০৩ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৮:২৩ পিএম

চাঁদপুর মেডিকেলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের চার নেতাসহ পাঁচজনের সাজা

চাঁদপুর মেডিকেলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের চার নেতাসহ পাঁচজনের সাজা
শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফজলে রাব্বি ও সাধারণ সম্পাদক প্রিয়ব্রত দাশ উৎস (বাঁ থেকে)। চবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: নানা অপরাধে জড়িত থাকায় নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের চার নেতাসহ পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ (চাঁমেক) প্রশাসন। ২৭ নভেম্বর মেডিকেলের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ্যে আসে।

এদিকে কলেজ কার্যক্রম ১৮ আগস্ট থেকে শুরু হলেও অভিযুক্তদের শাস্তি ৬ আগস্ট থেকে কার্যকর করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ আদেশ ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিযোগ তাদের। তবে প্রশাসন বলছে, অপরাধ গুরুতর না হওয়ায় তাদের সর্বনিম্ন শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফজলে রাব্বি, সাধারণ সম্পাদক প্রিয়ব্রত দাশ উৎস, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহিমা বিনতে মালেক ও সাংগঠনিক সম্পাদক সানিলা রহমান সারা। অপরজন হচ্ছেন দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী হৃদয় কুমার চৌধুরী। তিনি ছাত্রলীগ নেতা উৎসের ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে।

অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাহেলা নাজনীন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ফজলে রাব্বিকে সকল প্রকার অ্যাকাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম থেকে তিন মাসের জন্য বহিষ্কার ও ছাত্র হোস্টেলে তার বরাদ্দকৃত আসন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। হোস্টেলের বরাদ্দ বাতিল হয়েছে প্রিয়ব্রত দাশ উৎসেরও। তবে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে ছয় মাসের জন্য।

আর মাহিমা বিনতে মালেককে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে এক মাস ও সকল প্রকার সহপাঠ্য কার্যক্রম থেকে ছয় মাসের জন্য বিরত রাখার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্বভাবগতভাবে জুনিয়রদের সাথে খারাপ আচরণের জন্য তাকে লিখিতভাবে ভর্ৎসনা ও সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এক মাসের জন্য অ্যাকাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে সালিনা রহমান সারাকেও। আর সহপাঠীর স্বাক্ষর নকল করে প্রতারণার মাধ্যমে রুম বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় হৃদয় কুমার চৌধুরীর ছাত্রাবাসের আসন বরাদ্দ এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।

বিজ্ঞপ্তি থেকে আরও জানা গেছে, আনীত অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ না হওয়ায় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রীতম মজুমদারকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি।

শাস্তি ঘোষণার আগেই শাস্তির মেয়াদ শেষ চারজনের

চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের প্রভাব খাটিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি, শিক্ষার্থীদের মিছিল-মিটিংয়ে যেতে বাধ্য করা, হোস্টেলে সিট দখলের চেষ্টা, ডাইনিং দখল, ছাত্র কল্যাণ পরিষদের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হেনস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সন্ধানীর কার্যক্রম ও কমিটিতে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ রয়েছে সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।

এসব বিষয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর মেডিকেল কলেজ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানায় শিক্ষাথীরা। এর প্রেক্ষিতে ১৭ সেপ্টেম্বর কলেজ এডুকেশন ইউনিটের চেয়ারম্যান ও প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমানকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ২৭ নভেম্বর দুপুরে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাহেলা নাজনীনের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘শাস্তিসমূহ ভূতাপেক্ষভাবে ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। এই সময়ের মধ্যে শাস্তিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের কেউ কোনো ক্লাস বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে থাকলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘শাস্তিপ্রাপ্তদের সকলে লিখিত মুচলেকা দিবে যে, ভবিষ্যতে তারা এই মেডিকেল কলেজ, হোস্টেল ও হাসপাতালে অবস্থানকালীন সময়ে এ ধরণের কার্যক্রমে জড়িত থাকলে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে যেকোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’

এদিকে কলেজ ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই থেকে কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কলেজ খোলা হয় এক মাস পর, ১৮ আগস্ট থেকে। এর আগে ১৭ আগস্ট ক্যাম্পাসে সকল ধরণের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। আর শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানায় ১৫ সেপ্টেম্বর। প্রশাসন শাস্তির ব্যবস্থা নেয় ২৭ নভেম্বর। ফলে ৬ থেকে শাস্তি কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষার্থীরা মেডিভয়েসকে বলেন, এই শাস্তি মূলত ‘আইওয়াশ’। শাস্তি দেওয়ার আগেই তাদের চারজনের শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ছয় মাসের শাস্তি দেওয়ায় প্রিয়ব্রত ছাড়া বাকিদের শাস্তি ইতোমধ্যেই কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। তার আর ফজলে রাব্বির হোস্টেল বাতিল হওয়ার শাস্তিটা টিকেছে শুধু। উৎসেরও আর দুই মাস শাস্তি বাকি আছে। অথচ তার ছয় মাস শাস্তি পাওয়ার কথা।

তারা অভিযোগ, আগামী ১১ ডিসেম্বর থেকে অনুষ্ঠেয় প্রফ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতেই তাদেরকে এভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ডা. সাহেলা নাজনীন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনার আইনগত ভিত্তি আছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলো তেমন গুরুতর না। সবগুলো অভিযোগ প্রমাণও হয়নি। তাই তদন্ত কমিটি যা সুপারিশ করেছে তার ভিত্তিতে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের হেনস্তা ও জোরপূর্বক মিছিলে নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তা প্রমাণিত হয়নি বলেও জানিয়েছেন অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, ‘আমি জানুয়ারিতে জয়েন করেছি। আমি থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগকে কোনো অ্যাডভান্টেজ আমি দেইনি। আমার রুমেও ঢুকতে দেইনি ছাত্রলীগকে। এ সময়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। ঘটলে তো শিক্ষার্থীরা আমার কাছে অভিযোগ করতে পারত। আমি খুবই শিক্ষার্থীবান্ধব। কিন্তু তারা তো আসেনি আমার কাছে এসব অভিযোগ নিয়ে।’

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ছাত্রলীগ নেতার প্রফে পাশ করার অভিযোগও তোলা হয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক সাহেলা নাজনীন। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘তারা কখনও ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রভাব কোনোভাবে খাটাতে পারেনি। ফজলে রাব্বিকে (শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি) প্রথমে ফরম ফিলআপই করতে দিইনি। তিন মাস পর দিয়েছি। এমনকি সে প্রফে একটিতে মাত্র পাশ করেছে। বাকি সবগুলোতে ফেইল করেছে। অ্যাডভান্টেজ দিলে তো এমন হতো না।’

প্রশ্ন রেখে অধ্যক্ষ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যে অভিযোগ দিয়েছে, তা যদি তদন্ত কমিটি প্রমাণ না পায়, তাহলে কিসের ভিত্তিতে শাস্তি দিব? ওদের ব্যাপারে নমনীয় থাকলে, তারা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তো তাদের সুবিধা দিতে পারতাম, তখন দিইনি। এখন ওদের পায়ের তলার মাটিও নেই, এখন কেন সুবিধা দিব তাদের? দিলে তো তখনই দিতে পারতাম। আমাদের কঠিন হওয়ারও সুযোগ নেই, নমনীয় হওয়ারও সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ারটা যেন শেষ না হয়ে যায়, তার সুযোগটা দেওয়া হয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের চাওয়ার ভিত্তিতেই ৬ আগস্ট থেকে শাস্তি কার্যকর হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি ৬ আগস্ট থেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে ৬ আগস্ট থেকে কার্যকরের জন্য বলেছে। এটি কার্যকর হচ্ছে ভূতাপেক্ষভাবে। যখন থেকে অ্যাকাডেমিক কাজ ছিল, তখন থেকে বাকি সময় পর্যন্ত তার মেয়াদ গণ্য হবে।’

►বিজ্ঞপ্তি দেখতে ক্লিক করুন

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত