২৬ অগাস্ট, ২০২৪ ১০:৪৫ পিএম

নিউরোসায়েন্সেসে নার্সের নেতৃত্বে চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ

নিউরোসায়েন্সেসে নার্সের নেতৃত্বে চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ
হো চি মিন ইসলাম। (ছবিতে বামে)

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের (নিন্স) এক নার্সের নেতৃত্বে একাধিক চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠেছে। হো চি মিন ইসলাম নামে ওই নার্স বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম ভাঙিয়ে বহু বছর ধরে নিন্সে তার প্রভাব খাটিয়ে আসছেন। সহকর্মী থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক পর্যন্ত কেউই বাদ যান না তার বাজে ব্যবহার থেকে। তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে অতিষ্ঠ একাধিক সহকর্মী জানান, কর্মস্থলে দেরিতে আসাসহ নানা অনিয়মে জড়িত হো চি মিন। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে এ ব্যাপারে কেউ মুখ খুলেন না। গত ৫ আগস্ট পটপরিবর্তন হলেও নানা কৌশলে প্রভাব বিস্তার করেই চলেছেন হো চি মিন।

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিন্সের এই সিনিয়র স্টাফ নার্স। বলেন, তিনি একজন নার্স। চিকিৎসকদের চেয়ে নার্সদের গ্রেড আলাদা। তাঁদের সঙ্গে তার খারাপ আচরণ করার সুযোগ নেই।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি একজন নার্সের শ্বশুর চিকিৎসা নিতে আসেন নিউরোসায়েন্সে। কেবিনের জন্য হাসপাতালের আরপি ডা. মামুনুর রশিদের কাছে যান ওই নার্স। তখন হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলমের অনুমতি নিয়ে আসতে বলেন ডা. মামুন। যুগ্ম পরিচালক কাছে গেলে ওই নার্সকে রোগী নিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। পরে তিনি বিষয়টি হাসপাতালের আরপিকে অবহিত না করায় অধ্যাপক ডা. বদরুল আলমের নির্দেশে একজন অধ্যাপকের রোগীকে কেবিনে ভর্তি দেওয়া হয়। পর দিন রোগী নিয়ে এসে কেবিন খালি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন নার্স।

সপ্তাহ খানেক আগের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২২ আগস্ট হো চি মিন কয়েকজন নার্স নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তারা বৈষম্যের শিকার দাবি করে আরপি ডা. মামুন আর ইমার্জেন্সি ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে নিউরোসায়েন্সে ঢুকতে না দেওয়ার হুমকি দেন। এ দাবি নিয়ে তারা প্রথমে নিন্স পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদের কাছে যান। তিনি তাদের অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আলোচনার মাধ্যমে শনিবার (২৪ আগসট) এটি সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু তারা তার কক্ষ থেকে বের হয়ে হো চি মিনের নেতৃত্বে আরপি ডা. মামুনুর রশীদের কক্ষে চলে যান। সেখানে ওই সহকারী অধ্যাপকের সঙ্গে যাচ্ছে-তাই আচরণ করেন তারা, এক পর্যায়ে তাঁকে মারতে উদ্যত হন। সবশেষে ডা. মামুনকে নিজ রুম থেকে বের করে দেন হো চি মিনের নেতৃত্বাধীন দলটি।

এর পর তারা চলে যান ইমার্জেন্সি ইনচার্জ ও নিওরোফিজিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুনের কক্ষে। সে দিন ইমার্জেন্সিতে দায়িত্ব না থাকায় ডা. মামুন সেখানে ছিলেন না। তাকে না পেয়ে কর্তব্যরত একজন সহকারী অধ্যাপকের সঙ্গে বাজে আচরণ করেন তারা। সেখানে ডক্টরস রুমে ঢুকে বিভিন্ন জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেন। পরে বের হওয়ার সময় সংশ্লিষ্টদের জানায়, ডা. মামুনকে এখানে অবাঞ্চিত করা হলো, সে যেন এখানে না ঢুকে।

হো চি মিন ও তার অনুসারীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ চিকিৎসকরা এর উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন, অন্যথায় শনিবার (২৪ আগসট) কর্মবিরতির ঘোষণা দেন তারা। কিন্তু জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, পরিচালক স্যারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনায় বসেন তারা। পরিচালক একই দিন দুপুর ১২টার দিকে তাঁর নেতৃত্বে নার্সদের নিয়ে চিকিৎকদেরকে মিটিংয়ে বসার আহ্বান জানান। তবে নার্সদের প্রতিনিধি দলে হো চি মিনকে না রাখার কথা বলেন পরিচালক। কিন্তু হো চি মিনকে নিয়েই মিটিংয়ে যুক্ত হয় নার্সদের আট সদস্যের একটি দল। মিটিংয়ের এক পর্যায়ে হাসপাতালের পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালকের সঙ্গে চিৎকার শুরু করেন হো চি মিন। তখন চিকিৎসকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ক্ষান্ত হন তিনি। 

জানতে চাইলে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের আরপি ডা. মামুনুর রশীদ আজ সোমবার (২৬ আগস্ট) সকালে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) হো চি মিন এক দল নার্স নিয়ে আমার কক্ষের সামনে আসে। এসে আমাকে নানা রকম হুমকি-ধমকি দেয়। আমাকে জোর করে রুম বের করে দিয়েছে। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন চিকিৎসক ছিলেন। তাদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছে। আঙ্গুল তুলে কথা-বার্তা বলেছে, যা অফিসের আচরণ-বিধি, শৃঙ্খলাবিরোধী। তার আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি একজন চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। আমার সঙ্গে একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স এ ধরনের আচরণ করতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘হো চি মিনের অভিযোগ, আমি চিকিৎকের রোগীকে কেবিন দিয়েছি। উনাদের রোগীকে দেইনি। সিঙ্গেল কেবিন দেওয়ার একক ইখতিয়ার আমার নেই। কেবিনের কমিটি আছে। ডিরেক্টর স্যারের নির্দেশে তা হয়। অথচ তারা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। ভর্তিযোগ্য না হলে কোনো রোগীকেই ভর্তি দেওয়া হয় না। উপযোগী না হলে বড় বড় স্যারদের রোগীও ভর্তি হতে পারেনি। সেখানে নার্সদের রোগীও ভর্তিযোগ্য না হলে ভর্তি হবে না, এটাই স্বাভাবিক।’

নিউরোসায়েন্সেসকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা

আরপি ডা. মামুনুর রশীদ আরও বলেন, ‘পিটার হাসসহ অনেকের সঙ্গে দেখা করে, মিটিং করে, সেজন্য কাউকে মানতে চায় না হো চি মিন। নিন্স বিশ্বমানের সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান। এটি খুব ভালোভাবেই চলছে। কাজের স্বার্থে নিউরোসায়েন্সে দলমত নির্বিশেষে সবার মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ভালো। সুন্দর এ পরিবেশটা নষ্ট করে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালকে অস্থির করার পাঁয়তারা করছে সে। এ ধরনের ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেনি।’

জানতে চাইলে হো চি মিনের হুমকির শিকার ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন আজ সোমবার (২৬ আগস্ট) সকালে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তার উসকানিতে নার্সদের একটি গ্রুপ ইমার্জেন্সিতে আমাকে মারতে আসে। তবে অনেককেই সে এনেছে জোর করে, যারা কিছুক্ষণ পর চলে যায়।’

নিরাপত্তাহীনতায় চিকিৎসকরা

ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এই ঘটনায় একজন চিকিৎসক নিউরোসায়েন্সেসের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম স্যারকে ফোন দেন। তিনি অসহায় হয়ে বললেন, তোমরা নিজেরা ম্যানেজ করো। আশঙ্কার কথা হলো, ওর হাত ধরে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ বাহির থেকে আসলে আমরা কোথায় সহযোগিতা পাবো? সে দিন তার যে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেয়েছে, তাতে চাকরিই থাকার কথা না।’

যা বললেন হো চি মিন

জানতে চাইলে নিন্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স হো চি মিন ইসলাম রোববার (২৫ আগস্ট) মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমি একজন নার্স। উনারা ডাক্তার। উনাদের চেয়ে আমাদের গ্রেড আলাদা। উনাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার কোনো সুযোগ আমার নেই। আমাকে ফোন না করে নিন্সে নার্সিং বিভাগের আরও নারী আছেন, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন। আমি মিথ্যাও বলতে পারি। এর পর কথা না বাড়িয়ে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করেন তিনি।’

তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে নিউরোসায়েন্সেসের একাধিক স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা হয় মেডিভয়েসের। তাদের বয়ানে বেরিয়ে আসে হো চি মিনের নানা অনিয়মের কথা। 

সহকর্মীদের বয়ানে হো চি মিন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউরোসায়েন্সের এক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, ‘হো চি মিন এখানকার সিনিয়র স্টাফ নার্স। ও অনেকটা অ্যাগ্রেসিভ। সে প্রায়ই দেরি করে হাসপাতালে আসে, এটা বলতে গেলে অপমানিত হতে হয়। ফলে অনেকে তাকে এড়িয়ে চলেন। অনেক সহকর্মী তার দাপটে তটস্থ থাকে। ওয়ার্ডে কাজ করার সময় রোগীদের সঙ্গেও তার খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হোচি মিন না থাকলে সেদিন এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। মেয়েরা শুধু স্যারকে তাদের অধিকারের কথা বলতে গিয়েছিল। অধ্যাপক স্যারদের রুমে গিয়ে বাজে ব্যবহার, তাদেরকে রুম থেকে বের করে দেওয়া, অবাঞ্চিত ঘোষণা করা—এটা কোনোক্রমেই কাম্য না। এটা ওর উসকানিতেই হয়েছে। এর আগে সে সিনিয়র স্যারদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছে। এজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কয়েকবার ডেকেছেন তাকে।’

ওই দিন হো চি মিনকে নিউরোসায়েন্সেসের একাধিক নার্স নেতা উসকে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন এই স্বাস্থ্যকর্মী।

এই সিনিয়র স্টাফ নার্সের কাছে হাসপাতালের প্রশাসনও অসহায় উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ বিছানার চাদরসহ কিছু জিনিস পুড়িয়ে ফেলতে হয়। এখন মেশিন আসায় তা করতে হয় না। এর আগে এসব জিনিসপত্র পোড়ার জন্য দিলে হো চি মিন এতে বাধা দেয়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনও তার কাছে অসহায় হয়ে যেতো। আপাদমস্তক শৃঙ্খলাবিরোধী একজন মানুষ সে।’

২২ আগস্টের ঘটনার কথা জানতে চাইলে হাসপাতালের নার্স সুপার ভাইজার নাজমা সোমবার (২৬ আগস্ট) মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে অবগত না। এ নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে পারবো না। আপনি প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করেন। আমি এখানকার কর্তৃপক্ষ না।’

এ প্রসঙ্গে জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও নিউরোন্সেসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ ও যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আমলকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : চিকিৎসক লাঞ্ছিত
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত