয়েছি। ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে টেন পর্যন্ত সবসময় ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করেছি। ফলে আমাকে নিয়ে শিক্ষকদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। একটি ফলাফলের পর তারা পরবর্তী পরীক্ষায় এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন, যেন চেষ্টা অব্যাহত রাখি। এর পর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছি।

সফলতার পেছনে কোচিংয়ের ভূমিকা

সানজিদ সিরাজ: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে গেলে কোচিংয়ের কোনো প্রয়োজন নেই, তা আমার মনে হয় না। কোচিংয়ে পড়াশোনার কথা যদি বাদও দেই, তবুও ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রশ্ন কেমন হতে পারে তার একটি ধারণাও কোচিং থেকে পাওয়া যায়। এখানে অনলাইন-অফলাইনে পরীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে নিজের অবস্থা বোঝা যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো পড়ানো। যেগুলো পর্তি পরীক্ষায় ঘুরে-ফিরে আসে। এগুলো রপ্ত করা যায় কোচিংয়ে। এটা সহায়ক। সাহস, উৎসাহ-উদ্দীপনা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোচিংয়ে ভূমিকা অনেক।

মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি কখন থেকে, কীভাবে?

সানজিদ সিরাজ: ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়ে চাপমুক্ত থাকতে এইচএসসির প্রথম থেকেই মেডিকেলের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বায়োলজি আগে থেকেই ভালো করে পড়া উচিত। ভর্তির প্রস্তুতির সময় সবগুলো লাইনে জোর দিতে পারবো না। পর্যাপ্ত সময়ও থাকে না। সুনির্দিষ্ট কোনো লেখকের বই থেকে প্রশ্ন আসছে না। গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন লেখকের বই থেকে প্রশ্ন আসছে। একই সঙ্গে ইংলিশটাও এইচএসসির প্রথম থেকে পড়া উচিত। কারণ চার মাসে যত পড়ি না কেন, মনে ইংলিশের পুরোপুরি প্রস্তুতিটি নিতে পারিনি। মূল বই পড়ার সময় কোনো ধরনের ফাঁক-ফোকর না রাখা। তাহলে পরীক্ষার সময় খুব বেশি চাপে থাকতে হবে না।

পড়ার রুটিন, পড়াশোনার সময়সীমা

সানজিদ সিরাজ: আমার পড়াশোনার সুনির্দিষ্ট কোন সময় ছিল না, যে দিনে এতো ঘণ্টা পড়বো। এইচএসসিতে যে রুটিনটা ছিল, এটা বাস্তবায়নে চেষ্টা করতাম। এটা অধিকাংশই দিন পূরণ করতাম। মাঝে মাঝে বাদ যেতো। ভর্তি পরীক্ষার সময় আমার চেষ্টা  অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। পড়াশোনায় অনেক সময় দিয়েছি। রাত জেগে পড়তে ভালো লাগতো। খুব ভোরে উঠতাম না। দৈনন্দিন কাজের জন্য একটা ঘণ্টা বিরতি দিতাম। বাকি সময় পুরোটাই পড়াশোনা করতাম। 

নিজের দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ 

সানজিদ সিরাজ: বিভিন্ন কোচিংয়ের যখন পরীক্ষা দিতাম, তখন বারবার এক জায়গায় ভুল হলে ধরে নিতাম, এটা ভালো করে পড়া হয়নি, কিংবা পড়ার পরও আয়ত্বে আসছে না। এটা আবার পড়া উচিত। ভুলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করতাম, কেন ভুল হলো? ঘাটতি কোথায়? যতদ্রুত সম্ভব সে বিষয়গুলো সমাধান করে নিতাম।

ডিএমসিতে সুযোগ পেতে কৌশল 

সানজিদ সিরাজ: ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) চান্স পেতে প্রথম থেকেই ভালো করে পড়া উচিত, যাতে ভালো নম্বর আসে। যেহেতু ঢামেকের কাটমার্ক একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে। লক্ষ্য রাখা উচিত, পরীক্ষা নিজের নম্বর এর নিচে যেন না যায়। এজন্য এইসএসসির শুরু থেকেই অনেক ভালো করে পড়া উচিত, যাতে ভালো ফলাফল করা যায়। 

মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন কখন থেকে শুরু

সানজিদ সিরাজ: যেহেতু আমার দুই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, সেহেতু তাদের কথাবার্তা কিংবা নির্দেশনাও এর ভিত্তিতেই হবে। এটাই স্বাভাবিক। প্রথম দিকে আমারও ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনিয়ার হবো। তবে আমার বাবা ২০১৩ সালে কোলন ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে ২০১৪ সালের এপ্রিলে মারা যান। আমি যেহেতু পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছিলাম, সেহেতু আম্মুকে নিয়ে হাসপাতালে বাবার পাশে থাকার একটি অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। এক থেকে দেড় বছর ধরে ক্যান্সার আক্রান্ত বাবার সীমাহীন যন্ত্রণা দেখার অভিজ্ঞতা, এর পাশাপাশি আম্মুর তীব্র ইচ্ছা ছিল আমি ডাক্তার হই, যেহেতু আমাদের রক্তের আত্মীয়দের মধ্যে কোনো ডাক্তার নেই। সেই আলোকে আমার মনে হলো, আমার উচিত ডাক্তারি পড়াশোনার দিকে যাওয়া। সুতরাং আম্মার ইচ্ছা ও আব্বার অসুস্থতার দুঃসহ স্মৃতি আমাকে ডাক্তারিতে আগ্রহী করে।

যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন 

সানজিদ সিরাজ: ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হতে চাই। আমার আব্বু ক্যন্সার আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন, আমি তখন থেকেই ইন্টারনেটে এটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি। সেখান লব্ধ ধারণা থেকে দেখতে পাই, বিশ্বে অনকোলজি বা ক্যান্সার বিষয়ে উন্নতর চিকিৎসার জন্য কাজ করার সুযোগ আছে। আমাদের দেশের জন্য বিষয়টি নিয়ে আমি চিকিৎসক হয়ে কাজ করতে চাই।

প্রশ্ন ফাঁস 

সানজিদ সিরাজ: একজন পরীক্ষার্থী কখনোই প্রশ্ন ফাঁসের আশা করতে পারে না। কোনো সোর্স থেকে যদি প্রশ্ন পেয়েও যায়। এক্ষেত্রে তার মেডিকেলে পড়ার হয়তো স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু যে টার্গেট নিয়ে পড়ছে, তা কখনোই পূরণ হবে না। আমরা যারা মেধা শ্রম দিয়ে দিনরাত পড়াশোনা করেছি। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে চান্স পাওয়ার মতো অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারছে না। এতে করে পুরো ব্যবস্থাপনাটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই, প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।

বেড়ে উঠা

আমিরাবাদ চেরী গ্রামার স্কুল থেকে সানজিদ সিরাজের হাতেখড়ি। পিএসসি পরীক্ষা দেন আমিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এসএসসি গভ. মুসলিম হাই স্কুল এবং এইচএসসি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে পাস করেন।

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : জাতীয় মেধায় দ্বিতীয়
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক