২২ নভেম্বর, ২০২৪ ০৫:৩৫ পিএম

বহিষ্কৃতদের ইন্টার্নশিপের সুযোগে ক্ষুব্ধ সোহরাওয়ার্দীর শিক্ষার্থীরা, কর্তৃপক্ষ বলছে ভুল বোঝাবুঝি

বহিষ্কৃতদের ইন্টার্নশিপের সুযোগে ক্ষুব্ধ সোহরাওয়ার্দীর শিক্ষার্থীরা, কর্তৃপক্ষ বলছে ভুল বোঝাবুঝি
ডা. ফাহাদ আল মাহবুব ও ডা. আহসান হাবীব আকাশ। ছবিতে বাম দিক থেকে

আবু নাঈম মনির: জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অপরাধে ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কৃত রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে ইন্টার্নশিপের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দণ্ড কার্যকরের দেড় মাসের মাসের মাথায় তাদেরকে ক্যাম্পাসে ফেরার অনুমতি দেওয়ায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তবে বহিষ্কৃতরা ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাবে না জানিয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে, ইন্টার্নদের প্লেসমেন্টের তালিকায় ভুলক্রমে তাদের নাম ঢুকে গেছে। এটি ইতিমধ্যে বাদও দেওয়া হয়েছে।

গত ৩ অক্টোবর মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলার দায়ে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ডা. ফাহাদ আল মাহবুব ও ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ডা. আহসান হাবীব আকাশকে ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয় তাদের ইন্টার্নশিপ।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. শফিউর রহমান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত নোটিশে বলা হয়, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ডা. সাগর সেনকে ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার এবং তাদের ইন্টার্নশিপ এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এ ছাড়া ২0১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ডা. মো. সামিউল সামি ও ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ওমর ফারুককে ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার এবং ‘ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে না’—মর্মে মুচলেকা প্রদান করেন।

বহিষ্কৃতদের সুযোগে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীদের মারধরে জড়িত থাকার দায়ে বহিষ্কৃত এসব চিকিৎসককে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষমবিরোধী শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকরা।

শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তারা জানান, গত ১৫ জুলাই রাত ৮টার দিকে সিদ্ধান্ত হয়, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের সকল শিক্ষার্থী চলমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে হাসপাতালের সামনে মানববন্ধন এবং র‍্যালি করবে। এজন্য কিছু স্লোগানও ঠিক করা হয়, যা ছিল শুধুই কোটা সংস্কার বিষয়ক। এর কিছু স্ক্রিনশট ছাত্রলীগের কিছু কর্মী তাদের নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এর পর তারা আন্দোলন বানচাল করার পাঁয়তারা চালায়। এ নিয়ে ওই রাত ১১টা পর্যন্ত ছাত্রলীগ কলেজ শাখা সভাপতি ১১তম ব্যাচের রাগিব শাহরিয়ারের রুমে সভা চলে। এতে উপস্থিত ছিলেন—সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ৭তম ব্যাচের সৌরভ ঘোষ, ১১তম ব্যাচের ফাইজুর ফাইম, ১১তম ব্যাচের সামিউল সামি, ১২তম ব্যাচের তুষার হাবিব, ১২তম ব্যাচের ফাহাদ আল মাহবুব, ১৩তম ব্যাচের আহসান হাবিব আকাশ, ১৩তম ব্যাচের সাগর সেন, ১৩তম ব্যাচের ওমর ফারুক, ১৪তম ব্যাচের আহসানুল দিপ্ত, ১৪তম ব্যাচের সৌভিক ভৌমিক জয়। এ ছাড়া ছিলেন এসএইচডি-৮ এর এসকে ফরহাদ ও আবু সাদাত তুষার এবং এসএইচডি-৫ এর অমিত কিশোর।

শিক্ষার্থীরা বলেন, এর পর রাত তিনটায় তারা ১৬তম ব্যাচকে সভায় ডাকেন। শুরুতে সবার ফোন নিয়ে কেড়ে নয় ছাত্রলীগ নেতারা। এরপর এক এক করে সবার ফোন চেক করেন। ফোন দেখে দেখে আন্দোলনে সম্পৃক্তদের এক এক করে সামনে ডাকা হয়। শুরুতে রাজিব সরদার, জাহিদ হাসান, আরিফ ইমন ও ফারহান মাহমুদের কাছে কৈফিয়ত চায় তারা। তাদের প্রত্যেককে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। মারধরে যুক্ত ছিলেন তুষার হাবিব, আবু সাদা তুষার, ফরহাদ হোসেন, সাগর সেন, আহসান হাবিব আকাশ, আহসানুল দিপ্ত, সৌভিক ভৌমিক জয় ও ওমর ফারুক। এই পাশবিকতা চলে রাগীব শাহরিয়ার ও সৌরভ ঘোষের নেতৃত্বে।

তারা বলেন, মারধর শেষে সবার মুখ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয় যে, হলের কেউ পরদিন আন্দোলনে যাবে না এবং তাদের সাথে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বানচাল করতে হবে। তবে পরদিন ওই ব্যাচের কেউই তাদের সাথে যায়নি। 

শিক্ষার্থীরা বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৬ জুলাই দিবাগত রাতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ছেলেদের ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীদের ওপর পৈশাচিক হামলা চালানো হয়। এই স্মৃতি এখনো দগদগে। হামলাকারীদের দণ্ড শেষ হওয়ার আগেই তাদেরকে ক্যাম্পাসে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া আহত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রহসনের শামিল।

তবে বহিষ্কৃতরা নির্দিষ্ট সময়ের আগে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাবে না বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। ইন্টার্নদের প্লেসমেন্টের তালিকায় ভুলক্রমে তাদের নাম ঢুকে গেছে জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্লেসমেন্টের তালিকায় দুইজন বহিষ্কৃত চিকিৎসক আছে—এ তথ্য জানার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নাম কেটে দেওয়া হয়।

ইন্টার্ন কো-অর্ডিনেটরের বক্তব্য

জানতে চাইলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ডা. নুরুজ্জামান খান খসরু আজ শুক্রবার (২২ নভেম্বর) দুপুরে মেডিভয়েসকে বলেন, আহসান হাবীব এবং মো. ফাহাদ আল মাহবুবসহ ১২ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক সার্জারি থেকে গাইনিতে প্লেসমেন্টের জন্য তালিকা আসে। একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর থেকেই আহসান হাবীব এবং ফাহাদ মাহবুবের সার্জারিতে ইন্টার্ন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তারা হাসপাতালে ইন্টার্ন ট্রেনিংয়ে সংযুক্ত নয়। তালিকায় একত্রে ১২ জন ইর্ন্টান চিকিৎসকের নাম থাকলেও অভিযুক্ত দুজন ইর্ন্টান চিকিৎসকের নাম কেটে দিয়ে বাকি ১০ জনকে গাইনি বিভাগে ট্রেনিংয়ের জন্য ন্যস্ত করা হয়। গাইনি বিভাগ থেকে ১০ জনের ইউনিট ডিস্ট্রিবিউশন করা হয়।

‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ওই দুই শিক্ষার্থীর ইন্টার্নশিপ স্থগিত করার জন্য আমিই প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম। একাডেমিক কাউন্সিল এটা পাস করে। কাউন্সিলে তখন হাসিনা সরকারের দোসরদেরই সংখ্যাধিক্য ছিল। ওই শিক্ষার্থীদের শাস্তির ব্যাপারে আমিই উচ্চকণ্ঠ ছিলাম। অবশ্য কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই, অর্থাৎ ৫ আগস্টের পর থেকেই তারা ক্যাম্পাসে আসা বন্ধ করে দেয়’—যোগ করেন তিনি।

ওদের ইন্টার্নশিপ স্থগিত করার অর্ডার তার কাছে না থাকায় তাদেরকে চিনতে পারেননি জানিয়ে তিনি বলেন, এ কারণে ওই দুইজনের নাম সার্জারি থেকে গাইনিতে চলে যায়। তাদের শাস্তির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। বাকি দশজনকে বিভিন্ন ইউনিটে যুক্ত করা হয়েছে। 

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সীমাহীন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলেও জানান অধ্যাপক ডা. নুরুজ্জামান খান খসরু।

পরিচালকের বক্তব্য

জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান আজ শুক্রবার (২২ নভেম্বর) সকালে মেডিভয়েসকে বলেন, যাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সুযোগও নেই। বিতর্কিত বিষয় সামনে এনে নিজেদেরকে বিপদে ফেলারও কোনো ইচ্ছা নেই।

গতকাল একজন শিক্ষকের কাছে বিষয়টি শুনেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বহিষ্কৃতদের ইন্টার্নশিপের সুযোগের খবরটি বিস্ময়ের। একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের হস্তক্ষেপ ছাড়া এ আদেশ প্রত্যাহার করার সুযোগ নেই।

অধ্যক্ষ বললেন ভুল বোঝাবুঝি

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) রাতে মেডিভয়েসকে বলেন, শাস্তির আওতায় থাকা কোনো চিকিৎসক ইন্টার্নশিপ করতে পারবে না।  এ নিয়ে অর্ডার হয়ে থাকলে তা বাতিল হয়ে যাবে। কারণ একাডেমিক কাউন্সিলের কোনো একটা সিদ্ধান্ত হলে, কাউন্সিলই ঠিক করবে, তার শাস্তি মওকুফ হবে, নাকি বহাল থাকবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ তা বাতিল করতে পারবে না। আমার মনে হয়, এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
এনডিএফের কর্মশালায় বিশেষজ্ঞদের মত

দুর্নীতির লাগাম না টানলে বড় বরাদ্দেও সুফল মিলবে না

এনডিএফের কর্মশালায় বিশেষজ্ঞদের মত

দুর্নীতির লাগাম না টানলে বড় বরাদ্দেও সুফল মিলবে না

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত